• ফুটবল

কান্না দিয়েই শুরু, কান্নাতেই সারা

পোস্টটি ৪৭৫৯ বার পঠিত হয়েছে
ন্যু-ক্যাম্পের কৃত্রিম আলো নিভে গেছে সেই সাড়ে বারোটার দিকেই। রাত দেড়টার দিকে অন্ধকার একলা মাঠে হঠাৎ-ই দেখা গেল একজনকে। ঘুরে ফিরে দেখলেন পুরো মাঠ একদম শেষে ঠিক মাঝখানটাতে বসে সেলফি তুললেন। একটু কি যেন ভাবলেন, একটু আবার থমকে গেলেন। কাতালান এই স্টেডিয়ামের প্রত্যেকটা গাঁথুনিকে আলাদা করে চেনেন তিনি। লাখ-খানেক দর্শকের সামনে এই মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন অজস্রবার, দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন কিছুক্ষণ আগেও। তাঁর স্মৃতির আকাশটা জুড়ে বোধহয় জমাট বাঁধছিল ‘ছেলেবেলার’ মেঘ! 
 
33038089_10156655618053598_652941904958193664_o
 
ছেলেবেলায় মার খুব ন্যাওটা ছিলেন। মাকে ছাড়া থাকতেই পারতেননা একদম। আর তাকেই কিনা থাকতে হবে সেই মাকে ছাড়া, একদম একা! লা-মাসিয়ায় সেদিন যখন বাবা-মা রেখে আসলো তাঁকে, চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে গলার বারোটা বাজিয়ে দেন ১২ বছর বয়সী ছেলেটা।
 
সেই ১২ বছরের কিশোর আজ ৩৪ বছরের পুরুষ। ২২ বছর পরে সোমবার রাতে আবারও তাঁর চোখে দেখা মিলল জলের। তবে এবার আর হাউমাউ নয়, একদম নীরব আর নিভৃত এক কান্না, বিদায়ের ক্রন্দন। ‘আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা লুহান’ জানতেন এটাই যে ন্যু-ক্যাম্পে তাঁর শেষ ম্যাচ!
 
একটু-আধটু ফুটবল আর বাবা-মায়ের সঙ্গে শৈশবটা ভালই কাটছিল ইনিয়েস্তার। কিন্তু সেই ‘সুখ’টাই বোধহয় আর সইলনা তার। ফুটবলটা যে একটু বেশিই ভাল খেলতেন। ব্যালোম্পাইয়ের হয়ে তাঁর পায়ের জাদুতে বার্সেলোনা হয়ে যায় বুঁদ। ক্লাবের যুব প্রকল্পের কোচ আবার চিনতেন ইনিয়েস্তার বাবা-মাকে। ব্যস, তাঁর সাহায্য নিয়ে কাতালান ক্লাবটা তাঁর বাবা-মাকে রাজি করিয়ে ফেলে ইনিয়েস্তাকে লা-মাসিয়াতে নিয়ে আসতে।
 
স্পেনের ফুয়েন্তেলবিয়া গ্রামের কিশোর ইনিয়েস্তা খেলছেন লা-মাসিয়ার মাঠে, বার্সেলোনা যুব দলের মাঝমাঠ তখন জাভি হার্নান্দেজের দখলে। এর মধ্যেই সাবেক বার্সেলোনা তারকার কানে আসল এই ছেলেটাই নাকি একদমই তাঁর মত খেলে! বার্সেলোনারই সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা বললেন, ‘দেখো জাভি, বার্সায় তুমি আমার জায়গাটা নেবে আর তোমার জায়গাটা নেবে ইনিয়েস্তা।’
 
33107418_2037565576272500_8382913448891121664_o
 
জাভিকে একটু পরখ করে দেখতেই হল। তবে সবার ধারণা ছিল ভুল! কাতালান ক্লাবকে নেতৃত্ব দেয়া মিডফিল্ডার নিজেই লিখেছেন পরে, ‘আমি যখন তাঁকে বল পায়ে দেখলাম, আমি শুধু নিজেকে প্রশ্ন করছি কি দেখছি আমি! ছেলেটা আমার মত মোটেও খেলেনা। সে ছিল একদমই আলাদা। তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতাই ছিল অন্যরকম। ড্রিবলিংয়ে সে ছিল দুর্দান্ত, ক্রসিংয়েও ছিল অনন্য।’
 
এই জাভির কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই ইনিয়েস্তা সামলেছেন বার্সার সঙ্গে স্পেনের মাঝমাঠটাও। বছর তিনেক আগে দেখেছেন জাভির চলে যাওয়া। জানতেন একদিন যেতে হবে নিজেকেও।
 
লা-লিগায় এই মৌসুমে বার্সেলোনার শেষ ম্যাচটা হয়ে গেল ইনিয়েস্তার ক্যারিয়ারেরই ইতি টানার ম্যাচ। ফুটবলকে যখন এত কিছু দিলেন, ফুটবল কি তখন একটুও দেবেনা ‘দ্য ডন’কে?
 
নাহ! ফুটবল কৃতঘ্ন নয়, বিদায়বেলায় ইনিয়েস্তাকে দুহাত ভরে দিয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। তাঁর ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে এটা নবম, বার্সেলোনার ইতিহাসের ২৫তম লা-লিগা শিরোপা। দুর্দান্ত প্রতাপ দেখিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করা গিয়েছিল মৌসুম শেষের অনেক আগেই। অথচ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মঞ্চটাতেই কিনা ছিলনা উল্লাসের ছিটেফোঁটা! থাকবে কি করে, সবার ভীষণ প্রিয় কাপিতা যে ছেড়ে চলে যাচ্ছে ন্যু-ক্যাম্প!
 
তাবৎ দুনিয়া এদিন রাতে চোখ রেখেছিল ন্যু-ক্যাম্পে। ভক্তরা নিয়ে এসেছিল ব্যানার, লেখা ছিল ‘রেফারি, শেষ বাঁশিটা বাজিওনা। ইনিয়েস্তা তাহলে আমাদের আর ছেড়ে যেতে পারবেনা।’ সমর্থকদের এমন আকুল আবেদনে যেন ফুটে উঠছে বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে বলা বার্সেলোনা কিংবদন্তির কথাটা, ‘ভাল ফুটবলারের সঙ্গে ভাল মানুষ হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকতে চাই আমি।’
 
ম্যাচের প্রত্যেকটা মিনিটে সব ফুটবলপ্রেমীদের বুকটাই ধড়ফড় করছিল। এই বুঝি ইনিয়েস্তা চলে গেলেন! কি রাইভাল দল, কিংবা পাড় ভক্ত; সবার চাওয়া ছিল বোধহয় একটাই, এই ম্যাচ যেন শেষ না হয়, চলুক অনন্ত কাল। এমন ভালবাসাই বা কয়জনের ভাগ্যে মেলে?
 
তবে বাস্তবতা যে বড্ড রুঢ়!
 
ম্যাচের সময় তখন ৮০ মিনিট ২২ সেকেন্ড। লাইনসম্যান সঙ্কেত দিলেন খেলোয়াড় বদলির। ‘১৭’ নং জার্সি পরা পাকো আলকাসের ঢুকবেন, বের হয়ে যাবেন ‘৮’ নং জার্সি পড়া খেলোয়াড়। আলকাসের  আরও বহুবার হয়ত মাঠে ঢুকবেন বা বেরোবেন। তবে ইনিয়েস্তা বেরিয়ে গেলেন শেষবারের মতো।
 
যাওয়ার আগে দলনায়ককে পুরো বার্সা দল জড়িয়ে নিল উষ্ণ আলিঙ্গনে । অশ্রু টলমল চোখজোড়া নিয়ে শেষবারের মতো লিওনেল মেসির হাতে পরিয়ে দিলেন দলপতির আর্মব্যান্ড। আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের কানে কানে হয়তো বলে গেলেন, ‘গেলাম আমি। এবার তোমার পালা। আমার ক্লাবটা দেখো রেখো।’
 
Iniesta_Image3
'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।