• ফুটবল

আবার আর্জেন্টিনা

পোস্টটি ৩১৮৪৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

বিশ্বকাপ হয় সাধারণত জুন-জুলাই মাসে। বাংলাদেশের আকাশ প্রায়ই মেঘাচ্ছন্ন থাকে। কালো-মেঘমালায় ঢেকে থাকা আকাশের রং কিন্তু নীলই থাকে। আর্জেন্টিনার পতাকার নীল। আবেগী বাঙালী আমরা জীবনের আর দশটা ব্যাপারের মত প্রিয় এই খেলাটা নিয়ে আর প্রিয় এই দলটা নিয়ে যদি একটু বাড়াবাড়ি না-ই করি তাহলে  জমে নাকি? 

কিন্তু চার বছর আগে মারিও গোটজের একটা গোল অবশ্য আবেগশূন্য করে দিয়েছিল আমাদের। চোখের সামনে একটা আজীবন স্বপ্নের মৃত্যু দাঁতে দাঁত চেপে দেখতে হয়েছিল,  আবার। কিন্তু আমরা সামলে নিয়েছি, আবার। তারপরেও, সারাজীবনে প্রিয় দলকে বিশ্বকাপ জিততে না দেখা আমাদের মত সমর্থকদের স্বপ্নের সারথী, আবার আর্জেন্টিনা।

২০১৪ বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনা দল আরো দুটি ফাইনাল খেলে কোপা আমেরিকায়। দুটিতেই চিলির সাথে পরাজয়। মাঝখানে তো মেসি একবার অবসরই নিয়ে ফেললেন, কিন্তু ফিরে এলেন আকাশী-সাদা জার্সির টানে। কোচ বদল হলেন তিনজন, ওদিকে আবার একসময়ের শক্তিশালী আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের বাজে দশা। ১৯৭৯ থেকে ২০১৪ এই লম্বা সময়টা আর্জেন্টাইন ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন হুলিও গ্রোন্ডোনা। ছিলেন ফিফার ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদেও। তার মৃত্যুর ধাক্কাটা এখনো সামলে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনার ফুটবল। তিনজন সভাপতি বদল হয়ে এখন দায়িত্বে আছেন ক্লাউদিও তাপিয়া। ঘরোয়া লীগের স্থিতিশীলতা, বয়স-ভিত্তিক দলগুলোর সঠিক পরিচর্যা, ফেডারেশনে দূর্নীতি প্রতিরোধ আর জাতীয় দলের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য সঠিক অবকাঠামো বাস্তবায়নের মত পাহাড়সম দায়িত্ব নিয়ে ফেডারেশনের সভাপতি হয়েছেন এই লোক।

এসবের মাঝে কিভাবে যেন সামনে এসে গেল আরেকটা বিশ্বকাপ। মূলত বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এবং বাউজার চরম ম্যানেজেরিয়াল ব্যার্থতার পরেই কোচ হিসেবে নিয়োগ পান হোর্হে সাম্পাওলি। চিলিকে নিয়ে কোপা জিতেছেন। এনার্জেটিক কোচ হিসেবে সুনাম আছে। কিন্তু তার খেলার ধরন দিয়ে শতভাগ মন জয় করতে পারেননি ঠিক এখন পর্যন্ত। যদিও রাশিয়ায় তার দল নির্বাচনের উপর আস্থা না রেখে উপায় নেই আপাতত। সাম্পাওলির ২৩ জনের দলে জায়গা পাননি সিরি-এ টপ-স্কোরার মাউরো ইকার্দি। 

FB_IMG_1528165284029

দল নির্বাচন নিয়ে আর্জেন্টিনার গল্পটা আরো অনেক পুরোনো। ২০০৬ কোয়ার্টার ফাইনালে যখন হুলিও ক্রুজকে মাঠে নামান হোসে পেকারম্যান, সমর্থকেরা তখন বাকরুদ্ধ। রিকেলমেকে পেনাল্টি নিতে দিলেন না কারণ ভিয়ারিয়ালের হয়ে পেনাল্টি মিস করেছিলেন। ম্যারাডোনা তো ২০১০ এ কোন রাইট-ব্যাক ছাড়াই দল ঘোষণা করলেন। ক্লাবের হয়ে ফরোয়ার্ড লাইনে খেলা গুতিয়েরেজকে খেলালেন রাইট-ব্যাকে। তবে ম্যারাডোনা কিন্তু ডি মারিয়া আর ওটামেন্ডির মত তরুণ খেলোয়াড়দের সূযোগ দিয়েছিলেন। তারা এখন দলের স্তম্ভ-বিশেষ। ওটামেন্ডি তো পুরোই বদলে যাওয়া এক খেলোয়াড়। বিশ্বের সেরা সেন্টার-ব্যাকদের মধ্যে একজন তিনি, এবার প্রিমিয়ার লীগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩,০৭৪টি পাস দিয়েছেন। 

সাম্পাওলির আর্জেন্টিনা স্কোয়াডে আছে তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেল। যদিও রোমেরোর শেষ মুহুর্তের ইঞ্জুরির কারণে কীপার নির্বাচন নিয়ে চিন্তায় আছেন সাম্পাওলি। সমর্থকদের পছন্দ এবং ঘরোয়া লীগে পার্ফরম্যান্স বিবেচনায় দলে এবারই প্রথম জায়গা পাওয়া আরমানির খেলা উচিত গোলবারের নিচে, কিন্তু কোচ সম্ভবত খেলাবেন ৩৭ বছর বয়সী কাবেয়ারোকেই। দলে আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় হচ্ছে মেসি এবং ডিবালার একই একাদশে খেলা। কিংবদন্তী মেসিকে নিয়ে নতুন করে বলার মত কিছুই নেই, ইউরোপীয়ান গোল্ডেন বুট জিতেছেন এবারও, তার হ্যাট-ট্রিকেই শেষ কোয়ালিফাইং ম্যাচ জিতে রাশিয়াগামী হয় তার দল। সম্প্রতি হাইতির সাথে হ্যাটট্রিক করেও ফর্মে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন আবার। ওদিকে সিরি-এ তে এবারও দুর্দান্ত খেলেছেন ডিবালা। সাম্পাওলি এক প্রকার নিমরাজি হয়েই তাকে স্কোয়াডে রাখলেও, তার ভাষায় মেসি এবং ডিবালা নাকি প্রায় একই ধরনেই খেলোয়াড় তাই তাদের মধ্যে একজনই থাকতে পারেন একাদশে। তার এই ধারণা কতটা যৌক্তিক তা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। মেসি এবং ডিবালা দুজনই সেন্ট্রাল-এটাকিং-মিডফিল্ডার এবং রাইট-উইং এই দুইটি পজিশনে অদল-বদল করে খেললে বিশ্বের যেকোন ডিফেন্সের জন্যই তা সাক্ষাৎ যমের চেয়ে কম হওয়ার কথা নয়। দেখা যাক সাম্পাওলি শেষ পর্যন্ত কি করেন। 

আর্জেন্টিনার মূল দুর্বলতা ডিফেন্স এবং মিডফিল্ডে। সাম্পাওলির ২৩ জনের দলেও আসলে কোন স্বীকৃত রাইট-ব্যাক নেই। কোচ বলেছেন লেফট-ব্যাক আনসালদির দুই উইংয়ে খেলতে পারার সামর্থ্যকে বিবেচনা করবেন। ম্যাক্স মেজা, লো সেলসো আর পাভোনের মত তরুণদের নেই বিশ্বকাপের মত বড় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা। মাসচেরানোকে এবারও পালন করতে হবে মিডফিল্ড জেনারেলের ভূমিকা। এভার বানেগা, ম্যানুয়েল লানজিনিদের  নিয়ে গড়া মাঝ-মাঠ ইস্কো, ইনিয়েস্তা, ক্রুস, ওজিল, কাসেমিরো, রেনাটো আগুস্তোদের স্পেন/জার্মানী/ব্রাজিলের মাঝমাঠের মত আত্মবিশ্বাস জাগানীয়া নয়। গোলকিপিংও রোমেরোর অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

আর্জেন্টিনার ভরসা তাদের ফরোয়ার্ড লাইন। মেসি, ডিবালা, আগুয়েরো, ডি মারিয়া এবং হিগুয়াইন। বার বার ফাইনালে বাজে খেলেও দলে আছেন হিগুয়াইন। কেন আছেন? কেন নেই ইকার্দি? আমার কাছে ব্যাপারটি ধারাবাহিকতা সম্পর্কিত। মেসি, ডি মারিয়া এবং হিগুয়াইনকে নিয়ে গড়া ত্রয়ী দীর্ঘদিন ধরে একাধিক কোচের অধীনে দলের প্রথম পছন্দ। এমনিতেই আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডে আহামরি সমঝোতা নেই। তাই শক্তির জায়গা ফরোয়ার্ড লাইনে অতি-পরিবর্তনের রিস্ক নেওয়া হয়নি। যদিও অনেক নতুন মুখই সাম্পাওলির অধীনে দলে ছিল।

সাম্পাওলি সম্প্রতি অতি-আক্রমনাত্মক ২-৩-২-৩ ফরমেশনটির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন।ফরমেশনটির সুবিধা হলো এটি সহজেই ৪-২-৩-১ এ  বদলে ফেলা যায়। এই ফরমেশনেরই আরেকটি রূপ, ২-২-৪-২ ব্যবহার করেছেন হোসে মরিনহোও। আক্রমণের সময় একজন, রক্ষণের সময় দুইজন পিভট মিডফিল্ডারের ইন্টারচেঞ্জ এই ফরমেশনের অন্যতম কারিগর।

সাম্পাওলি এই ফরমেশনের আভাস দিচ্ছেন, কারণ তিনি রাইট-ব্যকে এডওয়ার্ডো সাল্ভিও আর ক্ষেত্র বিশেষে মার্কোস আকুনা কে লেফট ব্যাকে খেলিয়েছেন। যারা আদতে কোন ভাবেই ডিফেন্ডার নন। পুরোদস্তুর উইংগার। এখন অবশ্য লেফট ব্যাকে খেলছেন নিকো তাগলিয়াফিকো। সাম্পাওলির আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে দেখা যেতে পারে এমন ভাবেঃ

LINEUP111528167806120

ফরমেশনটি ৪-২-৩-১ বা এটাকিং ৪-৩-৩ তে রূপান্তর করলে আবার হয়ে যাবে এমনঃ

LINEUP111528167870525

সাল্ভিও এবং বানেগার জায়গা অবশ্য নিশ্চিত নয়। তাদের জায়গায় আসতে পারেন মেক-শিফট রাইট ব্যাক মারক্যাডো এবং লানজিনি। ম্যাক্স মেজা এবং পাভোন লড়াই করবেন ডি মারিয়ার সাথে। ইজরাইলের সাথে দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচের আগে ডিবালাকে নিয়ে কি ভাবছেন কোচ তা বলা যাচ্ছেন না। সাধারণ সমর্থক হিসেবে আমি আর্জেন্টিনার দলটি ৪-২-৩-১ ফরমেশনেই সাজাতাম। তবে বানেগার জায়গায় ডিবালা, লে সেলসোর বদলে লুকাস বিলিয়া জায়গা পেতেন। রাইট ব্যাকে মারক্যাডো আর গোলকীপিংয়ে সূযোগ দিতাম আরমানিকে। এরিয়াল এবিলিটি এবং অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট  জন্য  হিগুয়াইনকেই সূযোগ দিতাম, অন্তত প্রথম দুটি ম্যাচ। যদিও আগুয়েরোকে একসময় প্রয়োজন হবেই।

LINEUP111528168357355

সাম্পাওলির  ফুটবল আদর্শ হাই-প্রেসিং এবং ওয়াইড প্লে ভিত্তিক। একারণেই তাই তিনি আক্রমনাত্মক ফুল-ব্যাক দিয়ে দল সাজাতে পছন্দ করেন। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা সাধারণত পাসিং ফুটবলের সাথে পরিচিত। গত বিশ্বকাপে মাসচেরানোকে পিভট পজিশনে রেখে দলের একটা স্থিতিশীল ছন্দ তৈরী করেছিলেন আলেহান্দ্রো সাবেয়া।  সাম্পাওলির প্রেস-নির্ভর আক্রমনাত্মক ফুটবলে সাফল্য পাওয়ার যথেষ্ঠ রসদ এই দলে আছে ঠিকই কিন্তু এই ফর্মূলার এক্সিকিউশন কতটা করতে পারেন মেসি আর আর সতীর্থরা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ট্যাক্টিকাল কথা শেষ। আমরা এত ফর্মূলার ভীড়েও আবার একবার আশায় বুক বাঁধবো। স্পেন, ব্রাজিল, জার্মানীর মত দল আর্জেন্টিনার চেয়ে কত বেশি শক্তিশালী ও গোছানো এটা জেনেও আমরা স্বপ্ন দেখবো। ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ মত আরো অনেক সালের আমাদের ব্যর্থতার গল্প গুলোর পাহাড়ে দাঁড়িয়েই আর্জেন্টিনার কোন এক অধিনায়ক বিশ্বকাপ একদিন ঠিকই তুলে ধরবেন। সেই অধিনায়ক রাশিয়ায় মেসি হলে মন্দ হয় না।

(প্রচ্ছদ ও ২৩ জনের স্কোয়াডের ছবি আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রহীত)