• ফুটবল

পল স্কোলস : দা ব্রেইন অফ ফুটবল

পোস্টটি ৩৯৮২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

আইরয়েল নদীর তীর ঘিরে গড়ে উঠা উত্তর ইংল্যান্ডের একটি শহর সালফোর্ড । ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের সময় এই দিকটায় অনেক শিল্প বাণিজ্য গড়ে উঠে । এই জন্য এই শহর এখনও শিল্প বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত

এই শহরেই জন্ম “ ফুটবল ব্রেইন “ খ্যাত পল স্কোলসের। তার জন্মের ১৮ মাসের মাথায় স্কোলস পরিবার চলে আসে ল্যাঙলে শহরে । শহরের উত্তর দিকে উড স্ট্রিটের পাশেই সেন্ট মেরি আরসি স্কুল । সে স্কুলেই ভর্তি হয় স্কোলস ।

তার প্রথম ফুটবল খেলা শুরু হয় ল্যাঙলে ফুরোর হয়ে । প্রথম ফুটবল ম্যাচ ছিল তারই স্কুলের আরেকটি টিমের সাথে যদিও ম্যাচটি জঘন্যভাবে হেরে যায় তার দল

পরবর্তীতে সে স্কুল পরিবর্তন করে চলে আসে কার্ডিনাল ল্যাঙলে আরসি স্কুলে যেখানে সে একই সাথে ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটি খেলায় পারদর্শী ছিল । এখানে তার টিম টানা ৫ বার ক্যাথলিক কাপ ট্রপি জিতে নেয় । পরবর্তিতে সে ১১ বছর বয়সে ওল্ডহ্যাম সকার ক্লাবে যোগ দেয়  ।

তার ছোটবেলার হিরো ছিল ওল্ডহ্যাম সকারের স্ট্রাইকার ফ্রাঙ্কি বান। সেই সময়ের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্কাউট Coffey তার সম্পর্কে বলেন “ সে ছিল পুরোপুরি ফুটবল পাগল । আমি তাকে স্কুলের প্রথম বছরের টিম থেকে দেখে আসছি । সামাজিক ভাবে আমরা যাকে  আত্নবিশ্বাসি বলি সে সেটা ছিল না কিন্তু আপনি তাকে কয়েকজন বালকের একটা গ্রুপ আর একটা ফুটবল দেন সে শান্ত থাকবে না “

সে তখন বাউন্ডারি পার্কের জুনিয়র টিমের হয়ে খেলত । তার তখনকার সেই টিমমেটদের নাম শুনতে চান ?  আচ্ছা বলি তাহলে । নেভিল ব্রাদার , নিকি বাট । Coffey একদিন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আরেক স্কাউট ব্রায়ান কিডকে উৎসাহিত করে স্কোলসকে ক্লাবের ইয়ুথ টিমে যোগ করার ব্যাপারে। সেই সময় ব্রায়ান মিডলটনে একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করে । সে দেখে যে পল স্কোলসের টিম ও সেই লিস্টে আছে । সেই টুর্নামেন্টে স্কোলসকে প্রথম দেখা সম্পর্কে ব্রায়ান বলে

                       "Out of the five of them, three of the lads came to the centre of excellence: Scholesy,  Dean Kirby and Paul O’Keefe. Scholesy was no size, but the ability he had was unbelievable. His awareness and his touch… what a technician, even at that tender age.”

সেদিনের খেলার পরপরই ব্রায়ান তার সম্পর্কে ভালভাবে খোঁজখবর নেয়া শুরু করে ।  সে দেখে যে স্কোলস ওল্ডহ্যাম সকারের হয়ে খেলে ।  সেই সময় ওল্ডহ্যাম ভাল ভাল প্লেয়ার তৈরি করার জন্য বিখ্যাত ছিল ।  পরবর্তীতে ব্রায়ান তার বাবা-মা এর সাথে দেখা করে তাকে সাইন করার ব্যাপারে ।  কিন্তু বয়সের কারণে তারা তাকে তখন সাইন করাতে পারে নি কিন্তু এমন একটা ট্যালেন্ট কি ইউনাইটেড সহজে হাতছাড়া করতে পারে । 

পরবর্তী মে তে তারা তাকে সাইন করায় । স্কোলস যখন প্রথম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে সাইন করে তখন সবাই তার সাইজ নিয়ে সন্দিহান ছিল

 

              133138hp2

                                          

                                                                 He’s got no chance – he’s a midget,”

এটাই ছিল পল স্কোলসকে প্রথম দেখার পর স্যার আর্লেক্স ফারগুসনের প্রথম অভিব্যাক্তি । বোধহয় এরপর যতবার ই স্কোলসকে দেখেছেন ততবার ই নিজেকে বলেছেন কি করে এত বড় ভুল করল আমার চোখ

 অবশ্য এটা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল । কেই বা মনে করেছিল ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির এই ছেলেই একদিন ফুটবল বিশ্ব কে শিখাবে কি করে ফুটবলটা খেলতে হয় 

এরিক ক্যানটোনা আর ইউনাইটেডের ইয়ুথ কোচ হারিসন একবার আলাপ করছিলেন ফ্রেঞ্জ আর ইংলিশ ফুটবলারদের মাঝে পার্থক্য কোথায়? তো এরিক ক্যানটোনা বলে ফ্রেঞ্জ ফুটবলাররা বোধহয় ইংলিশদের তুলনায় একটু ভাল বল রিসিভ করে । তখন হারিসন বলে মনে রেখ পল স্কোলস কিন্তু আমাদের হয়ে খেলে

 

                    550x298_david-beckham-reunites-with-the-manchester-united-class-of--92-4353

 

পরবর্তীতে রায়ান গিগস , ডেভিড বেকহ্যাম , গ্যারি নেভিল , নিকি বাট এদের সাথে মিলে গড়ে তুলেন ‘’The 1990s Fledglings” যা পরবর্তীতে ’৯২ ক্লাস হিসেবে পরিচিত হয় ।

 “ বন্ধুত্ব , ফুটবল আর আনন্দ “ তিনটাকে একসাথে করলে যা হয় তাই ছিল এই দলটার মধ্যে । এরা এমন একগুচ্ছ ফুটবল সারথি ছিল যা শুধু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কেন পুরো ফুটবল বিশ্বেই যাদেরকে ওয়ান অফ দা গ্রেটেস্ট ফুটবল গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ।  

স্কোলস যদিও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সেই ’৯২ ইয়ুথ এফ এ কাপ “ জয়ী টিমের সদস্য ছিল না কিন্তু পরবর্তি বছরের এফ এ কাপ ফাইনাল খেলা টিমের গুরুত্তপুর্ন সদস্য ছিলেন । যা তাকে পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে 10 নম্বর জার্সি এনে দেয় কিন্তু তখনও তার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সিনিয়র টিমের হয়ে খেলা হয় নি ।

21 সেপ্টেম্বর , 1994

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামলেন পল স্কোলস । ম্যাচের শুরুতেই ১-০ গোলে এগিয়ে যায় পোর্ট ভেইল । পরবর্তীতে এই স্কোলসের গোলেই সমতায় ফিরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড । ম্যাচের তখন ৫৩ মিনিট । লেফট উইং থেকে ডেভিসের ক্রস । স্কোলস একটু পিছনে ছিলেন । দৌড়ে এসে করলেন বুলেট গতির এক হেড । গোল । সেই হেড যার জন্য ছোটবেলায় সবাই তার ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে আশঙ্কায় ছিল । গ্রেট প্লেয়াররা বোধহয় এমন ই হয় । প্রতিবন্ধকতা গুলোকে এড়িয়ে এসেই তো এরা বাকি সবাইকে ছাড়িয়ে যায় ।

তিনদিন পরেই প্রিমিয়ার লিগে ডেবু হয় তার । Ipswich Town এর বিপক্ষে সে ম্যাচে যদি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ৩-২ গোলে হেরে যায় । সে সিজনে স্কোলস কখনও স্ট্রাইকার কখনও বা স্ট্রাইকারের ঠিক পিছনে নাম্বার ৯ রোল প্লে করে

পরবর্তী সিজনে মার্ক হিউজ এর চেলসি  চলে যাওয়া আর এরিক ক্যান্টনার সাস্পেন্সনের কারণে স্কোলস আরও বেশি করে ফার্স্ট টিমে চান্স পায় । সেই সিজনে টোটাল সব ধরনের প্রতিযোগিতায় ১৪ গোল করে পল স্কোলস। সেই সিজনে তার জার্সি নম্বর বদল করে ’18 দেয়া হয় যা পরবর্তীতে ট্রেডমার্ক পল স্কোলস ’18 হিসেবে পরিচিত হয় । এই জার্সি পরেই কাঁটিয়ে দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ১৫ টি বছর । সেই সিজনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও তাদের প্রিমিয়ার লিগ ট্রপি ঘরে তুলে নেয়

পরবর্তী সিজনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়ার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন । ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড চাচ্ছিল অ্যালান শিয়েরার কে কিনতে । কিন্তু ব্ল্যাকবার্ন চাচ্ছিল পল স্কোলসকে সেই ডিলে সংযুক্ত করতে । যাই হোক পরবর্তীতে সেই ডিলটি আর হয় নি । সেই সময় আবার রয় কিন  ইঞ্জুরিতে পড়ে তার পুরো সিজন শেষ হয়ে গেলে স্কোলস কে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পজিশনে নিয়ে আসা হয় ।

 

               161242_60_news_hub_multi_630x0

 

পরবর্তী সিজনে রয় কিন ফিরে এলে গড়ে তুলেন এক অপ্রতিরোধ্য মিডফিল্ড যা যে কোন দলের জন্যই হিংসাজনক ।  প্রিমিয়ার লিগ , এফ এ কাপ অলরেডি ঘরে চলে এসেছে ইউনাইটেডের । উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খেলা তখন ও চলছে।

জুভেন্টাসের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচ । কার্ড জনিত সমস্যার কারণে স্যার আর্লেক্স ফারগুসন তাকে প্রথম হাফে নামায় নি । সেকেন্ড হাফে বদলি হিসেবে নামে স্কোলস । ম্যাচের ৭৭ মিনিটে দেশচ্যাঁম্প কে ফাউল করে ইয়েলো কার্ড পায় স্কোলস যার ফলে মিস করে ১৯৯৯ এ বায়ার্নের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল ।

আমরা সবাই জানি স্কোলস অনেকটা শান্ত প্রকৃতির মানুষ । কিন্তু কতটা শান্ত সেটা হয়ত অনেকে জানি না । ১৯৯৯ এ ওয়েম্বলিতে পোল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে হ্যাট্রিক করার করার পর সেলিব্রেসন করতে গিয়ে পর্যন্ত ভাবে ওহ নো, আমাকে এখন প্রেসের মুখোমুখি হতে হবে  

                                                                                            “হেয়ার ড্রেসার “

নাম শুনেছেন এর আগে? ফার্গি আমলে কয়েকটি প্রচলিত শব্দের একটি । যখন ই কোন প্লেয়ার মাঠে খারাপ খেলত তখনই তাকে ড্রেসিং রুমে ফার্গির বিখ্যাত হেয়ার ড্রেসিং দেয়া হত । স্কোলসও তার থেকে বাদ যায় নি । নিউক্যাসলের বিপক্ষে একবার এক ম্যাচের সেকেন্ড হাফে ফার্গি মাঠে নামান স্কোলস্কে । মাঠে নেমেই বারবার বল লুজ করতে থাকে সে । ম্যাচের পর ফারগুসনের সেই হেয়ার ড্রেসারের মুখমুখি হতে হয় তাকে । সেটিই নাকি  ছিল তার পাওয়া সবচেয়ে বড় হেয়ার ড্রেসার। তাই বলে ভাববেন না ফারগুসনের সাথে তার কেবল হেয়ার ড্রেসার সম্পর্ক ছিল । ট্রেনিং গ্রাউন্ডে নাকি স্কোলস প্রায় প্রতিদিন ই মজা করে ফারগুসনের মাথায় একটা বল হিট করত  

১৯৯৯ এর সেই ফাইনাল মিসের আক্ষেপ মোচন করেন ২০০৮ এ এসে । সেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ে গুরুত্তপুর্ন ভূমিকা ছিল পল স্কোলসের । বার্সার বিপক্ষে সেমিতে করা সেই গোলটার কথা কি চাইলেও ভুলা যায়  

খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন অনেকটা “ ডিপ লায়িং প্লেমেকার “ । তার পাসিং এবিলিটি ছিল আসাধারন । কতটা অসাধারান সে সম্পর্কে একটা গল্প শেয়ার করি

                    পল নাকি প্রায়ই ৪০ ইয়ার্ড দূরের এক গাছ দেখিয়ে বলত আমি এখন এটা হিট করব এবং    সে এটা পারতও । তো একদিন গ্যারি নেভিল ফেঞ্চের পাশে মূত্রত্যাগ করছিল ।  স্কোলস প্রায় ৪৫ ইয়ার্ড দূরে ছিল । সে সেখান থেকে একটি বল ছুড়ে যা কিনা গ্যারি নেভিলের Arse এ গিয়ে আঘাত করে । তার পাসিং এর এই ক্ষমতার জন্য তাকে Sat-nav হিসেবে ডাকা হত ।

 

         article-2022904-0D5075B100000578-741_634x355

 

31 মে ২০১১

আগেই বলে দিয়েছিলেন এটাই হচ্ছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তার শেষ ম্যাচ । ম্যাচটি ছিল নিউইয়র্ক কসমসের বিপক্ষে টেস্টিমনিয়াল ম্যাচ ।

ওল্ড ট্রাফোর্ডের ৮৩০০০ দর্শক সেদিন তাদের এই ছেলের বিদায়ি ম্যাচ দেখতে আসে । গ্যালারিতে  বড় করে ফুটে উঠে

                   “ Genius “  

পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইঞ্জুরি ক্রাইসিসের কারনে আবার ফিরে আসতে হয় তাকে । সে সিজনেও গোল করে স্কোলস । যা সে সময়কার রেকর্ড ছিল । তার আগে কেউ টানা ১৯ প্রিমিয়ার লিগে গোল করতে পারে নি যা পরবর্তীতে রায়ান গিগস অতিক্রম করে ।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্যারিয়ার

      টোটাল ম্যাচ – ৭১৮

      টোটাল গোল – ১৫৫

জর্জ বেস্ট তো আর এমনি এমনি বলে নি ছেলে টা খেলতে জানত কিংবা জিনেদিন জিদান তো আর এমনি এমনি বলে নি স্কোলসই তার দেখা সেরা প্লেয়ার

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যে আজও এই ছেলেটার খেলা দেখার অপেক্ষায় বসে থাকে। আজও হয়ত ইউনাইটেডের একাডেমীর কোন এক প্লেয়ার কে যদি গিয়ে জিজ্ঞেস করেন তুমি কার মত খেলতে চাও ? হয়ত দেখবেন এই পল স্কোলসের নাম ই উঠে আসবে । কারণ  ওল্ড ট্রাফোর্ড থেকে যে আজও ভেসে আসে

“ Giggs done well there . Giggs passes the ball to Roy keane . Roy keane to Beckham . Beckham delivers the ball to Scholes . Oh !! What a Goal !! What a way to finish . A Screamer From Paul Scholes “ 

 

 ( তথ্য ক্রেডিট : BBC Home, Manchester United Official , The Guardian, Four Four Two Football Magazine ,TheseFootball Magazine )