X
GO11IPL2020
  • ক্রিকেট

নাফিস ইকবালঃ একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম

পোস্টটি ১৪৭৩৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারের সন্তান তিনি। বাবা প্রয়াত ইকবাল খান স্বপ্ন দেখতেন ছেলেদের নিয়ে। চাচা বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবিসংবাদিত নাম আকরাম খান। ক্রিকেটটা পারিবারিকভাবেই পেয়েছে দুই ভাই। ছোট ভাই তামিম ইকবাল মাঝে মধ্যেই বলেন ভাইয়ার সাথে অন্তত একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ওপেন করতে চান, এটা নাকি তার অনেক দিনের লালিত স্বপ্ন। কিন্তু জাতীয় দলে আসার প্রতিযোগিতা থেকে অনেক আগেই ছিটকে গেছেন বড় ভাই নাফিস ইকবাল, স্বপ্নটা তাই শেষতক অপূর্ণই থেকে গেছে।

দারুন সম্ভাবনা! দারুন সুচনা! অতঃপর ছন্দপতন! প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অকালে ঝড়ে পড়া এক দীর্ঘশ্বাসের নাম নাফিস ইকবাল। অথচ তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিলো উজ্জ্বল। আলোর ঝলকানির মতো। একটা সময় হন্যে হয়ে নতুন ওপেনার খুঁজতে থাকা বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলো নাফিসকে পেয়ে। টেষ্ট কিংবা ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শুরুটা যে খুব বড় ইনিংস দিয়ে ছিলো তা কিন্তু নয়। কিন্তু ঐ ছোট্ট ছোট্ট ইনিংসের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আগামী দিনের সম্ভাবনা।

নাফিস ইকবাল পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন ২০০৩ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বাংলাদেশ সফরের সময়। সফরের দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশ 'এ' দলের হয়ে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে রীতিমতো হইচই ফেলে দেন ১৮ বছরের তরুণ এই ডানহাতি ওপেনার। হার্মিসন, হগার্ড, অ্যান্ডারসন, জাইলস, ব্যাটিদের সমন্বয়ে গঠিত ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণ ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরীর জন্য যতোটা না শিরোনাম হয়েছিলেন তাঁর চেয়ে বড় কারণ ছিলো ইংলিশ স্পিনারদের নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যের কারণে। ইনিংস শেষে ইংলিশ স্পিনারদের 'অর্ডিনারি' বলে ব্রিটিশ মিডিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন নাফিস। অথচ তখনো জাতীয় দলে অভিষেকই হয়নি তাঁর।

তবে সেবার ইংল্যান্ডের সাথে টেস্ট সিরিজে সুযোগ হয় নি তার। কেননা অনুর্ধ্ব ১৯ দলের অধিনায়ক হয়ে ওই সময় তাকে পাকিস্তান সফরে যেতে হয়েছিল একটা টুর্নামেন্ট খেলতে। সেখান থেকে ফিরে এসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় নাফিস ইকবালের। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল নাফিসের ঘরের মাঠ চট্টগ্রামের এম.এ আজিজ স্টেডিয়ামে। অবশ্য সেদিন ব্যাট হাতে তেমন কিছু করতে পারেন নি তিনি। জিমি অ্যান্ডারসনের আউটসুইংয়ে স্লিপে ক্যাচ দেয়ার আগে করতে পেরেছিলেন মাত্র ৯ রান।

২০০৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে দলের সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন নাফিস ইকবাল। ৮ ম্যাচে ৩ ফিফটিতে ৫০.৮৩ গড়ে করেছিলেন ৩০৫ রান। হয়েছিলেন টুর্নামেণ্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

২০০৪ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। নাফিস ইকবালও ছিলেন সেই দলে। প্রস্তুতি ম্যাচে চমকে দেয়া সেই সেঞ্চুরির সুবাদে ইংলিশদের কাছে আগে থেকেই তাঁর একটা 'সুনাম' ছিল তাই নাফিসকে ঘিরে লোকাল মিডিয়াগুলোতে আলাদা একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী সাউথ আফ্রিকা। মাত্র ৯৩ রানে অলআউট হওয়ার পথে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন নাফিস ইকবাল। তিনে নেমে খেলেছিলেন ৬ টি চারের সহায়তায় ৫৮ বলে ৪০ রানের ছোট্ট কিন্তু দর্শনীয় এক ইনিংস। শন পোলকের বলে খেলা ব্যাকফুট ড্রাইভ কিংবা এনটিনির বাউন্সারে খেলা দুর্দান্ত পুল শট ধারাভাষ্যকারদেরও মন জয় করে নিয়েছিল। বিশেষ কিছু শটে নিখুঁত টাইমিং দেখে ধারাভাষ্যকাররা তাঁকে নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। পোলক, ল্যাঙ্গেভেল্ট, এনটিনিদের গতি, বাউন্স আর সুইংয়ের দাপটে যেখানে বাংলাদেশের অন্য ব্যাটসম্যানরা ছিলেন দিশেহারা সেখানে সাবলীল ব্যাটিংয়ে স্ট্রোকের ফুলঝুড়ি ছুটিয়েছিলেন স্টাইলিশ এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান । স্কয়ার কাট ও কাভার ড্রাইভে নিকি বোয়েকে টানা দুটো চার মারার পর তৃতীয় বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে মিড অনে ধরা পড়েন গিবসের হাতে।

নাফিস ইকবালের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ২০০৪ সালের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১ রানে আউট হয়ে গেলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে দেখিয়েছিলেন তাঁর প্রতিভার ঝলক। ৬ চার ও ১ ছয়ে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪৯ রান করেছিলেন তিনি। ডাউন দ্য উইকেটে এসে ড্যানিয়েল ভেট্টোরিকে স্ট্রেট বাউন্ডারি দিয়ে উড়িয়ে মারা ছক্কাটা মনে থাকবে অনেকদিন।

তবে নাফিস ইকবালের মধ্যে বাংলাদেশ অসাধারণ এক ওপেনারের দেখা পেয়েছিল ২০০৫ সালে সেই ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে আগের টেস্টেই নিজেদের ইতিহাসে প্রথম জয়ের দেখা পেয়েছিল বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েকে হারিয়েছিল ২২৬ রানে। সে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে নাফিস খেলেছিলেন ৫৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ এক ইনিংস। দ্বিতীয় টেস্ট ছিল ঢাকায়। বাংলাদেশের লক্ষ্য তখন যেভাবেই হোক সিরিজ জয়। এ কারণে ঢাকা টেস্ট ড্র করাই ছিল মূল টার্গেট।

কিন্তু ঢাকায় প্রথম ইনিংসে জিম্বাবুয়েকে ২৯৮ রানে অলআউট করে দেয়ার পর নিজেরাও অলআউট হয়ে গিয়েছিল মাত্র ২১১ রানে। ৮৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা জিম্বাবুয়ে টাইবুর দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে (১৫৩) সংগ্রহ করেছিল ২৮৬ রান। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৭৪ রানের। হাতে প্রায় পুরো পাঁচটা সেশন বাকি। তখনকার দিনে চতুর্থ ইনিংসে ৩৭৪ রান তাড়া করে জেতা বাংলাদেশের জন্য ছিল রীতিমত স্বপ্নের ব্যাপার!

কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে উইকেটে পড়ে থাকার দায়িত্বটা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার জাভেদ ওমর বেলিম আর নাফিস ইকবাল। প্রায় ৮৩ ওভার অবিচ্ছিন্ন থেকে ওপেনিং জুটিতে দু’জন মিলে গড়েন ১৩৩ রানের জুটি। জাভেদ ওমর ৩৪০ মিনিট উইকেটে থেকে ৪৩ রানের ইনিংসে খেলেছিলেন ২৫৮ বল। আর নাফিস ইকবাল দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরির পাশাপাশি উইকেটে ছিলেন ৪৭০ মিনিট। আউট হবার আগে খেলেছিলেন ৩৫৫ বলে ১২১ রানের ধৈর্যশীল ও দারুণ সংযমী এক ইনিংস। শেষ পর্যন্ত ওটাই হয়ে রইল তার টেস্ট ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরি ও সেরা ইনিংস।

চতুর্থ ইনিংসে ১৪২ ওভার ব্যাট করে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ করেছিল ২৮৫ রান। রাজিন সালেহ আর খালেদ মাসুদ পাইলট শেষ পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থেকে টেস্টটা ড্র করেছিলেন। মরণপণ লড়াই শেষে ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ।

নাফিস ইকবালের মত সহজাত স্ট্রোকপ্লেয়িং ওপেনার তখনকার দিনে খুব কমই ছিল। অথচ বাংলাদেশের হয়ে তিনি ওয়ানডে খেলতে পেরেছেন মোটে ১৬ টি! শেষ ওয়ানডে ম্যাচটা খেলেছেন ২০০৫ সালের অষ্ট্রেলিয়া সফরে। নাফিস ইকবাল তাঁর ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ৫৮ রান করেছিলেন ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠ চট্টগ্রামে। ১৬ ওয়ানডেতে ১৯.৩১ গড়ে ২ ফিফটিতে রান করেছেন মাত্র ৩০৯।

ওয়ানডে দল থেকে ছিটকে পড়লেও টেষ্ট দলে অবশ্য ছিলেন আরো কিছুদিন। ২০০৪ এ নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে অভিষেক দিয়ে শুরু আর ২০০৬ এ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে খেলেছেন ক্যারিয়ারের শেষ টেষ্ট। বাংলাদেশের হয়ে টেষ্ট খেলেছেন মাত্র ১১টা। ২২ ইনিংসে ২৩.৫৪ গড়ে ২ ফিফটি আর ১ সেঞ্চুরিতে রান করেছেন ৫১৮।

ঘরোয়া ক্রিকেটে অবশ্য বরাবরই উজ্জ্বল ছিলেন নাফিস। ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারের পুরোটাই খেলেছেন চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে। এখন পর্যন্ত ১২০টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে ৩০.৯৬ গড়ে ৬২০২ রান আছে তাঁর সংগ্রহে। সেঞ্চুরী করেছেন ১০টি, হাফ সেঞ্চুরী আছে ৩১টি। ঘরোয়া ক্রিকেটের ওয়ানডে ভার্সনেও ২টি সেঞ্চুরী আছে তাঁর। লিস্ট 'এ' ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ১৫০* রানের ইনিংসটা খেললেন এই তো বছর তিনেক আগে রাজশাহীতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে ব্রাদার্সের হয়ে প্রাইম ব্যাংকের বিপক্ষে। এখনো ফুরিয়ে যান নি, ইনিংসটি ছিল হয়ত তারই ঘোষণা।

২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি ছিল তাঁর একত্রিশতম জন্মদিন। পরিসংখ্যানের বিচারে তার অর্জন হয়তো খুবই সামান্য। তবে মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়া সম্ভাবনাময় এই ওপেনারকে শুধু স্ট্যাটস দিয়ে বিচার করাটা বোধ হয় ঠিক হবে না। নাফিস ইকবালের এই অকালে ঝরে যাওয়াকে একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু ছাড়া আর কী বলবেন?