• ক্রিকেট

হায় হাসান

পোস্টটি ২০৬৪০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
আমাদের দেশে ক্রিকেট খেলা হয়। খেলা তো নয় যেন যুদ্ধ হয়। আমরা আমাদের সৈনিকদের আগলে রাখি। ময়দানে হাজার দিনের শক্তিসাধনার শেষ সঞ্চয়টুকু তারা অতিক্রম করে। আমরা তাদের অনুপ্রেরণার উৎস থেকে যাই। ব্যাট-বলের ধ্বংসযজ্ঞে তারা লিপ্ত। বিজিত অথবা পরাজিত। দিনশেষে আমরাও একাত্ম। উল্লাসিত,উন্মাদিত অথবা দুঃখিত,অপমানিত।
 
 
সেনাশিবিরের শ্রেষ্ঠ আগ্নেয়াস্ত্রটির নাম হাসান, সাকিব আল হাসান। বারুদঘরের একমুখী বিক্রিয়ায় তার আস্থা নাই। উভমুখী তার রসায়ন। ব্যাট, বল, অথবা ব্যাট-বলের দ্বিমুখী তান্ডবে তিনি প্রতিদিন প্রজ্জ্বলিত,প্রমাণিত। প্রবল প্রতিপক্ষের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তার ব্যাটের আগুনে পুড়ে নিষ্ক্রিয় হয়। ঝর্ণার মত তারা ময়দানের যত্রতত্র উড়তে থাকে।
 
 
000_8T1Z5
 
 
 
আগুনের আঁচ আমরা ঠিকই অনুভব করি। আমাদের লক্ষ কোটি চোখের তারায় আগুনগুলো প্রতিহিংসার দাবানল হয়ে জ্বলতে থাকে। আমরা কেঁপে উঠি। হুংকার দিয়ে উঠি।
 
 
pp-16-supporters-05
 
 
আমাদের বুক চিরে আজন্ম লালিত অথচ আহত স্বপ্নগুলো মুক্তি পেতে থাকে। স্বপ্নসম্ভারের প্রাচুর্যে আমাদের গলার রগচটা রগগুলো স্ফীত থেকে স্ফীততর হতে থাকে।
 
 
সময় গড়াতে থাকে। মধ্যাহ্ন শেষে গোধুলী। অতঃপর খন্ডকালীন যুদ্ধবিরতি। যুদ্ধের আঘাতে পাল্টা যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিপক্ষের রানের বন্যা বয়ে যায়। সেই বন্যায় সমুদ্র রচিত হয়। সমুদ্রের ঘূর্ণিতে তিনি রুখে দাঁড়ান। তার বলের ঘূর্নি,সমুদ্রের ঘূর্ণিকেও ছাপিয়ে যায়।
 
shakib-al-hasan-bowling_3102334
 
পানিতে টুপটাপ শব্দ তুলে একে একে দানবগুলো ঝরে পরে। সাগর শান্ত হয়। আমাদের ভিতরের তোলপাড়ও শান্ত হতে থাকে। তার ব্যাট বলের বিশ্বাসে আমরা গর্বিত হই। যুদ্ধবিদ্ধস্ত এই আমরা পরাজিত হলেও প্রায়শই তার একক গৌরবে নতুনদিনের স্বপ্ন সাজাই।
 
 
ময়দানে আমাদের পাশে তার পরিবারও বসে থাকেন। আমাদের চাইতে কয়েকগুণ বেশি আশা বুকে বেঁধেই হয়তো তিনি তার প্রবাদপুরুষের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। আমাদের মাঝের কিছু বীর (!) সন্তান তখন ইতিহাস রচনা করে। যে নায়কের বলিষ্ঠ বাহুতে সমগ্র জাতি শক্তি খোঁজে, তার অর্ধাঙ্গিনীর আত্মসম্মান আকারে ইঙ্গিতে তারা ভূলুন্ঠিত করে। অশ্লীল মন্তব্য, অশ্রাব্য ভাষায় সমগ্র বিশ্বদরবারের উপস্থিতিতে নজিরবিহীন এক ঘটনার জন্ম দেয়।
 
 
প্রকৃত নায়ক, সবকিছুতেই নায়ক। প্রতিকূলতাকে সে রুখবেই। সাকিবও রুখে দাঁড়ায়। তাদের যথেচ্ছ শিক্ষাও দেয়া হয়।
 
article-doc-303lm-6ZNv6NgUlHSK2-356_634x417
 
 
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই ঘটনা প্রকাশ পায়। এই আমাদেরই কিছু অংশ জন্তুগুলোর সাথে একাত্ম হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ দিয়ে এর যৌক্তিকতা প্রমানে ব্যস্ত হয়। আমরা তাকিয়ে দেখি। আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্ন ফাটলের দুইপার্শ্বে দাঁড়িয়ে কেউ গালি দেয়, কেউ বা দানবীয় সমর্থন যুগিয়ে যায়। কেউ অবাক হয়, কেউ বা লজ্জা পায়। দিনশেষে আমাদের মাঝের নির্লজ্জ এই আমরাই কিন্তু খেলার মাঠে আবার সেই সাকিবের সমর্থনেই আকাশ পাতাল দাঁপিয়ে বেড়াই!
 
 
অতঃপর বেশকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার জের ধরে সাকিবকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাসনে দেয়া হয়। দেশের ক্রিকেটের মেরুদন্ডটাই যেন ভেঙ্গে দেয়া হয়। ক্রিকেট বোর্ড অবশ্য অনতিবিলম্বেই তা উপলব্ধি করতে পারে। সাকিবকে সময়ের আগেই তাই ফিরিয়ে আনা হয়। তার প্রত্যাবর্তনটাও কিন্তু বেশ রাজসিক হয়।
 
 
Shakib-Al-Hasan-1
 
 
কিন্তু!!! কিন্তু প্রবাদ বলে যত দোষ, ব্যাটা তুই নন্দঘোষ! তাই কিনা ইংল্যান্ড হোক অথবা নিউজিল্যান্ড, খেলায় পাঁচ উইকেট কিংবা দ্বিশতক, দিনশেষে মিডিয়া, ম্যানেজার, কোচ, নির্বাচক, সভাপতি এবং আপামর এই জনতার কাঠগড়াতেও কিন্তু সেই সাকিবই! সর্বশেষ ভারত সফরেও দুই ইনিংস মিলিয়ে শতাধিক রান আর কার্যকরি দুইখানা উইকেট নিলেও দিনশেষে সকলের রাগক্ষোভের জায়গাটাতেও কিন্তু ওই সাকিবই!! যে কাজ করে তার নাকি হাজারটা দোষ থাকে। আর যে কিছু করেনা, তার দোষ নাকি একটাই, সে কিছু করেনা। কথাটা আগে শুধু শুনতাম। ভাগ্যের ফেরে এখন তা প্রতিনিয়তই দেখতে হয়!
 
 
আমি মানি সাকিব মাঝেমধ্যে উত্তপ্ত মস্তিষ্কের প্রতিফলনস্বরূপ কিছু কাজ করে ফেলে। কিছু অপ্রয়োজনীয় শট সে ভুলে খেলে ফেলে। কিন্তু এইসব নিয়েই তো আমাদের সাকিব। ইদানিং তো দেখি দেবতাদেরও ভুলটুল হয়। আর সাকিব তো আমাদের মাঝেরই, আমাদের মতই এক চিরচেনা রূপ! তার বেলাতেই তবে কেন এই আক্রমণ? শরীর নিংড়ানো খেলা শেষে তার নিজস্ব মুখচ্ছবির পাতায় আমাদেরই লোকজনের সেকি ভূতুড়ে আন্দোলন! কি সব অপবিত্র ভয়াল শীৎকার!
 
 
না ভাই, সাকিব আমার রক্তের কেউ হয়না। কিন্তু আমি মানি সে আমার ভাই। আমি মানি আমার মত নিস্তব্ধ রজনীতে ঢুলু ঢুলু চোখে টিভির দিকে জ্বালাধরা চোখে দেশের ক্রিকেট দেখা আরো লাখো জনতার ভাই সে। তাই যখন এইসব অশালীন মন্তব্য দেখি, আমার বুকে হাহাকার লেগে যায়। নোনা দেয়াল বেয়ে চোখের জলগুলো তখন চিৎকার দিয়ে বলে,
 
 
463746038
 
 
 
দুঃখিত সাকিব আল হাসান।
তুমি হয়ত হবে এই বাংলাদেশের জান।
তুমিই হয়ত হবে এই বাংলাদেশের প্রাণ।
কিন্তু আমি এবং আমরা নিষ্প্রাণ।
জানহীন, প্রাণহীন...
তবুও কেন জানি গাই নতুন দিনের গান!!!