• ফুটবল

ফ্রম রিও ডি জেনিরো টু রিয়াল মাদ্রিদ : দা জার্নি অফ লয়ালটি

পোস্টটি ৮৮১৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

                   

                     marcelo-1397668529

 

বোটাফোগোর বিচে দুই টিমের মাঝে আলোচনা চলছে কে কোন রোল প্লে করতে চায় । কেউ পেলে, কেউ রিভালদো, কেউ গারিঞ্চা , কেউ রোনালদো দা লিমার রোল প্লে করতে চায়।

পাশ থেকে একটি বালক বলে উঠল “ আমি রবার্তো কার্লোস হতে চাই ”। সবাই পাশে ফিরে তাকাল । যে ছেলে কিনা খুব কম সময় ই খেলার চান্স পায় বলে কিনা আমি রবার্ত কার্লোস হতে চাই । কিন্তু সেইদিন সেই বালকের পায়ের কারুকার্জ দেখে তারা এতটাই মুগ্ধ হয় যে পরবর্তীতে যে দিন ই খেলা হত সবার প্রথম পছন্দ ছিল “ মার্সেলো ভিয়েরা দা সিলভা ” নামের সেই বালকটি ।  

রিও ডি জেনিরোর এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম । আহার ই যেখানে প্রকট সমস্যা ফুটবল সেখানে বিলাসিতা কিন্তু এ যে ব্রাজিল এখানে ফুটবল কে যে দেবতার মত পুজা করা হয় । শত দারিদ্রতার মাঝে ও ফুটবল ই যেখানে বেঁচে থাকার রসদ যোগায়।

পরিবারের মধ্যে মার্সেলোর দাদা পেদ্রো ভিয়েরা দা সিলভা ই ছিল একমাত্র ব্যাক্তি যে মার্সেলো কে ফুটবলার হতে উৎসাহিত করেছিলেন । মার্সেলোর মা ছিলেন স্কুল শিক্ষক । যথারীতি প্রত্যেক মায়ের মত তিনি ও চাইতেন ছেলে কেবল পড়াশুনা করুক কিন্তু দাদা পেদ্রো চাইতেন মার্সেলো পড়াশুনার পাশাপাশি ফুটবলটা ও চালিয়ে যাক ।

মার্সেলো প্রথম ফ্লুমিনেন্সের   নজরে পড়ে হেলেনিচোর হয়ে একটি ম্যাচ খেলার সময় । তারা তাকে ইলেভেন – এ – সাইড ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ জানায় । যদিও এতে মার্সেলোর ইচ্ছা ছিল না সে চেয়েছিল তার বাবার মত ফায়ার ম্যান  হতে কিন্তু তার দাদা ই তাকে সেখানে যেতে অনুপ্রানিত করে

কিন্তু তাদের কাছে যাতায়াতের ভাড়া ছিল না। যাতায়াতের এই ভাড়া যোগাড় করার জন্য তার দাদা কে এক্সট্রা কাজ করতে হয়েছিল।একদিন তাদের কাছে 25 Cent এর বেশি ছিল না । এটা দিয়ে ফ্লুমিনেন্সের ট্রেনিং গ্রাউনড জেরেমে যাওয়া সম্ভব না । দুর্ভাগ্য ক্রমে সেদিন ছিল সিলেকশনের দিন । ফ্লুমিনেন্স তাদের তিনজন প্লেয়ারকে সিনিয়র টিমে প্রমোট করবে । মার্সেলো আর তার দাদা ঠিক করল আজ তারা তাদের ভাগ্য পরীক্ষা করবে । যথারীতি তারা বারে চলে গেল । তারা বেটিং মেশিনে তাদের 25 cent এর রাখল । গেমটা এমন ছিল তুমি একটা দেশের পতাকা সিলেক্ট করবে এবং ফাইনালি যদি সেটা সিলেক্ট হয় তবে তুমি যেই টাকা রাখবে তার দ্বিগুন ফেরত পাবে । মারসেলো আর তার দাদা ক্রোয়েশিয়ার পতাকা সিলেক্ট করে এবং ফাইনালি তাদের পতাকা সিলেক্ট হয় । তারপর দাদা আর নাতি মিলে ঠিক করল ট্রেনিং ফিল্ডে যাবে । সৌভাগ্য দেবী সেদিন সবদিক দিয়ে বরণডালা সাজিয়ে রেখেছিল । মারসেলো সিনিয়র টিমে প্রমোট পায় ।

দাদা পেদ্রো পরবর্তীতে তাকে ট্রেনিং এ নিয়ে যাওয়ার জন্য Volkswagen Beetle কিনেন । নর্দান রিওর সেই জার্নিগুলোর  সুখস্মৃতি গুলোকে ধরে রাখতে মারসেলো তার ডান  হাতে Beetle এর ট্যাটু আঁকেন । মারসেলো তার ১৫ বছর বয়সে ই খেলাধুলা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চেয়েছিল । কিন্তু তার দাদা বরাবরের মত তখন ও তাকে চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে । সেই সময় সম্পর্কে মারসেলো বলে “ যদি আমার দাদা পেদ্রো আমার পাশে না থাকত তবে আমার পক্ষে ফুটবলার হওয়া সম্ভব হত না

 

                                      marcelo presentation

 

ছোট কাল থেকে ই তার রিয়াল মাদ্রিদ আর ব্রাজিলের খেলা দেখা হত । নিজে ও হয়ত ভাবে নি এত কম বয়সেই সেই রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট রেমন কালদেরন  সুদূর স্পেন থেকে তার জন্য অফার নিয়ে আসবে । পরবর্তীতে ১৪ নভেম্বর ২০০৬ তে ৬.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পাড়ি জমান রিয়াল মাদ্রিদে। তাকে রিয়াল মাদ্রিদে জয়েন করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বলেন “ দরকার হলে পায়ে হেটে স্পেনে পাড়ি জমাব” । রিয়াল মাদ্রিদে হয়ত চলে গিয়েছিলেন কিন্তু তাকে এখন ও ফ্লুমিনেন্সের ওয়ান অফ দা Crown Jewel হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । অনেক প্লেয়ারের কাছে যেখানে রিয়াল মাদ্রিদে জয়েন করাই অনেক এক্সাইটিং ব্যাপার সেখানে মারসেলোর কাছে ব্যাপার টা ছিল অনেকটা থ্রিলিং কারণ সে যে এখন তার বাল্য কালের আদর্শ রবার্ত কার্লস এর খুব কাছ থেকে শিখতে পারবে  

প্রথমে রিয়াল মাদ্রিদের উদ্দেশ্য ছিল তাকে কাস্তিয়া টিমে পাঠানো । কিন্তু সেখানে বাধা দেয় তৎকালিন রিয়াল মাদ্রিদ কোচ ফাবিও ক্যাপেলো । সে চায় মারসেলো  সিনিয়র টিমের সাথে ই থাকুক । মারসেলোর সেই ট্রানজিশন পিরিয়ড সম্পর্কে ক্যাপেলোর ফিজিসিয়ান ম্যাসিমো নেরি বলেন “ He was quick, technically good enough and had great athleticism, I remember he was polite and respectful and in his first month but he listened a lot “

একদিন ট্রেনিং সেশনে ডেভিড বেকহ্যামের ট্যাঁকেলে ইঞ্জুরিতে পড়ে রবার্ত কার্লস। ক্যাপেলো তখনও মারসেলোকে খেলানোর জন্য তৈরি ছিলেন না । তাই সে রবার্ত কার্লসের পরিবর্তে সার্জিও রামসকে নামায় । পরে সেকেন্ড হাফে তিনি মারসেলোকে নামাতে বাধ্য হন । সেটাই ছিল রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার ডেবু ম্যাচ যদিও রিয়াল সে ম্যাচে লা করুণার সাথে ২-০ গোলে হেরে যায় । সেই দিন সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করা হলে মারসেলো বলেন “ I am Proud to wear this Shirt . It is an honour to  defend this badge “

মার্চের প্রথম দিককার সময় গেতাফের বিপক্ষে ম্যাচ । ম্যাচের ৮৮ মিনিটে এ গঞ্জালো হিগুয়েনের বদলি হিসেবে মাঠে নামল মার্সেলো আর ফুটবল বিশ্ব দেখল অভাবনীয় এক দৃশ্য । এটাই ছিল অফিশিয়ালি একমাত্র মোমেন্ট যখন ফুটবলের দুই গ্রেটেস্ট লেফট ব্যাক এক সাথে একই ফুটবল পিচ শেয়ার করে

marcelo and roberto carlos

 

পরবর্তি সিজনে হয়ে উঠেন কোচ Bernd Schuster এর প্রথম পছন্দ । রবার্ত কার্লসের মত লিজেন্ডারি লেফট ব্যাকের জায়গা পূরণের চ্যালেঞ্জ । অনেকে হয়ত প্রত্যাশার চাপে ভেঙ্গে পড়ত কিন্তু এ যে মার্সেলো । বোটাফোগো বিচের সেই ছেলেটা যে এই স্বপ্ন দেখে  বড় হয়েছে । তাকে প্রত্যাশার চাপ আটকাবে কি করে ।

শুরুটা কিন্তু আজকের মত মসৃণ ছিল না । এল পেইসকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে মজা করতে করতে বলেন “ শুরুর দিকে আমি অনেক বড় বড় দাঁড়ি রাখতে চেয়েছিলাম যাতে আমাকে অনেক বয়স্ক মনে হয় কিন্তু একদিন এক লোক আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি রবার্ত কার্লস নই এবং আমি এখন ও আমার ২০ তম জন্ম বার্ষিকী সেলিব্রেট করি নি "

শুরুর দিকে মার্সেলো পজিশনগত দিক থেকে অনেক দুর্বল ছিলেন । সেই  সম্পর্কে মার্সেলো নিজে ই বলেন “ Sometimes I go in search of the ball and I go and go and go . I forget to come back. Sometimes I ran in one direction and get myself into bother but Heinge and Cannavaro keep me right so that I am not out of Position"

কঠোর পরিশ্রম একদিন না একদিন সামনে আসবেই । আস্তে আস্তে হয়ে উঠলেন বার্নাবুর পরিচিত এক হাস্যজ্বল মুখ । সেই সিজনে ১১ বার রিয়ালের হয়ে প্রথম একাদশের সাথে নামেন । রিয়াল ও তাদের লা লিগা পুনার্জন করে

2008-09 সিজনে কোচ জুয়ানদে রামস চাচ্ছিলেন মার্সেলো লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলুক । সেই পজিশন চেইঞ্জ সম্পর্কে মার্সেলো বলে “ প্রথম দিকে এটা আমাকে আশ্চর্যিত করেছে কিন্তু আমি এটা পছন্দ করতাম কারণ আমি সবসময় সামনে যেতে এবং গোল তৈরি করতে পছন্দ করতাম । লেফট ব্যাক  আমার ন্যাচারাল পজিশন কিন্ত আমি লেফট উইং এ খেলা ও উপভোগ করতাম "

২০০৯ -১০ ক্যাম্পেনে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হয়ে আসেন ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি । তিনি এসে ই মার্সেলোর ডিফেন্সিভ ওয়ার্কের দিকে মনোযোগ দিলেন । তখনও মার্সেলো  মাঝে মাঝে লেফট উইং এ খেলত । কিন্তু রোনালদো আর কাকা আসার পর পুরোপুরি ভাবে আবার লেফট ব্যাক পজিশনে সুইচ করে । সেই সিজনের পারফ্রমেঞ্চের ফলে রিয়াল মাদ্রিদ বোর্ড তাকে আরও ৫ বছরের কন্টাক্ট রিনিউ করার অফার করে ।

পরবর্তীতে ২০১০-১১ সিজনে কোচ হয়ে আসে হোসে মৌরিনহ । তিনি মার্সেলোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য নিয়ে আসেন স্বদেশী লেফট ব্যাক কয়েন্ত্রাও কে । মৌরিনহ পরবর্তীতে বলেন “ I wasn’t sure at First but now I love him “

২০১৪ তে কার্লো আনচেলত্তি হয়ত মার্সেলোর কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে পারেন লিসবনে তার সেই গোলের জন্য কিন্তু সেই সিজনে আঞ্চেলত্তির আন্ডারে লেফট ব্যাক পজিশনে প্রায় অপ্রতিরোদ্ধ হয়ে উঠেন মার্সেলো । পরবর্তি সিজনে কার্লো আনচেলত্তি চলে গেলে মার্সেলো কে টিমের ভাইস ক্যাপ্টেন হিসেবে সিলেক্ট করা হয় ।

এবার এই সিজনের রিয়াল মাদ্রিদের দিকে তাকান । প্রায় ক্রস ই আসে হয় মার্সেলো বা কার্ভাহালের পা থেকে । ডিফেন্স এবং অ্যাটাকের দিক থেকে জিদানের ট্যাঁকটিকসের একটা গুরুত্তপুর্ন রোল প্লে করে এই মার্সেলো

 লা আনডেসিমা জয়ে রোনালদোর উইনিং গোলটা হয়ত ফ্রন্ট কাভারের সম্মান পায় কিংবা বেলের ক্রাম্প নিয়ে করা গোল নিয়ে চলে অনেক আলোচনা কিন্তু মার্সেলোর করা বুলেট গতির লেফট ফুটেড শটটা হয়ত পাদপ্রদিপের নিচে ই থেকে যায় । কিন্তু বুক চিরে নিংরে আসা এই মানুষটার ভালবাসাগুলো যে আপনার হৃদয় ছুতে বাধ্য । 

marcelo with iker

 

নিজের সামান্যতম ভুলে গোল খাওয়া কোন এক ম্যাচে দেখবেন জার্সি দিয়ে মুখ ঢাকছে একটা ছেলে। আবার দেখবেন উঠে দাঁড়িয়েছে সে । দৌড়াচ্ছে। একজন , দুইজন , তিনজনকে কাটিয়ে বলটা ছুড়ে দিল রোনালদোর কাছে।  গোল   

একি ছেলেটা যে আবার কাঁদছে । আবার কাঁদছে কেন ? আরে বোকা এ যে ভালবাসার কান্না, এ যে সাম্রাজ্য রক্ষার কান্না

                                                            বেঁচে থাকুক এই মানুষটার ভালবাসাগুলো 

 ( তথ্য ক্রেডিট : These Football Times  )