• ফুটবল

রূপকথার রাতঃ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল

পোস্টটি ৫২১৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

স্টিভেন জেরার্ড, জের্জি দুদেক, হুলিয়ানো বেলেত্তি, পিপো ইনঝাঘি,রিকার্ডো কাকা, এডউইন ভ্যান ডার সার, লিও মেসি, ডিয়েগো মিলিতো, দিদিয়ের দ্রগবা, আরিয়েন রোবেন, সার্জিও রামোস, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, আনহেল ডি মারিয়া এই নামগুলোর মধ্যে আছেন ফুটবলের মহানায়কেরা। আবার আছেন এমন কিছু ফুটবলার যারা হারিয়ে গেছেন সময়ের অন্তরালে। কিন্তু তাঁদের সবার মধ্যে একটি ব্যাপারে বড্ড মিল। গত একযুগের সবকটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল এদের স্মরণ করবে প্রাপ্তি আর অর্জনের অহংকার নিয়ে। ফুটবলে প্রতিটি রাতই রোমাঞ্চের। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালের রাতের রোমাঞ্চ ছাঁপিয়ে যাওয়া দুষ্কর। এ রাত হয়ত অনেক সময় ফিঁকে করে দেয় বিশ্বকাপ ফাইনাল মঞ্চের আলোকেও।

২০০৫ এর ইস্তানবুল মিরাকলের অন্যতম নায়ক জের্জি দুদেক স্মৃতিচারণ করেছেন, “জেমি কেরাগার সবচেয়ে উত্তেজিত ছিল শুট আউটের আগে। আমাকে গ্রোবেলার(১৯৮০-৯০ দশকের লিভারপুলের সাবেক গোলকিপার) এর মত ভিন্ন কিছু করতে বলে চিৎকার করছিল”। দুদেক আর রাফা বেনিতেজ এই পেনাল্টি নিয়ে ট্রেনিংয়ে কাটিয়েছেন আলাদা সময়। “রাফা আমাকে বলেন গোলকে ৬টি বর্গে ভাগ করে নিতে। পরে আমি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ভিডিও দেখি কে কোন বর্গে শট নেয়”। আন্দ্রে শেভচেংকোর শট রুখে দিয়ে দুদেক লিখে ফেলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রূপকথা ইস্তানবুল ০৫।

২০০৬ সালে আর্সেন ওয়েংগার ফরাসি খেলোয়াড়ে ভরা তার আর্সেনাল দল দিয়ে এসেছন তার নিজের দেশ ফ্রান্সে। আর রোনালদিনহোর জাদুতে বার্সেলোনা ১৪ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়ের কাছাকাছি। ১৮ মিনিটেই লাল কার্ড খেয়ে ইয়েন্স লেমান মাঠ ছাড়লেও আর্সেনাল এগিয়ে ছিল ৭৬ মিনিট পর্যন্ত। ইতোর সমতাসূচক গোলে ম্যাচে ফেরে বার্সা। আর হুলিয়ানো বেলেত্তির গোলে আবারো ইউরোপীয় রাজত্বের মানচিত্রে ফিরে আসে বার্সা। বেলেত্তির ভাষায়, “আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি গোল করেছি, আমি উদযাপন করতে চেয়েছিলাম কিন্তু হাঁটুগেড়ে বসে পড়ি মুখ ঢেকে। ম্যাচ শুরু আগে আমি কখনোই ভাবিনি আমি গোল করব। আমার সন্তানেরাও বিশ্বাস করতে পারে না যখন তারা গোলটা দেখে”।                                                                                           

87e9571e3e388e7ee31d7a9d3b06c6f2

২০০৭। এথেন্সে এবার মিলানের প্রতিশোধের পালা। পিপো ইনঝাঘি যেনো একাই হারিয়ে দিলেন লিভারপুলকে। ঐ সময়ের সেরা খেলোয়াড় কাকাও দিলেন নিজের মুন্সিয়ানার পরিচয়। গোলকিপার কাটিয়ে দ্বিতীয় গোল করার পর ইনঝাঘির উদযাপনের ভঙ্গিই বলে দিচ্ছিলো এমন ফাইনালে কার্লো আঞ্চেলোত্তির আস্থার প্রতিদান দিতে পেরে তিনি কতটা আনন্দিত। মিলান ৪ বছর পর ফিরে পেল হারানো রাজত্ব।

২০০৮ সালে বর্তমান সময়ের মত ইউরোপীয়ান ফুটবল স্প্যানিশদের হাতে ছিল না। ইংলিশ ফুটবলের তখন জয়জয়কার। ম্যান ইউ-চেলসি ফাইনালে মস্কোর সেই বৃষ্টি ভেজা রাতে ছিল ল্যাম্পার্ডের আবেগ, রোনাল্ডোর  পেনাল্টি রহস্য আর জন টেরির অশ্রু। এই ফাইনালে একটা নাম না বললেই নয়। ইগনাসিও-পালাসিওস-হুয়েরতা নামের এক ইকোনমিস্ট ভদ্রলোক কিভাবে ফুটবলে এলেন? ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এই গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট ১৯৯৫ সালে “প্রফেশনালস প্লে মিনিম্যাক্স” নামে একটি পেপার লিখতে শুরু করেন। যার বিষয়বস্তু ছিল ফুটবলের গেম থিওরি। এই পেপার লিখতে গিয়ে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন শত শত পেনাল্টি কিক। পিৎর চেককে সাহায্য করার জন্য ফাইনালের আগে তাকে নিযুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালের তরুণ রোনাল্ডো পেনাল্টি নিতে যেয়ে থামতেন প্রায়ই। ইগ্নাসিও বের করেন যে, রোনাল্ডো কিক নেওয়ার পথে থেমে গেলে ৮৫% ভাগ সময়েই তিনি কীপারের ডান দিকে শট নেন। চেক এই তথ্য মেনে নেন এবং রোনান্ডোর শট রুখে দেন। আনেলকার শট রুখে ভ্যান ডার সার শিরোপা ঘরে নিয়ে আসেন। পিছলে যান টেরি আর ভেঙ্গে যায় চেলসির ইউরোপীয় স্বপ্ন।

 edwin-3-1413418027 

২০০৯। রোম। গ্ল্যাডিয়েটরের শহর। ম্যাচের আগে পেপ গুয়ারডিওলা তার স্কোয়াডকে রাসেল ক্রো অভিনিত মাস্টারপীস 'গ্ল্যাডিয়েটর' চলচিত্রের অংশবিশেষ দেখানোর ব্যবস্থা করেন। ব্যস, বুঝে নেন এই দলকে আর কিছু বলতে হব না। তারা টানা দুইবার ফাইনাল খেলা ইউনাইটেডকে হারিয়ে শুরু করে স্পেন ও ইউরোপে নিজেদের রাজত্ব। গুয়ারডিওলার শুরুটাও সেখানেই।

২০১০। মাদ্রিদের বার্নাব্যু স্টেডিয়ামের স্বপ্নের ফাইনালে নেই রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু ছিলেন তাদের ভবিষ্যত কোচ হোসে মরিনহো তার উড়তে থাকা দল ইন্টারকে নিয়ে। বায়ার্নের কোচ তখন লুই ভ্যান হাল। বার্সায় এই ভ্যান হালেরই সহকারী ছিলেন মরিনহো। মিলিতোর জোড়া গোলে গুরুকে হারিয়ে দেন শিষ্য মরিনহো।

২০১১ ওয়েম্বলি ফাইনালের গল্পটা ২০০৯ এর মতই। নিজেরদের দেশের মাটিতে এবারও বার্সাকে টপকাতে পারলো না ইউনাইটেড। ক্যান্সারকে হারিয়ে মাঠে ফেরা এরিক আবিদাল অধিনায়কের বেশে কাপ তুলে ধরেন। গুয়ারডিওলার বার্সা যেন থামবেই না।

২০১২ সালে আবার ঘরের মাটিতে এমনকি নিজেদের মাটিতে ফাইনাল খেলার সুযোগ পেল বায়ার্ন। বার্নাব্যুতে ফাইনাল খেলতে না পারার আক্ষেপে পোড়া রিয়ালকে হারিয়েই তারা ঘরের মাটিতে ফাইনাল খেলার ব্যবস্থা করে। সের্জিও রামোস আকাশে পেনাল্টি মেরে তার চ্যাম্পিয়ন্স লীগে বড় ম্যাচের সাথে সখ্যতার শুরুটা করেন খুব বাজে ভাবে। আর ওদিকে বার্সাকে হতভম্ব করে দিয়ে, ক্লাসিকো ফাইনালের মঞ্চ ভেঙ্গে চেলসি যোগ দেয় “ফুটবল এরিনা মুঞ্চেনে” (ইউরোপীয় খেলায় আলিয়াঞ্জ এরিনা নামটি ব্যবহার করা হয় না)। সেবার চেলসির পুরো চ্যাম্পিয়ন্স লীগ সিজনটাই ছিল অকল্পনীয় সব ঘটনায় ভরা। দ্রগবার সমতাসূচক হেডার আর ম্যাচ জয়ী পেনাল্টি তারই ধাবাহিকতায় পূরণ করে রোমান আব্রাহিমোভিচের আরাধ্য স্বপ্ন। মজার ব্যাপার হল চেলসির শেষ দুটি ফাইনালই খেলে অন্তরবর্তীকালীন দু’জন কোচ নিয়ে (আব্রাহাম গ্রান্ট এবং ডি মাটেও)।

 drogba-pen

ইংলিশ ফুটবলের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১৩ সালে আবার ওয়েম্বলিতে ফিরে আসে ফাইনাল। রামোস আর রিয়ালকে চোখের পানিতে বিধ্বস্ত করে লেওয়ান্ডোস্কির ডর্টমুন্ড আর ক্যান্সারে ধুঁকতে থাকা টিটো ভিলানোভার বার্সাকে উড়িয়ে দিয়ে বায়ার্ন আসে লন্ডনে। সবাই যখন অতিরিক্ত সময়ের কথা ভাবছে তখন রোবেন বাম পায়ের আলতো ছোঁয়ায় নিজের করে নিলেন ফাইনাল। ট্রেবল ঘরে তুলল বায়ার্ন।

তৎকালীন নয়বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু শিরোপা আসে নি ১২টি বছর। হতাশা আর অপমানে নূয়ে গেছে সমর্থকদের মাথা। তখনই কোচ কার্লো আঞ্চেলোত্তি বললেন, “স্বপ্ন আর অবসেশনের মধ্যে পার্থক্য বেশি নয়। কিন্তু লা ডেসিমা আমাদের অবসেশন নয়। এ আমাদের স্বপ্ন”। এই স্বপ্ন ২০১৪, লিসবন ফাইনালে চুরমার হয়েই গিয়েছিল তাও আবার চিরশত্রু এটলেটিকোর কাছে। কিন্তু বাঁধ সাধলেন সের্জিও রামোস। ২০১২ এর পেনাল্টির হতাশা আর ২০১৩ এর কান্নার হিসেব বুঝিয়ে দিলেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালকে। অতিরিক্ত সময়ে দাঁড়াতেই পারলো না এটলেটিকো। ম্যান অব দ্যা ম্যাচ ডি মারিয়াও ছিলেন অশ্রুসজল চোখে। লা ডেসিমা ঘরে তোলে রিয়াল। দুই অঙ্কে পৌছায় তাদের ইউরোপীয় অহংকার। ম্যাচের পর রামোস বলেন, “আমি ২০১২ তে পেনাল্টি মিস করার পর মাদ্রিদিস্তাদের কাছে ওয়াদা করেছিলা যে আমি তাদের একটি শিরোপা এনে দিবো। আমি ২০১৩ তে সে ওয়াদা রাখতে পারিনি। আজ রাখলাম। আমার গোলটি সব মাদ্রিদিস্তাদের জন্য।” রোনাল্ডোও সুর মেলান রামোসের সাথে। রিয়ালের আলোকিত ইতিহাসে এমন রাত আর নেই।

Real+Madrid+v+Atletico+de+Madrid+UEFA+Champions+A7lR5R6o6Bdx

পরের সিজনেই লুইস এনরিকের হাত ধরে মেসি-নেইমার-সুয়ারেজ ধসিয়ে দেন ইউরোপ। এই ত্রয়ী ছিলেন বিধ্বংসী আর সাথে জাদুকর ইনিয়েস্তা। পিরলোকে কাঁদিয়ে বার্লিনে আবারও ইউরোপ সেরা হয় বার্সা। নিজের দল রিয়ালকে সেমিতে বাদ করার দুঃখ লাঘব করতে চেয়েছিলেন তখন জুভেন্টাসে খেলা মোরাটা। কিন্তু বার্সার সাথে পেরে ওঠা দায়। ২০০৬ বিশ্বকাপের মত এবার আর হাসিমুখে বার্লিন ছাড়তে পারলেন না বুফন।

২০১৬ সালে ৭ বছর পর ইটালিতে ফিরে আসে ফাইনাল। আবার সেই রিয়াল-এটলেটিকো। আবার সেই রামোস। আবার ম্যাচের শেষ ভাগে রোনাল্ডোর পেনাল্টি কিক। আবার ইউরোপ সেরা রিয়াল। এবার সংখ্যাটা হয়ে গেল ১১। লা উন্ডেসিমা। রাফা বেনিতেজের ফেলে যাওয়া ধ্বংস্তূপের মাঝখান থেকে রিয়ালকে টেনে তোলের কোচ জিনেদিন জিদান। পড়িয়ে দেন ইউরোপ সেরার মূকুট। আবেগের সে রাতে মিলানে এটলেটিকোকে আবার কাঁদায় রিয়াল। কাসিয়াস লা ডেসিমা জিতে বলেছিলেন, লা উনডেসিমা তুলে ধরবেন সের্জিও রামোস। তার ভবিষ্যত বাণী সঠিক হয়।

আগামী জুনের ৩ তারিখ আবার একটি রূপকথার রাত আমাদের অপেক্ষা করছে। জুভেন্টাস-রিয়াল ফাইনালে নেই ফুটবলীয় ঐশ্বর্যের কমতি, নেই কিংবদন্তীর কমতি। এবং হলফ করে বলতে পারি সে রাতে আবেগেরও কমতি থাকবে না।