X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

রুপকথার সেই রাত

পোস্টটি ২৪৭৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

বাম প্রান্ত থেকে জন আর্ন রিসের একদম নিখুঁত একটা বাঁকানো ক্রস। আগে থেকেই ডি-বক্সের একদম মাঝখানে ওত পেতে ছিলেন জেরার্ড। এক এগিয়ে গিয়ে মাথা ছুঁয়ে দিলেন বল-এ। দর্শক রা দেখলো বলটা পোস্টের ডান কোণা দিয়ে জালে জড়ালো।
২ মিনিট পরের ঘটনা, নিজেদের অর্ধ থেকে আক্রমণ গড়ে তুলে বল আসলো জাবি আলোনসোর পায়ে। তিনি পাস দিলেন দিমিতার হামানকে। ফাঁকায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ভ্লাদিমির স্মিচার। বলটা পেয়ে আর দেরি করলেন না, ডি-বক্সের বাইরে থেকে বুলেট শট নিলেন। গোল পোস্টের বাম কোণা দিয়ে বলটা জালে জড়িয়ে গেলো।
তারও ২ মিনিট পরের ঘটনা। জিমি ক্যারাঘারের বাড়িয়ে দেয়া থ্রু বক্সের সামনে রিসিভ করলেন মিলান বারোস। ততক্ষণে নিজের মার্কার কে ফাঁকি দিয়ে ডি-বক্সের দিয়ে ছুটে আসছেন স্টিভেন জেরার্ড। মিলান বারোস শ্যাডো পাস টা বাড়িয়ে দিলেন, জেরার্ড সেটা রিসিভও করলেন। অপেক্ষা শুধু পারফেক্ট ফিনিশে বলটা জালে জড়ানো। কিন্তু পিছন থেকে তাকে ফেলে দিলেন টাফ ট্যাকলিংয়ের জন্য বিখ্যাত জেনারো গাত্তুসো। ফলাফল পেনাল্টি। আলোনসো আসলেন পেনাল্টি নিতে। বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটা ঠেকিয়ে দিলেন দিদা। ফিরতি বলটা জালে জড়িয়ে দিলেন ওই আলোনসোই। স্কোরলাইন তখন, এসি মিলান ৩-৩ লিভারপুল। ধারাভাষ্যকারের কন্ঠে শোনা গেলো, "Impossible have accomplished"। ৫ মিনিট আগেও ৩-০ তে পিছিয়ে থাকা লিভারপুল অসম্ভবকে সম্ভব করলো।

প্রথমার্ধটা ছিলো পুরোপুরি মিলানময়। ম্যাচের ৫০ সেকেন্ডেই পিরলোর ফ্রি কিক থেকে বল জালে জড়ালেন পাওলো মালদিনি। তারপর থেকে শুরু মিলানের মূহুর্মুহ আক্রমণ। মাঝমাঠ থেকে পিরলো আর কাকার ধ্রুপদী আক্রমণ গুলো সামলাতে লিভারপুল ডিফেন্সের পুরোই হাপিত্যেশ অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো। মিলানের ২য় গোলটা আসে কাকার বাড়িয়ে পাস শেভচেঙ্কোর পা হয়ে হার্নান ক্রেসপোর পা থেকে। ৩য় গোলের উৎস সেই কাকা। মধ্যরেখার একটু পিছন তার লম্বা করে বাড়িয়ে দেয়া থ্রু কে ডি বক্সের একটু ভিতরে নিয়ে গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে জালে জড়াতে ক্রেসপোর খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। সেই ম্যাচের প্রথমার্ধে মিলানের ফুটবল যদি হয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের মধুর রাগিনী, তাহলে দ্বিতীয়ার্ধে লিভারপুলের ফুটবল ছিল রক এন্ড রোলের ভয়ংকর সুন্দর মিউজিক।

প্রথমার্ধেই মিলানের ৩-০ তে এগিয়ে যাওয়ার পর সবার মাথায় হয়তো এই চিন্তা ছিলো লিভারপুল কয় গোলে হারে। কিন্তু একজন রাফায়েল বেনিতেজের মাথায় ছিলো অন্য চিন্তা। প্রথমার্ধে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো লিভারপুলের দরকার ছিলো দ্বিতীয়ার্ধে মাঝমাঠের রাজত্ব। ছোট একটা পরিবর্তন লিভারপুলের খেলাই পাল্টে দিলো। প্রথমার্ধে ডিফেন্সিভ মিডে একা জাভি আলোনসো ছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে আলোনসোর পাশে নামিয়ে দিলেন ডিটমার হামানকে। ফরমেশন হয়ে যায় ৩-৫-২। দুই ফ্ল্যাংকের দায়িত্ব নিলেন রিসে আর স্মিচার। স্টিভেন জেরার্ডের পিছনে ডাবল পিভোট হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেন আলোনসো আর হামান। মাঝমাঠে স্বাধীনতা পেয়ে জেরার্ড কি করেছিলেন সেদিন সেটা সবার জানা।

স্কোর লাইন ৩-৩ হয়ে যাওয়ার পর আক্রমণ প্রতি আক্রমণ চললো। কিন্তু গোলের দেখা পায়নি কেউ। এখানেও কৃতিত্ব লিভারপুলের। গোলকিপার ডুডেকের দারুণ কিছু সেইভ আর ডিফেন্ডারদের গোল না খাওয়ার মরণপণ প্রতিজ্ঞা ম্যাচ টা টাইব্রেকার পর্যন্ত নিয়ে যায়।

লিভারপুলের ফিরে আসা দেখে কি না জানিনা, টাইব্রেকারে মনে হচ্ছিলো এসি মিলানের নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়ে গিয়েছিলো। প্রথম শট টা গোল বারের উপর দিয়ে উড়িয়ে মারলেন সার্জিনহো। পিরলোর নেয়া ২য় শট টা ঠেকিয়ে দেন ডুডেক। ততক্ষণে হামান আর সিসের গোলে টাইব্রেকার ২-০ তে এগিয়ে লিভারপুল। টমাসনের লক্ষ্যভেদ স্কোর লাইন করে ২-১। রিসের শট ঠেকিয়ে নাটক জমিয়ে দেন মিলান গোলরক্ষক দিদা। কাকার বুলেট শটে স্কোর লাইন ততক্ষণে ২-২। স্মিচারের গোলে লিভারপুল এগিয়ে গেলো ৩-২ এ। মিলানের শেষ শট নিতে আসলেন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। ২০০৩ চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালে টাইব্রেকারে তার গোলেই শিরোপা জিতে নেয় এসি মিলান। কিন্তু এবার আর হলো না। শেভচেঙ্কোর দূর্বল শট টা ঠেকিয়ে ডুডেক নিশ্চিত করে দিলেন সেই দিন টা ছিলো লিভারপুলের। আতাতুর্ক অলিম্পিক স্টেডিয়ামের ৬৯০০০ দর্শক সেদিন দেখলো অসম্ভবকে সম্ভব করা এক রুপকথার বাস্তব চিত্রায়ন।

সেই ম্যাচে লিভারপুলের ২য় গোলের পর ধারাভাষ্যকার বলেছিলেন "Miracles are possible"। অসম্ভবকে সম্ভব করে লিভারপুল সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিলো খেলা হোক কিংবা জীবন, কোন কিছুতেই হাল ছাড়া যাবে না। ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের সেই ম্যাচ টি ইতিহাসে জায়গা করে নেয় "Miracle of Istanbul" নামে।