• ক্রিকেট

স্মৃতিময় চ্যাম্পিয়নস ট্রফি

পোস্টটি ৫৪০৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাস। ঢাকায় সাজ সাজ রব। আইসিসি বাংলাদেশে নক আউট টুর্নামেন্ট নামে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছে। আইসিসির সভাপতি তখন জগমোহন ডালমিয়া। নিপাট ভদ্রলোক এই মানুষ টি দেখলাম বিটিভি'তে বলছেন, উনার সামর্থ্য থাকলে উনি পুরো ইডেন গার্ডেন কে ঢাকায় এনে বসিয়ে দিতেন। দেশের মানুষের তখন উৎসাহ উদ্দিপনার শেষ নেই। তখন পর্যন্ত টিভিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ বলতে ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি তে দেখা ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপের ম্যাচ গুলোই ছিলো সম্বল। আর বিটিভি'র খেলার খবরে অন্যান্য দলের টেস্ট, ওয়ানডে ম্যাচের টুকরো টুকরো ভিডিও ফুটেজ। ক্রিকেটের অনেক রথীমহারথী দের সেই বার প্রথম টিভিতে দেখি। ভারত পাকিস্তানের অনেক প্লেয়ার কে টিভিতে দেখলেও অন্য দেশ গুলোর প্লেয়াররা তখন পর্যন্ত বলতে গেলে এলিয়েন ছিলো আমার কাছে। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্লেয়ারদের দেখবো, ব্যাপার টা ছিলো সত্যিই রোমাঞ্চকর। লারা, ওয়ালশ, স্টিভ ওয়াহ, মার্ক ওয়াহ, হ্যানসি ক্রোনিয়ে, ক্যালিস আর চশমা পড়া ড্যানিয়েল ভেট্টরি সহ আরো অনেক "সুপারস্টার" দের দেখার সৌভাগ্য সেবারই প্রথম হয়েছিলো।

১ম ম্যাচে টান টান উত্তেজনার মধ্যে নিউজিল্যান্ড হারিয়ে দিলো জিম্বাবুয়েকে। এলিস্টার ক্যাম্পবেলের সেঞ্চুরিতে জিম্বাবুয়ে করে ২৫৮। তখনকার হিসাবে বিশাল স্কোর। জবাবে শুরুতেই ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে যাওয়া নিউজিল্যান্ড কে উদ্ধার করেন স্টিফেন ফ্লেমিং। কিন্তু ৯৬ রান করে তার বিদায় নিউজিল্যান্ড কে আবারো বিপদে ফেলে দেয়। ক্রিস হ্যারিসের ৩৭ রানের ক্যামিও শেষ বলে নিউজিল্যান্ড এর জয় নিশ্চিত করে।

পরের ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ইংল্যান্ড করে ২৮১। মনে হচ্ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা সেদিনই বিদায় নিবে। কিন্তু কালিনান, ক্রোনিয়ে আর জন্টি রোডসের হাফ সেঞ্চুরিতে এই টার্গেট কেও সহজ বানিয়ে ৬ উইকেটে জিতে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

এদিকে প্রথম ম্যাচে শেষ বলে জয় পাওয়া নিউজিল্যান্ড মুখোমুখি হয় শ্রীলংকার। ২ বছর আগে বিশ্বকাপ জেতা শ্রীলংকা তখন টপ টিম। নিউজিল্যান্ড প্রথমে ব্যাট করে ১৮৮ রানে গুটিয়ে যায়। শ্রীলংকা ৫ উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয়।

শচীন টেন্ডুলকারের ১৪১ আর অজয় জাদেজার ৭১ রানের কল্যাণে ভারত করে ৩০৭। সেই সময় ৩০০ রান হতো কালেভদ্রে। জবাবে শুরুটা ভালোই হয়েছিলো অস্ট্রেলিয়ার। ২৫ ওভারে ১ উইকেটে ১৪৫ রান। পন্টিং আর মার্ক ওয়াহর বিদায়ের পর শুরু হয় ব্যাটিং ধ্বস। আর সেখানেও নেতৃত্বে সেই শচীন টেন্ডুলকার। ৪ উইকেট নিয়ে একা হাতেই গুড়িয়ে দেন অস্ট্রেলিয়াকে।

পরের ম্যাচে মুখোমুখি পাকিস্তান আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পুরো ইনিংসে ঝড়ো ব্যাটিং করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করে ২৮৯। জবাবে শুরু থেকেই উইকেট হারাতে থাকে পাকিস্তান। সেলিম এলাহির ৪৬, ইজাজ আহমেদের ৫১ আর শেষ দিকে সাকলাইন মুশতাক আর মইন খানের ২৪ আর ২৫ রানের কল্যাণে তাদের ইনিংস থামে ২৫৯ রানে।

প্রথম সেমি ফাইনালে বৃষ্টি হানা দেয়। ম্যাচ কমে হয় ৩৯ ওভারের। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমে ব্যাট করে জ্যাক ক্যালিসের ১১৩ রানে চড়ে ২৪০ রান সংগ্রহ করে। শ্রীলংকা থেমে যায় ১৩২ রানে।

অপর সেমিতে ফেভারিট ভারতের সামনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আগের ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দেয়া ভারত প্রথমে ব্যাট করে সৌরভ গাঙ্গুলীর ৮৩ আর রবিন সিংয়ের ৭৫ রানে মোট ২৪২ রান করে। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শুরুটা হয় ঝড়ো। ১৬ ওভারেই স্কোর বোর্ডে ১০৮ রান উঠে যায়। চন্দরপলের ৭৪ আর ব্রায়ান লারার ৬০ রানে ৪৭ ওভারেই ফাইনালের টিকিট কেটে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

ফাইনালে টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কে ব্যাটিংয়ে পাঠায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ইনিংসের প্রথম ওভার করেন অফ স্পিনার প্যাট সিমকক্স। ফিলো ওয়ালেসের ১০৩ আর কার্ল হুপারের ৪৯ রানের সুবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করে ২৪৫। ক্যালিস নেন ৫ উইকেট। দক্ষিণ আফ্রিকার শুরুটা হয় উড়ন্ত। মাত্র ৭ ওভারেই ৫০ রান স্কোর বোর্ডে। মাঝে দ্রুত কিছু উইকেট হারালেও রানের চাকা থামে নি। ৪৭ ওভারেই ৬ উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। মাইক রিন্ডেল ৪৯, ক্যালিস ৩৭ আর অধিনায়ক ক্রোনিয়ে করে ৬১ রান। অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হন ক্যালিস। ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্টের ট্রফিটাও যায় ক্যালিসের হাতে।

ওই টুর্নামেন্ট দিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের আন্তর্জাতিক ট্রফি খরা কাটায়। এবং এখন পর্যন্ত ওটাই তাদের একমাত্র বৈশ্বিক শিরোপা।

আয়োজক হিসাবে বাংলাদেশ ছিলো সফল। টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ওই টুর্নামেন্ট অনেক বড় প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের মানুষের জন্য এই টুর্নামেন্ট ছিলো অনেক বড় এক পাওয়া।