• ক্রিকেট

বার্থডে ট্রিবিউটঃ মাইকেল বেভান 'দ্য ফিনিশার'

পোস্টটি ৫৭১৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

আধুনিক সীমিত ওভারের ক্রিকেটে 'ফিনিশার' কথাটার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কঠিন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে ম্যাচ বের করে আনতে পারার বিশেষ ক্ষমতার জন্য ফিনিশাররা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। একজন ভাল ফিনিশারের বৈশিষ্ট্য হল প্রচন্ড চাপের মুহূর্তেও দ্রুত রান করার ক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া।

আমার দেখা যেসকল ক্রিকেটার বিভিন্ন সময়ে ফিনিশারের ভূমিকায় নিজেদের জাত চিনিয়েছেন তাদের কয়েকজনের নাম বলছি। যেমন: মাইকেল বেভান, মহেন্দ্র সিং ধোনি, ল্যান্স ক্লুজনার, বিরাট কোহলি, এবি ডি ভিলিয়ার্স, অরবিন্দ ডি সিলভা, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ইনজামাম-উল-হক, আব্দুল রাজ্জাক, মাইকেল হাসি, অজয় জাদেজা, যুবরাজ সিং, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, ক্রিস কেয়ার্নস, কেভিন পিটারসেন, পল কলিংউড, জস বাটলার, রাসেল আরনল্ড, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস, এউইন মরগ্যান, হ্যান্সি ক্রনিয়ে, জন্টি রোডস, মার্ক বাউচার, জাস্টিন কেম্প, নাসির হোসেন, জেমস ফকনার।

ক্রিকেট অভিধানে 'ফিনিশার' শব্দটির প্রবর্তন হয়েছে মাইকেল বেভানের হাত ধরে। অজিদের হয়ে ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময়ই একজন সফল ফিনিশারের ভূমিকায় দেখা গেছে তাঁকে। টেস্ট খেললেও বেভানের মূল পরিচয় মূলত একজন ওয়ানডে স্পেশালিষ্ট।  দশ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে খেলা ২৩২ ওয়ানডেতে বেভানের সংগ্রহ ৬ হাজার ৯'শ ৩২ রান। ৪৬ টি হাফ সেঞ্চুরির সাথে আছে ৬টি সেঞ্চুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল,  ১৯৬ ইনিংসে ব্যাট করে রেকর্ড ৬৭ বার অপরাজিত থেকেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত অবসর নেয়াদের মধ্যে ওয়ানডের সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় (৫৩.৫৮) বেভানের। সাকসেসফুল রান তাড়ায় বেভানের ব্যাটিং গড় ৮৬.২৫ যা ওয়ানডে ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মাত্র দুজন খেলোয়াড়ের (অন্যজন মাইক হাসি) মধ্যে বেভান একজন যার ক্যারিয়ার গড় কখনোই ৪০ এর নিচে নামে নি! 

ওয়ানডেতে ফিনিশার হিসেবে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন তিনি। নিশ্চিত হেরে যাওয়া অনেক ম্যাচও প্রায় একা হাতে জিতিয়েছেন ইতিহাসের অন্যতম আন্ডাররেটেড এই বাঁহাতি ব্যাটিং জিনিয়াস। 

তার বিখ্যাত ইনিংসগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা ইনিংসটি খেলেছিলেন ১৯৯৬ সালে সিডনী ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সেই দলে ছিলেন ওয়ালশ, গিবসন, অ্যাম্ব্রোস, হার্পারের মত বোলার। ওই ম্যাচে ১৭৩ তাড়া করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল এক পর্যায়ে ৩৮/৬। সেখান থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ বের করে এনেছিলেন বেভান। ৬ নম্বরে নেমে প্রায় ১৫০ মিনিট ক্রিজে থেকে বেভান খেলেছিলেন ৮৮ বলে অপরাজিত ৭৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। শেষ বলে জয়ের জন্য দরকার ছিল ৪ রান। অফ স্পিনার রজার হার্পারের করা বলটিকে সোজা মাথার উপর দিয়ে সীমানাছাড়া করে শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচের ইতি টানেন তিনি। অনেকের মতে এটাই ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।

অজিদের হয়ে '৯৯ ও '০৩ ওয়ার্ল্ড কাপ জেতা বেভান আলো ছড়িয়েছেন বিশ্বকাপের মত বৈশ্বিক টুর্ণামেন্টেও। '৯৬ ও '৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেছেন ৬৯ ও ৬৫ রানের মূল্যবান দুটো ইনিংস। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ম্যাচে তাঁকে দেখা গিয়েছিল সত্যিকার ফিনিশার রূপে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০৪ রান চেজ করতে গিয়ে অসিদের স্কোর যখন ৪৮/৪ ঠিক তখন ব্যাট হাতে নেমেছিলেন তিনি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে একসময় তাদের স্কোর দাঁড়ায় ১৩৫/৮। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ছিল ৭০ রান। ৯ম উইকেটে অ্যান্ডি বিকেলের (৩৪*) সাথে অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে দারুণ এক জয় এনে দিয়েছিলেন বেভান (৭৪*)। সুপার সিক্সে কিউইদের বিরুদ্ধে ম্যাচটিতেও বিকেলকে নিয়ে ম্যাচ উইনিং পার্টনারশিপ গড়েন তিনি। অপরাজিত ৫৬ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয় (৮৪/৭) থেকে টেনে তোলেন বেভান। ম্যাচ জেতানো এরকম আরো অনেক ইনিংস রয়েছে তাঁর ক্যারিয়ারে।

05201F2D03A14C67BF40A16DE44F01E4.ashx

সো কলড বিগ হিটার না হয়েও যে আস্কিং রেটে ওভার প্রতি ৮-১০ রান নেওয়া সম্ভব সেটা বেভানই প্রথম দেখিয়েছিলেন। অনেক সময় তাকে পরিস্থিতির কারণে অ্যাঙ্কর রোল প্লে করতে হত। টপ অর্ডারে দ্রুত উইকেট পড়ে গেলে ইনিংসের হাল ধরার দায়িত্বটাও তাঁকেই নিতে হত। এসব পরিস্থিতিতে বেভান হয়ে উঠেছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। মাথা ঠান্ডা রেখে বোলারদের খুব ভাল গ্রাইন্ড করতে পারতেন। অহেতুক বড় শটে না গিয়ে সিঙ্গেলস-ডাবলস নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে বেভানের কোন তুলনা ছিল না। স্ট্রাইক রোটেশন, ফাইন্ডিং দ্য গ্যাপস ও রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে বেভান ছিলেন এককথায় দুর্দান্ত। পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে বিগহিট খেলার সামর্থ্যও ছিল তাঁর। প্রয়োজন বুঝে ক্যালকুলেটিভ রিস্ক নিয়ে আস্কিং রেট নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।
 
ম্যাচ সিচুয়েশনের কারণে বেভানকে অনেক সময়ই টেলএন্ডারদের সাথে লম্বা সময় ব্যাটিং করতে হয়েছে। তবে ধীরস্থির ও ঠান্ডা মেজাজের কারণে যে কোন পরিস্থিতিতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতেন তিনি। তাঁর ছিল ইস্পাতকঠিন মনোবল এবং সলিড টেম্পারামেন্ট যার কারণে তিনি টেলএন্ডারদের নিয়েও অনায়াসে ব্যাটিং করতে পারতেন।
 
204491
 
ক্রিকইনফো একবার বেভান সম্পর্কে লিখেছিল, "He just did not get out in crunch situations. His unreal capacity to deliver almost every time made him stand out in a team of superstars."
 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রিকেট ইতিহাসের বেস্ট ফিনিশার কে? মাইকেল বেভান নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি? দুজনেরই ব্যাটিং রেকর্ড অসাধারণ। ধোনি বেভানের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং এখনও খেলছেন। হিসেব করলে দেখা যাবে বেভানের চেয়ে ধোনির ফিনিশার হিসেবে খেলা ইনিংসের সংখ্যা বেশি। এমনকি সফল রান তাড়া করায় ধোনির রানসংখ্যা, গড়, স্ট্রাইক রেটও অন্য সবার তুলনায় বেশি। বিগহিটার হিসেবেও ধোনি এগিয়ে থাকবেন (বেভানের ২১ টি ছক্কার বিপরীতে ধোনির ১৮৩ টি)। মজার ব্যাপার হল বেভানের (১৯৯৪-২০০৪) ক্যারিয়ার যখন শেষ ধোনির (২০০৪-) শুরুটা ঠিক তখনই। তাই বলতে গেলে দুজন প্রায় দুই জেনারেশনের প্লেয়ার। তবে একথা মানতে হবে যে বেভানের সময়ে এত বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ ছিল না, টি২০ ক্রিকেট ছিল না; ব্যাটিং পাওয়ার প্লে, বিগার অ্যান্ড থিকার ব্যাট, শর্ট বাউন্ডারি, ব্যাটিং উপযোগী ফ্লাট উইকেট, দুটো নতুন বলে খেলার সুবিধা, এসবের কোনটাই ছিল না। এসব সুবিধা পেলে তার পরিসংখ্যান আরও অনেক সমৃদ্ধ থাকত। শুধু তাই না, বেভান যে কোয়ালিটির বোলারদের বিপক্ষে রান করেছেন সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ওয়াসিম, ওয়াকার, শোয়েব, ভাস, মুরালি, সাকলাইন, কুম্বলে, ওয়ালশ, এ্যাম্ব্রোস, বন্ড, কেয়ার্নস, ভেট্টোরি, পোলক, ডোনাল্ড, এনটিনি, স্ট্রিকদের মত টপ ক্লাস বোলারদের সামলাতে হত তাকে। 
 
ধোনির কৃতিত্বকে কোনভাবে খাটো না করেই বলছি, ধোনির বেশিরভাগ ম্যাচ জেতানো ইনিংসগুলো এসেছে সাব কন্টিনেন্টের পাটা ব্যাটিং পিচে এবং বিশেষ করে শ্রীলংকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশের দুর্বল বোলিং অ্যাটাকের বিপক্ষে। অন্যদিকে বেভান তার ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ ম্যাচই খেলেছেন বাউন্সি সিমিং কন্ডিশনে তুলনামূলক শক্তিশালী বোলিং অ্যাটাকের বিরুদ্ধে। তাই পরিসংখ্যানে ধোনি এগিয়ে থাকলেও বেভান ধোনির চেয়ে কোন অংশে কম ছিলেন না। বরং কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটির বিচারে বেভানই কিছুটা এগিয়ে থাকবেন। দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নেয়া কঠিন হলেও আমার ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে বেভানকেই ওয়ানডের সেরা ফিনিশার হিসেবে বেছে নেব।
 
ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান মাইকেল বেভানের আজ ৪৭ তম শুভ জন্মদিন।
 
হ্যাপি বার্থডে বেভো।
এক রাশিয়ান ঈগলের গল্প
    অন্যান্য
এক রাশিয়ান ঈগলের গল্প
তুমি আসবে বলে.....!
    ক্রিকেট
তুমি আসবে বলে.....!
নীরবে তুলির আঁচড় দিয়ে যাওয়া নিভৃত এক শিল্পী
    ফুটবল
নীরবে তুলির আঁচড় দিয়ে যাওয়া নিভৃত এক শিল্পী
অস্ট্রেলিয়ার একুশ, আরেকবার
    ক্রিকেট
অস্ট্রেলিয়ার একুশ, আরেকবার
এল ক্লাসিকো - স্পেনীশ দ্রুপদী লড়াই
    ফুটবল
এল ক্লাসিকো - স্পেনীশ দ্রুপদী লড়াই