• ফুটবল

'ACL' ইঞ্জুরির আদ্যোপান্ত

পোস্টটি ১০৯১০ বার পঠিত হয়েছে

গত এপ্রিলে ইউরোপা লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ইব্রাহিমোভিচের পড়ে যাওয়ার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে আপনার? যে ইঞ্জুরির কারণে এখনও মাঠের বাইরে সুইডিশ স্ট্রাইকার। অ্যান্ডারলেখটের বিপক্ষে বল দখলের লড়াইয়ে শুন্যে লাফ দিয়েছিলেন। মাটিতে পড়েই লুটিয়ে পড়লেন। পরে রিপ্লেতে দেখা গেল মাটিতে নামার সময় ডান পা টা ঠিকভাবে পড়েনি। পায়ের সাথে হাঁটুর ভারসাম্য ঠিক ছিল না। একরকম বেঁকেই গিয়েছিল। কী বীভৎস! পরে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছেড়েছিলেন ইব্রাহিমোভিচ। ৩৫ বছর বয়সে এসে নতুন এই ইঞ্জুরি প্রায় আট মাসের বেশি সময় মাঠের বাইরে রাখবে তাকে।      


ফুটবলাররা প্রতিনিয়ত তাদের খেলার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভক্তদের মুগ্ধ করে যাচ্ছেন। মাঠে অথবা ট্রেনিং এ তাদের দক্ষতা আর কঠোর পরিশ্রমের বহর দেখে আমরা যারপরনাই বিস্মিত হই। ভুলে যাই তারা আমাদের মতোই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। মাঠে নিজের সেরাটা দেয়ার জন্য খেলোয়াড়েরা প্রতিদিন যেসব শারীরিক কসরৎ করেন তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে ‘অবিশ্বাস্য’।

পেশাদার ফুটবলাররা তাদের শারীরিক গঠন ঠিক রাখতে ফিজিও, ডাক্তার, নিউট্রিশনিস্টদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে থাকেন। প্রতি ম্যাচের আগে, পরের নিয়মিত পরিচর্যা তো আছেই। সাথে সপ্তাহজুড়েই নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকেন তারা। তবুও হরহামেশাই শোনা যায় ফুটবলারদের ইঞ্জুরির খবর। ফুটবল খেলতে গেলে ইঞ্জুরিতে পড়তেই হবে। একটানা এত খাটুনি শরীরে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। আর খেলাটাও তো! একটু এদিক-থেকে ওদিক হলেই বড় বিপদ ধেয়ে আসে ফুটবলারের ক্যারিয়ারে।

পেশাদার ফুটবলারদের তো বটেই কিছু সাধারণ ইঞ্জুরি বাগড়া বসিয়ে বসতে পারে অপেশাদার ফুটবলারদের খেলায়ও।     


 ফুটবলের কিছু অতি সাধারণ ইঞ্জুরিগুলোর নাম হিসেবে বলা যায়:

১) অ্যান্টেরিওর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট বা ACL টিয়ার (ছিড়ে যাওয়া)
২) হ্যামস্ট্রিং স্ট্রেইন
৩) অ্যাংকেল স্প্রেইন
৪) নি কার্টিলেজ টিয়ার
৫) হার্নিয়া ইত্যাদি।

এই সাধারণ ইঞ্জুরিগুলোর ভিড়ে অতি সাধারণ  আবার ACL বা অ্যান্টেরিওর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট। ফুটবলার আর এই এসিএল শব্দটা যেন একে অন্যের পরিপূরক। নিজের ক্যারিয়ারের এই ইঞ্জুরিতে ভুগতে হয়নি এমন কোনো ফুটবলার যে খুঁজে পাওয়া যাবে না- সেটা নিশ্চত করেই বলা যায়। এই ইঞ্জুরিতে পড়ে অসময়ে ক্যারিয়ার শেষ করতে হয়েছে এমন ফুটবলারের সংখ্যাও কম নয়। আর কয়েক মাস মাঠের বাইরে থাকা তো এই ইঞ্জুরির পরিণতি। যদিও সবার ক্ষেত্রে সময়টা সমান হয় না। লেখার শুরুতে ইব্রাহিমোভিচের ইঞ্জুরির যে বর্নণা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটিও ছিল ACL ইঞ্জুরির। পরে শল্যবিদের ছুরির নিচে যেতে হয়েছিল ইব্রাকে। এখন চলছে তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। আবারও ফুবটলে ফেরার লড়াই।

ফুটবলের বহুল আলোচিত সেই ‘কুখ্যাত’ ইঞ্জুরির আদ্যোপান্তই জেনে নেয়া যাক আজ...   


আমাদের দেহে হাড় সংখ্যা ২০৬ টি। এই হাড়গুলো আমাদের খুলি, ঘাড়, মেরুদণ্ড, কোমর, হাত, পা ইত্যাদি জায়গায় জয়েন্ট বা জোড়া লেগে আমাদের নড়াচড়া, হাঁটাচলায় সহযোগীতা করে।

একটি হাড়ের জয়েন্টে যা থাকে :

১.  যে ২/৩ টি হাড়ের সংযোগ ঘটছে
২.  মাংসপেসী
৩.  লিগামেন্ট
৪.  টেন্ডন

দেহের মহাগুরুত্বপূর্ণ জয়েন্ট হল 'নি জয়েন্ট' বা হাঁটুর জোড়া। মূলত ৩ টি হাড় আছে এখানে:

১.  ফিমার - যা আমাদের থাইয়ে থাকে
২.  টিবিয়া - পা/ শিনের হাড়
৩.  প্যাটেলা (নি ক্যাপ) যা হাঁটুর বাটি হিসেবে পরিচিত

এই জয়েন্টের কিছু মুভমেন্টের মাধ্যমে আমাদের হাঁটাচলা, পা নাড়ানো বা ঘোরানো সম্ভব হয়।


একনজরে মুভমেন্টগুলো:

# ফ্লেক্সন / ভাঁজ
# এক্সটেনশন / প্রসারণ
# মধ্যম ঘূর্ণন ও
# পার্শ্বীয় ঘূর্ণন

সাধারণত হাঁটুকে ১২০-১৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত ভাঁজ এবং এই অবস্থায় থাকাকালীন মাত্র ২০ ডিগ্রি ভিতরের বা ৩০-৪০ ডিগ্রি বাইরের দিতে ঘুরানো সম্ভব। received_1419112508157576


লিগামেন্টের কাজ হল দুই বা আরও বেশি হাড়ে মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। নি জয়েন্টে লিগামেন্ট থাকায় তাই হাঁটুর কোন মুভই অতিরিক্ত হতে পারে না। হাঁটু সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু ধারণক্ষমতার বাইরে অর্থাৎ পা বেশি সংকুচিত বা প্রাসারিত করলে সেই চাপ পড়ে হাঁটুতে। সেই চোটে লিগামেন্ট, টেন্ডন ছিঁড়ে পা তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।  



নি জয়েন্টের প্রধান লিগামেন্ট হল অ্যান্টেরিওর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট(ACL)। 'অ্যান্টেরিওর’ অর্থ সামনে, 'ক্রুশিয়েট' অর্থ আড়াআড়ি। অ্যান্টেরিওর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট পিছনের পোস্টেরিওর ক্রুশিয়েট লিগামেন্টের (PCL) সাথে অনেকটা 'X' শেপে অবস্হান করে ফিমারকে টিবিয়া ও প্যাটেলার সাথে যুক্ত করে এবং হাঁটুর মুভমেন্টে সাহায্য করে।
কোনাকুনি আকৃতির কারণেই এর নাম ক্রুশিয়েট। received_1419416644793829





কেন ফুটবলারদের ACL ইঞ্জুরি বেশি হয়?

উপরের বর্নণা থেকে এতোক্ষণে অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর বুঝে ফেলার কথা আপনার। খেলার সময় ফুটবলারদের চলমান অবস্থায় হঠাৎ এবং খুব দ্রুত দিক পরিবর্তন, অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে পড়া বা খেলা শুরু করা, শূন্যে লাফ দেয়া, নিজ অক্ষের উপর ঘুরে যাওয়া- এসব করতে হয় প্রতিনিয়তই। এছাড়াও ক্রমাগত ট্যাকলের শিকার হন ফুটবলাররা। পা মাটিতে আছে এমন অবস্থায় প্রতিপক্ষের কেউ মারাত্মক ট্যাকল করলেও এমনটা হতে পারে। মোটকথা একজন ফুটবলারের শরীরের যে কোনো জায়গার চেয়ে হাঁটুতে চাপ পড়ে অনেক গুণ বেশি। খেলার ধরনটাই তো এমন! এই আলোচনা থেকে ইব্রাহিমোভিচের ইঞ্জুরিও তাই ব্যখ্যা করা যায়। শূন্যে লাফ দিয়ে ঠিকমতো ল্যাণ্ড করতে না পারাতেই ইব্রাহিমোভিচের ডান ACL তার স্বাভাবিক স্ট্রেচিং ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সে কারণেই ছিড়ে যায় লিগামেন্ট। received_1419416648127162


সবক্ষেত্রেই ACL যে পুরোপুরি ছিঁড়ে যাবে তা নয়। দূর্ঘটনার মাত্রার উপর ভিত্তি করে এটি 'আংশিক' বা 'সম্পূর্ণ' ছিঁড়তে পারে। এর আপাত প্রতিরোধ ব্যাবস্হা নেই কারণ। মাঠে খুব সাবধানে খেলাই একমাত্র সমাধান। কিন্তু  তখন আবার শতভাগ উজাড় করে খেলা সম্ভব না! এ কারণেই ফুটবলে ‘এসিএল’ ইঞ্জুরির এতো প্রকোপ!

তবে প্রতিকার সম্ভব। ইব্রাহিমোভিচের ইঞ্জুরির পর তাকে বেশ কিছুক্ষণ মাঠেই সুশ্রুষা দিয়েছিলেন ম্যান ইউনাইটেডের ফিজিওরা। ACL টিয়ার হওয়ার পর ফিজিশিয়নরা জরুরি ভিত্তিতে সাধারণত যা করে থাকেনঃ  

১) রেস্ট দিয়ে নি জয়েন্ট স্টেবল করা
২) বরফ অ্যাপ্লাই করা
৩) ম্যাসাজ যেমন : কম্প্রেশন, এলেভেশন  
৪) ব্যাথা ও ফোলা কমাতে ইনফ্ল্যামেশন প্রতিরোধী ঔষধ যেমন অ্যাসপিরিন দেয়া এরপর ইঞ্জুরির মাত্রা দেখে সার্জারি লাগবে কি না ঠিক করা হয়।

সম্পূর্ন ছিড়ে গেলে তখন সার্জারির বিকল্পও নেই। প্রচলিত সার্জারি গুলো হচ্ছেঃ

১) আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারি
২) ACL পুনর্গঠন সার্জারি সার্জারির পর পোস্ট-সার্জিক্যাল রিহ্যাব এবং ফিজিক্যাল থেরাপি।

সার্জারির পরের ব্যাপারগুলো গুরুত্বপূর্ণ আরও বেশি। কেননা ঠিকমতো হিলিং না হলে পায়ের ফাংশন চলে যেতে পারে চিরতরে যা একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারটাই শেষ করে দিতে পারে। আধুনিক চিকিত্‍সা বিজ্ঞানের কল্যাণে স্পোর্টস ইঞ্জুরি কমন হওয়া সত্ত্বেও খেলোয়াড়েরা দ্রুত সুস্থ হয়ে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সময়ের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি এখনও।




ইব্রাহিমোভিচের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সার্জারির পর এখন আবারও ফুটবলে ফেরার প্রস্তুতি চলছে তার। বয়সটা ৩৫ হয়ে গেছে ঠিকই। এই ইঞ্জুরি থেকে ফিরে অনেকেই আর পুরনো খেলাটা খেলতে পারেননি। তার বয়সে হয়ত এই ইনজুরি নিয়ে অনেকেই ফুটবলকে বিদায় বলতেন। কিন্তু মানুষটা যখন তিনি, পুরনো সেই 'ZLATAN' মুহুর্তটা ফিরে আসুক তার সাথে, ফুটবল মাঠে। মাঠের বাইরে।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।