• ফুটবল

ফুটবলের ম্যাডম্যান মার্সেলো বিয়েলসা - শেষ পর্ব

পোস্টটি ২৭৯৪ বার পঠিত হয়েছে

আপনি কি আপনার প্রিয় মানুষের মুখচ্ছবি বার বার দেখলে বিরক্ত হবেন? আমার তো মনে হয় হবেন না, এখন একটু চিন্তা করে দেখুন আপনার প্রিয় মানুষের জায়গায় আপনি ফুটবল কে বসালেন, তাহলে আপনি প্রতিদিন কয়টা করে ম্যাচ দেখতে পারবেন? হয়ত ১০ টা কিংবা ২০ টা? এখন যদি মার্সেলো বিয়েলসার কথা বলি তবে সে ফুটবল কে খুব সম্ভবত পাগলের মত ভালবাসে, কারণ একটা নরমাল মানুষের পক্ষে রেগুলার প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৮ ম্যাচ দেখাটা অনেক কষ্টের ব্যাপার, তো এই ফুটবল অনুরাগী কিভাবে আধুনিক ফুটবলের কৌশল দাড় করিয়েছেন সেটা আজ আমি আপনাদের জানানোর একটা চেষ্টা করবো, আর এটা জানার জন্যে সবার আগে আপনাকে জানতে হবে তার কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি বা ট্যাকটিকস,

বিখ্যাত ৩-৩-১-৩ :

বিয়েলসা কোচিং জীবনের শুরুতে ব্যবহার করতেন ৩-৪-৩ ফরমেশন, কিন্তু আস্তে আস্তে তার ফরমেশন পরিবর্তন হতে থাকে এবং শেষে তা এসে দাঁড়ায় ৩-৩-১-৩ এ, তার ফুটবল খেলানোর স্টাইল প্রচুর এগ্রেসিভ, সে পজেশনাল ফুটবলের সাথে স্পিড এর কম্বিনেশন করেছেন, আর অফ দ্যা বলে দলকে দিয়ে প্রচুর প্রেস করান, তার এই ফরমেশন এর মূল লক্ষ্য হল এটাক ও ডিফেন্স দুটোই করার সময় যাতে পিচের সব জায়গায় পর্যাপ্ত ম্যান পাওয়ার পাওয়া যায়,  তার ফরমেশন এর সিস্টেম অনুযায়ী তিনজন সেন্টার ব্যাক থাকে ডিফেন্স লাইন হিসেবে, এই তিনজনের উপরে থাকে একজন ডিফেন্সিভ মিড, ডিফেন্সিভ মিডের দুই পাশে থাকে দুইজন ওয়াইড মিড/ফুলব্যাক, এদের উপরে থাকে একজন মিড যে এটাকিং মিডের মত আচরণ করে, বিয়েলসার সিস্টেমে এই মিডের ক্রিয়েটিভ ক্ষমতা বেশ ভালো থাকা চাই, এই মিডের উপরে থাকে দুই জন উইঙ্গার এবং একজন স্ট্রাইকার, এটাকের জন্যে ৩-৩-১-৩ ব্যবহার করলেও তিনি ডিফেন্স করার জন্যে ৪-১-৪-১ অথবা ৩-৫-২ ব্যবহার করেন, প্রতিপক্ষ অনুযায়ী তার ডিফেন্সের ফরমেশন ঠিক করেন তিনি, যদি প্রতিপক্ষ বেশি স্পিডি গেম না খেলে তখন তিনি ৩-৫-২ এ ডিফেন্স করান এবং খেলোয়াড়দের দিয়ে অফ দ্যা বলে প্রচুর প্রেস করান, আমরা এই সিজনে লিভারপুলকে অফ দ্যা বলে যেমন প্রেস করতে দেখেছি ঠিক তেমন প্রেস করান যাতে করে প্রতিপক্ষের ১ জন খেলোয়াড়ের সামনে তার ২/৩ জন খেলোয়াড় থাকে এবং ওই একজনকে তারা পিচের এক পাশে আটকে ফেলার চেষ্টা করে। আর যদি প্রতিপক্ষ বেশ হাই টেম্পো তে গেম খেলে তখন তিনি ৪-১-৪-১ ব্যবহার করেন কিন্তু এই ফর্মেশনেও তিনি প্রেস করান,

এটাক করার স্টাইল :

তিনজন ডিফেন্ডার ও তিনজন মিড মিলে এটাকের সময় একটা বোল আকৃতির শেইপ তৈরি করে এবং বল নিজেদের পায়ে রাখার চেষ্টা করে এবং আস্তে আস্তে বল পায়ে নিয়ে প্রতিপক্ষের হাফে উঠে আসে, এরপর বল ক্রিয়েটিভ মিডের কাছে তারা পাঠায় এবং ক্রিয়েটিভ মিড লং বল, ভার্টিক্যাল পাস, থ্রু বলের যোগান দেয়, দুই উইঙ্গার অপোজিশন এর দুই ফুলব্যাক এর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করে যাতে করে তারা ওই উইঙ্গার দের মার্ক করে এবং তাদের ফলো করে, তাদের ফলো করতে যেয়ে প্রতিপক্ষ ফুলব্যাকরা নিজেদের লাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং এর ফলে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সে সৃষ্টি হয় স্পেসের, এই স্পেস কে কাজে লাগিয়ে দুই ওয়াইড মিড/ফুলব্যাক প্রতিপক্ষ বক্সে ওভারলোড করার চেষ্টা করে এর ফলে তখন প্রতিপক্ষের দুই/তিন জন সেন্টার ব্যাকের সামনে তার দলের ৪/৫ জন এটাকার পাওয়া যায়, এছাড়াও তার দল কুইক কাউন্টার এটাক এর মাধ্যমে গোল করার চেষ্টা করে এবং তার দল খুব দ্রুত ট্রানজিশন করে থাকে।

এই তো গেলো তার ট্যাকটিকস এর বিশ্লেষণ, এবার দেখা যাক কি করে তার দেখানো পথ ধরে মর্ডান ফুটবল হাঁটছে, 

মর্ডান ফুটবলের অন‍্যতম হাতিয়ার হচ্ছে হাই প্রেসিং, আর এই প্রেসিং এর ধারণা এই জামানায় তিনিই বলতে গেলে প্রথমে এপ্লাই করেন, এছাড়াও তার ট্যাকটিকস সরাসরি কিংবা মডিফাই করে বর্তমান আমলের অনেক বিখ্যাত কোচ যেমন পেপ গার্দিওলা, ক্লপ, সিমিওনে, জিদান, পচেত্তিনো, সাম্পাওলি  ব্যবহার করে তাদের টিম চালাচ্ছেন, পেপ গার্দিওলাকেই দিয়ে শুরু করি, তিনি যখন বার্সার দায়িত্ব পান তখন তিনি সবার আগে বিয়েলসার সাথে দেখা করার জন্যে আর্জেন্টিনা চলে যান এবং ফিরে আসেন বিয়লসার ট্যাকটিকস এর দীক্ষা নিয়ে, বার্সায় তিনি খাতা কলমে ৪-৩-৩ ফরমেশন ব্যবহার করলেও মাঠে সেটা হত ৩-৩-১-৩, পুয়োল পিকের সাথে ডিফেন্স লাইনে চলে আসতো বুস্কিটস, যাদের দিয়ে হত থ্রি ম্যান ডিফেন্স লাইন, দুই ফুলব্যাক একজন সেন্ট্রাল মিডের সাথে থাকতো এবং ডিফেন্সের সাথে মিলে সেই বোল শেইপ তৈরি করত , ক্রিয়েটিভ মিডের দায়িত্ব থাকতো ইনিয়েস্তার উপর, তার দায়িত্ব ছিল ফ্রন্ট থ্রি এর কাছে থ্রু বল, ভার্টিক্যাল পাস, লং বল এর সরবরাহ করা, আর সামনে থাকত মেসি সানচেজ ইতোদের নিয়ে গড়া ফ্রন্ট থ্রি, জিদান কিন্তু এই সিস্টেম কে কিছুটা মডিফাই করেই তার প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রথম এল ক্লাসিকো জিতেছিল, ক্যাসেমির রামোস ভারানদের নিয়ে হত জিদানের থ্রি ম্যান ডিফেন্স, মার্সেলো কার্ভাহাল উঠে আসতো প্রতিপক্ষ বক্সের কাছাকাছি যাতে করে প্রতিপক্ষ বক্সে ওভারলোড করা যায়, আর মদ্রিচ ক্রুস থাকতো মার্সেলো কার্ভাহাল কিংবা তিন ফরোয়ার্ড এর কাছে বল সাপ্লাই করার জন্যে, যেহেতু জিদানের কাছে ভালো এরিয়াল এবিলিটির খেলোয়াড় ছিল তাই তিনি তার ফুলব্যাক দের দিয়ে বক্সে প্রচুর ক্রস করাতেন এবং প্রতিপক্ষ কে চাপের মুখে রাখতেন, এই চাপের কাছে প্রতিপক্ষ এক সময় হেরে যেতো এবং ভুল করে বসত, যার ফলে আসতো গোল, আর ডিফেন্স জিজু ৪-১-৪-১ ব্যবহার করত, মিল পাচ্ছেন তো বিয়েলসার সাথে? কিন্তু পরবর্তীতে জিজু এগুলোর সাথে আরো যোগ বিয়োগ করেন, এছাড়াও আমি বাকি যাদের নাম বললাম উপরে আপনি চাইলে তাদের ট্যাকটিক্যাল প্রোফাইল একটু চেক করে দেখতে পারেন এবং দেখবেন প্রত্যেকের ট্যাকটিকস এর বেসিক হচ্ছে বিয়লেসার ট্যাকটিক সেই ৩-৩-১-৩, 

এই অংশে আমি বিয়েলসার ফুটবল জ্ঞান সম্পর্কে কিছু বলব, আপনি কয়জন কোচের কাছে প্রায় সব ফুটবল খেলোয়াড়ের ট্যাকটিক্যাল প্রোফাইল পাবেন? বিয়েলসার কাছে প্রায় সব ফুটবলারের ট্যাকটিক্যাল প্রোফাইল পাবেন এবং সেটাও ভিডিও দিয়ে বিশ্লেষণ করা, তার প্রতিদিন গড়ে ৩০/৪০ টা ম্যাচ দেখার প্রধান কারণই হচ্ছে খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক্যাল প্রোফাইল তৈরি করা এবং বিভিন্ন কোচের ট্যাকটিকস সম্পর্কে জানা, বিয়েলসা নিজে বেশ কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করে কোচ এবং খেলোয়াড়দের প্রোফাইল তৈরি করেন, আর নিজের ম্যাচের প্রস্তুতির জন্যেও তিনি বেশ কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। ইভেন তার ট্রেইনিং করানোর স্টাইলও অন্য কোচদের থেকে আলাদা, তিনি মাঝে মাঝে ডিফেন্ডার মিডফিল্ডার স্ট্রাইকার তিনটা ডিপার্টমেন্ট কে আলাদা আলাদা ভাবে ট্রেইন করান, এবং খেলোয়াড়দের কনফিডেন্স যাতে গ্রো করে সে জন্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, এই প্রসঙ্গে সাবেক মার্সেই প্লেয়ার মেন্ডির একটা কথা তুলে ধরতেই হয় " বিয়েলসা আমাকে আমার হারানো শক্তি ও এগ্রেসিভনেস ফিরিয়ে দিয়েছে", বিয়েলসা ফুটবল জ্ঞানের ব্যাপার জন কর্লিন নামক ইংরেজ সাংবাদিক বলেন " দুনিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ ফুটবল লাইব্রেরী আছে বিয়েলসার কাছে" , বিয়েলসা নিজে সিস্টেমাইজ গেম পছন্দ করেন, তার মতে ফুটবলে প্রায় ২৯ রকমের ফরমেশন আছে, একজন খেলোয়াড়ের উচিৎ ছোটবেলা থেকে সব গুলো ফরমেশনে খেলার অভ্যাস করা", 

আমার মত একজন ক্ষুদে মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে যতটুকু বিশ্লেষণ করা সম্ভব আমি তা করার চেষ্টা করেছি, একজন ফুটবল ভক্ত হিসেবে তার প্রতি রইল অনেক শুকামনা। 

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।