• ক্রিকেট

সাকিব আল হাসান : দ্যা ক্রাইসিস ম্যান

পোস্টটি ৪৭৩৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

620271-shakib-twitter620271-shakib-twitterআচ্ছা ক্রাইসিস ম্যান বলতে কি বোঝায়? যিনি বিপদের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, যিনি মানুষের বিপদের সময় আবির্ভাব হয়ে থাকেন ত্রাণকর্তা হিসেবে। যার জাদুর স্পর্শে মুহূর্তে মানুষের বিপদ উধাও হয়ে যায়।
আচ্ছা বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্রাইসিস ম্যান কে? এই প্রশ্নের উত্তরে নিঃসন্দেহে একজন মানুষের নামই আসবে বারবার। তিনি কে? তিনি হচ্ছেন এমন একজন মানুষ যিনি প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই দলের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেন কখনো ব্যাটসম্যান হিসেবে,কখনো বা বোলার হিসেবে, আবার কখনো বা ফিল্ডার হিসেবে। তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের জান,বাংলাদেশের প্রাণ সাকিব আল হাসান।

সাকিব আল হাসান হচ্ছেন এমন একজন রূপকথার নায়কের মত যার কাছে রয়েছে জাদুর কাঠি। যিনি সেই জাদুর কাঠির স্পর্শে বারবার উদ্ধার করেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। যখনই রানের কম পড়ে তখনই ডাকো সাকিবকে, যখন উইকেটের প্রয়োজন আবারো ডাকো সাকিবকে। কি আশ্চর্য, তিনি রূপকথার ফিনিক্স পাখি হয়ে সেই প্রয়োজন গুলো কি এক অপার মহিমায় বছরের পর বছর পূরণ করে যাচ্ছেন। তার সর্বশেষ উদাহরণ ডাচ-বাংলা ব্যাংক রকেট টেস্টে।
নিজের ৫০ তম ম্যাচ খেলার আগে কি একবারো ভেবেছিলেন এই ম্যাচে এত কিছু করে ফেলবেন তিনি? হয়ত ভেবেছিলেন বলেই বলেছিলেন,"চেষ্টা করলে বাংলাদেশ এই সিরিজ ২-০ তেও জিততে পারে"। কি কথা বলে দিলেন তিনি! যে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কয়েক বছর আগেও জয়ের কথা ভাবাও ছিল অকল্পনীয়, যে অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশ খেলার সময় চিন্তা করত যে ম্যাচটি যাতে অন্তত ৫ দিন পর্যন্ত যায়, বাংলাদেশ যাতে অন্তত ইনিংস ব্যবধানে না হারে, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই কিনা সাকিব বললেন ২-০ তে হারাতে পারেন। বিস্ময় বৈ কি! এই কারণেই স্টিভেন স্মিথও বিস্মিত হয়ে খোঁচা দিলেন বাংলাদেশের টেস্ট জয়ের সংখ্যা নিয়ে। তার প্রত্যুত্তরে কিছুই বলেন নি সাকিব আল হাসান। হয়ত জমা করে রেখেছিলেন মাঠের খেলার জন্যই।
নিজের ৫০ তম টেস্ট খেলতে যখন মাঠে নামলেন, ক্রিজে আসলেন তখন সেই স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে উঠল। বাংলাদেশ যে অথৈ সমুদ্রে প্রায় ডুবতে থাকা তরী। ১০ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর সেই ডুবতে থাকা তরীকে তীরের পথ দেখানোর জন্য হাল ধরলেন সাকিব আল হাসান দলের আরেক পরিণত নাবিক তামিম ইকবালের সাথে যিনি নিজেও খেলতে নেমেছিলেন তাঁর ৫০ তম টেস্ট ম্যাচ। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না, যেখানে কামিন্সের বল বারবার সুইং হচ্ছে,হ্যাজলউডও গতির ঝড় তুলছেন,লায়নের বলও টার্ন করতে শুরু করেছে সেই পরিস্থিতিতে যে কারো মনেই ভয়
ধরে যাওয়ার কথা। কিন্তু মানুষটি যে সাকিব আল হাসান।
ভয়-ডর যার মাঝে নাই তিনি কি আর এসবে ভয় পান? নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলে,কাট শট, একের পর এক ড্রাইভ মেরে বোলারদের উপর ঠিকই চড়াও হলেন, গড়লেন তামিমের সাথে দেড় শতাধিক রানের জুটি। টেস্টেও খেললেন ওয়ানডের মত। ৬৬ বলে করলেন হাফ সেঞ্চুরি। তারপরই ঢুকে গেলেন খোলসে। সেটাও কিনা দলের প্রয়োজনে। কারণ দলের আরেক কান্ডারি যে তখন স্ট্রোক করা শুরু করেছেন। তামিমের ৭১, সাকিবের ৮৪, দুজনের ১৫৫ রানের জুটি বাংলাদেশের তরীকে দেখাল তীরের পথ। সে পথে হেঁটেই বাংলাদেশ করল ২৬০ রান। খুব কম রান বৈ কি! এ রান তো হেসে-খেলেই পার করে ফেলবে অস্ট্রেলিয়া।
কিন্তু নাটকের যে অনেক বাকি তখনো। ১৪ রানে ৩ উইকেট ফেলে দিয়ে যেখানে চালকের আসনে বাংলাদেশ। পরের দিন সকালে স্মিথকে দ্রুত ফেরালেও রেনশ-হ্যান্ডসকম্ব জুটি যখন বাংলাদেশকে চোখ রাঙাচ্ছিল ঠিক তখনই দৃশ্যপটে ক্রাইসিস ম্যান সাকিব আল হাসান। রেনশকে আউট করে ৭৩ রানের জুটিটি ভেঙে দেন তিনি। কিন্তু এই দলের নাম অস্ট্রেলিয়া। এত সহজেই ছেড়ে দিবে নাকি? জুটি গড়ল এবার টেল এন্ডাররা, আগ্যার-কামিন্স মিলে যখন ব্যাট করতে শুরু করল তখন বাঙালির কপালে কিছুটা হলেও চিন্তার বলিরেখা জেগে উঠল। আদৌ বাংলাদেশ লিড নিতে পারবে তো??তখনই ডাক পড়ল মি.সুপারম্যানের। আর কি জাদুবলেই না তিনি বাংলাদেশের ১০০ রানের লিড নেয়ার স্বপ্নভঙ্গের জুটিটকে ভেঙে নিজের পঞ্চম উইকেটটি নিলেন। এর সাথেই তিন হয়ে গেলেন চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে সব দেশের (আয়ারল্যান্ড এবং আফগানিস্তান বাদে) বিপক্ষে নেয়া ৫ উইকেটের মালিক।
কিন্তু গল্প তো তখন মাত্র শুরু। বাংলাদেশ তামিমের অসাধারণ ইনিংসে,মুশি-সাব্বিরের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের পরেও বাকিদের ব্যর্থতায় স্রেফ ২২১ রানে অল আউট হয়ে গেল। অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল ২৬৫ রানের যা কিনা টপকাতে হলে অস্ট্রেলিয়াকে গড়তে হবে ইতিহাস। আচ্ছা রান টা কি কম হয়ে গেল? ২৮ রানে রেনশকে ফিরিয়ে মিরাজ জানিয়ে দিলেন মোটেও না। তার পরের ওভারেই খোয়াজা কে আউট করে সাকিব জানিয়ে দিলেন যে বাংলাদেশ টেস্ট জয়ের জন্যই মাঠে নেমেছে। তারপরই সেই নাটকের আসল মোচড় ঘুরে এল। ১৪ রানে সৌম্যের হাতের কল্যাণে জীবন পাওয়া ওয়ার্নার এবং শূন্য রানে ফিরত যেতে যেতে বুটের একটি স্পাইকের কল্যাণে বেঁচে যাওয়া স্মিথ মিলে গড়লেন এক মহাকাব্যিক জুটি।

ওয়ার্নার তার বিধ্বংসী স্টাইলে ব্যাটিং করে জানিয়ে দিলেন এই পিচেও ব্যাট করা যায়। ৩য় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার রান ১০৯/২। জয় থেকে আর মাত্র ১৫৬ রান দূরে।
ম্যাচের চতুর্থ দিন-- ওয়ার্নার তার স্বভাবসুলভ মারকুটে ব্যাটিংয়ে তুলে নিলেন নিজের ১৯ তম সেঞ্চুরি। আচ্ছা তিনি কি সেই সাথে তুলে নিলেন বাংলাদেশের জয়ও? কোটি টাকার প্রশ্ন!! শত রানের জুটি গড়ে যখন ওয়ার্নার এবং স্মিথ বাংলাদেশের জয় ছিনিয়ে নিচ্ছিলেন প্রায় তখনই দৃশ্যপটে দা ক্রাইসিস ম্যান সাকিব আল হাসান। ওয়ার্নারকে এলবিডব্লিউয়েএ ফাঁদে ফেলে জুটিটি ভঙ্গ করলেন। কিন্তু বড্ড দেরি করে ফেললেন না? এই প্রশ্ন যখন সকলের মনে উঁকি দিচ্ছিল তখনই সাকিব স্মিথকে আউট করে জানিয়ে দিলেন যে বাংলাদেশ এই টেস্ট জিততে যাচ্ছে। তারপরের গল্পটা সাকিবময়। যদিও এখানে অবদান আছে তাইজুল আর মিরাজের। তবুও তাঁর পরামর্শেই সঠিক জায়গায় বল ফেলে উইকেটের প্রাপ্তি তাইজুলের। তখন বাংলাদেশের জয় আর হারের মাঝে একটি নাম বড় হয়ে দাঁড়াল ম্যাক্সওয়েল। বাংলাদেশের ময়না সেই সংশয়টিও আর রাখল না লাঞ্চের পর প্রথম বলেই দারুন এক বলে ফেলে দিলেন ম্যাক্সির স্টাম্পের বেইল। সেই সাথে নিশ্চিত হয়ে গেল বাংলাদেশের জয়। আসলেই কি তাই? না লায়ন যে টখণোও মেরে খেলছিলেন তখনই ইংল্যান্ড টেস্টের জয়ের নায়ক মিরাজ এসে তুলে নিলেন তাঁর উইকেটটি।
কফিনের লাস্ট পেরেকটি ঠুকলেন তাইজুল ইসলাম হ্যাজেলউডকে আউট করে।
আজ আমাদের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পিছনে সবার সম্মিলিত অবদান থাকলেও একজন মানুষ যিনি জয়ের আশা দেখিয়েছেন,যিনি বিপদে টেনে তুলেছেন বাংলাদেশ দলকে, তিনি আর কেউ নন তিনি সেই সাকিব আল হাসান। তাঁকে ক্রাইসিস ম্যান না বললে তো কাকে বলব? দিনশেষে যে তিনিই আবির্ভাব হন দলের ত্রাণকর্তা হিসেবে,দলের রূপকথার নায়ক হয়ে যাঁর হাতে থাকে সোনার কাঠি,যিনি যা বলেন তা-ই করে দেখান।
একেই তো বলে ক্রাইসিসম্যান দ্যা সাকিব আল হাসান।620271-shakib-twitter