• ক্রিকেট

সমালোচনার অপর নাম সাকিব আল হাসান

পোস্টটি ১৫৩৬৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

'সাকিব আল হাসান' শুধুমাত্র একটি নাম নয়,একটি দেশের গৌরবান্বিত মশাল,একটি দেশের কাণ্ডারি।

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শুধুমাত্র কি বাংলাদেশের ক্রিকেটে? না, অবশ্যই না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেরই এক জ্বলন্ত নক্ষত্র,নামের পাশে রয়েছে যার রেকর্ডের অজস্র পসরা। দীর্ঘ ১১ টি বছর ধরে তিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের। আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক অনেক জয়গান। হয়ত এর জন্য অনেক ক্রিকেটারেরই অবদান অবশ্যই বিদ্যমান। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের এগিয়ে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওই ২০০৬ সালে অভিষিক্ত ছিপছিপে তরুণটির।

সাকিব আল হাসান ই প্রথম এই দেশের মাঝে  নিজের সীমাবদ্ধ কাঠামোকে ভেঙে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। সেই সাথে উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের নামও। সাকিব আল হাসান দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশ থেকেও কেউ বিশ্ব মঞ্চে সেরা হতে পারেন। জাগিয়েছেন বিশ্বাস হাজারো তরুণের মাঝে। বছরের পর বছর বিশ্বের বিভিন্ন বিদেশি লীগগুলোতে একাই বয়ে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের নাম। দিনের পর দিন বয়ে বেড়িয়েছেন কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন,মানুষের আবেগ। তাঁর এক একটি শটের উপরে নির্ভর করেছে বহু ম্যাচের ভাগ্য। তাঁর এক একটি আর্ম ডেলিভারির উপর নির্ভর করেছে ম্যাচের জয়-পরাজয়। তিনিই প্রথম বিশ্বকে দেখিয়েছেন ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই এক নম্বর হওয়ার সম্ভাবনা। 

কিন্তু এত সব অবদান,অর্জনের পরেও সাকিব আল হাসানের নাম যতবার উচ্চারিত হয়েছে প্রশংসার জন্য,তার চেয়েও বেশি উচ্চারিত হয়েছে সমালোচনার জন্য। কিছু কিছু হয়ত তাঁর নিজের ভুলের জন্য,কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনা কারণেই তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে। কখনো তিনি সমালোচিত হয়েছেন দর্শক পেটানোর কারণে,কখনো সমালোচিত হয়েছেন ক্যামেরার সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির জন্য, আবার কখনো বা সমালোচিত হয়েছেন আম্পায়েরের সাথে বিতর্কে জড়ানোর কারণে। হয়ত এগুলোর জন্য তিনি নিজে দায়ী ছিলেন,হয়তো বা না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে নিয়ে বানোয়াট ভাবে অনেক খবর হয় যার কোন ভিত্তিই নেই। তবুও মানুষ তাঁকে নিয়ে সেসব নিয়ে কোন যাচাই বাছাই না করেই সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে এটি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক হৈচৈ হয়।  তাঁকে অনেক কিছুই বলা হয়(হৃদয়হীন,মানবতাহীন,অর্থের গৌরব প্রভৃতি)। কিন্তু এখানে সাকিবের কোন দোষই ছিল না যা পরে প্রমাণিত হয়। এমনকি সাকিবকে নিয়ে বাংলাদেশের কিছু অশিক্ষিত মানুষের চিন্তাভাবনা এবং তাদের মনোভাবও দেখা যায় যখন সাকিব তাঁর পরিবার নিয়ে কোন ছবি অথবা পোস্ট শেয়ার করেন সামাজিক মাধ্যমে। তাঁর ফেইসবুক ভেরিফাইড পেইজএ একবার নজর বুলালেই সেই সকল সমালোচনা অতি সহজেই নজরে পড়ে। এমনকি তিনি তাঁর রেস্টুরেন্ট 'সাকিবস' উদ্বোধন করার পরেও তাঁকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। তাঁর গায়ে জুড়ে দেয়া হয় হোটেল ব্যবসায়ীর তকমা যা কোন মানুষের করা উচিত বলে মনে হয় না। 

তাছাড়া তিনি বিদেশি লীগে খেলেন বলেও বাংলাদেশের কিছু সচেতন জনগণ মনে করেন তিনি শুধুমাত্র টাকার জন্য খেলেন। যে মানুষটি বছরের পর বছর একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন বিদেশের বিভিন্ন লীগগুলোতে সেখানে কিনা সমালোচনা হয় তিনি খেলেন টাকার জন্য। এ প্রসঙ্গে সাকিবের সহধর্মিণী বলেন, "যে মানুষটি একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন তাকে নিয়ে সমালোচনা করার আগে মানুষের আরো ভাবা উচিত"। আসলেই তাই। ক্রিকেটের বাইরেও একজন ক্রিকেটারের একটি জীবন আছে যেখানে একজন ক্রিকেটার একজন সাধারণ মানুষের মতই। অবশ্যই ক্রিকেট একটি প্রফেশনাল খেলা, কিন্তু প্রফেশন আর ব্যক্তিগত জীবন যে এক না তা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। মানুষের এ সমালোচনা প্রসঙ্গে সাকিব নিজে বলেন, " আমি জানি না মানুষ কেন আমাকে এত ভুল বুঝে "। কতটা কষ্ট পেলে একজন ক্রিকেটার এমন কথা বলতে পারে।

 

কারও ভালো-মন্দ বিবেচনার জন্য সমালোচনা অবশ্যই জরুরী। কিন্তু সে সমালোচনা গঠনমূলক হওয়াটাই জরুরী। কিন্তু যখন সেই সমালোচনা একজনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হয়ে যায় তখন তা আর গঠনমূলক সমালোচনা থাকে না। একজন ক্রিকেটার আমাদের মতই একজন মানুষ। তাঁর ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তাঁরও ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে এটা আমাদের অবশ্যই বোঝা উচিত। আমাদের অন্তত কারো সমালোচনা করার আগে এতটুকু ভেবে দেখা উচিত যে, যে মানুষটি রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে বছরের পর বছর দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন বহির্বিশ্বে, সুযোগ এনে দিচ্ছেন আমাদের গৌরবান্বিত হওয়ার সেই মানুষটিকে নিয়ে যখন সমালোচনক করা হয়,যখন ভুল বোঝা হয় তখন ওই মানুষটির কেমন লাগে। হয়ত প্রফেশনের খাতিরে লোকটি কিছুই বলবে না কিন্তু দিনশেষে অবশ্যই তাঁর মনের মাঝে একটি দাগ কেটে যাবে।

‌আমরা যদি আমাদের দেশের এই মানুষগুলোকে সম্মান না দেই তাহলে কে দিবে? সাকিব আল হাসানের সহধর্মিণী বলেছেন যে বাইরের দেশের মানুষ বলে যে আমরা নিজেরাই নিজেদের খেলোয়াড়দের সম্মান জানাতে পারি না। আসলেই তো তাই। আমরা যদি আমাদের নক্ষত্র কে সম্মান না জানাই তাহলে কে জানাবে?কিন্তু লজ্জার বিষয় হলেও সত্য আমরা সাকিব আল হাসানকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান কখনোই দিতে পারি নি। তাঁকে নিয়ে প্রশংসা করার চেয়ে সমালোচনা করেই আমরা যেন আনন্দ পাই। আমরা কি পারি না আমাদের এই নক্ষত্রটিকে,জীবন্ত কিংবদন্তিকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে?? হয়ত আমাদের এতটুকু পরিবর্তনই গড়ে দিতে পারে বিশাল পার্থক্য।