• ক্রিকেট

শুভ জন্মদিন, মোহাম্মদ রফিক!

পোস্টটি ২৬৫৭ বার পঠিত হয়েছে
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের যে ক্রিকেট দলে মোহাম্মদ রফিকের মতো প্লেয়ার খেলে গেছেন— সে একই দলে সাব্বির-নাসিরের মতো প্লেয়ার খেলছে! মোহাম্মদ রফিক আসলে কে? বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থান নিয়ে যাঁদের একটু জানা-শোনা আছে, তাঁদের নিশ্চয় 'মোহাম্মদ রফিক' নামটার সাথে পরিচয় আছে। তাঁর খেলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি ক্রিকেট বুঝার আগেই উনি ক্রিকেট ছেড়েছেন; ১০ বছর আগে। তবুও ইউটিউবের কল্যাণে বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের এ প্লেয়ারের খেলা দেখা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থানপর্বে 'মূলতান ট্রাজেডি' নামের একটা অধ্যায় আছে। ২০০৩ সালের ঘটনা। ৩ ম্যাচ সিরিজের শেষটিতে পাকিস্তানের চুরি-প্রতারণার কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ। সে ম্যাচে শেষ উইকেট জুটিতে ইনজামাম উল হকের সাথে ছিল উমর গুল। 'ম্যান কান্ডিং' নামের যে শব্দটা ক্রিকেটে প্রচলিত আছে, বাস্তবিকভাবে তার সাথে আমাদের পরিচয় করে দিয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক। উমর গুলকে নিশ্চিত রান আউট না করে ক্রিকেটে মহানুভবতার এক অম্লান মূর্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ম্যাচটি শোচনীয়ভাবে হেরে যায়। পরবর্তীতে রফিককে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তাঁর সরল ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন, "আউটটা করলে আমরা জিতে যেতাম ঠিক; কিন্তু, মানুষ আমাদের ছোটলোক ভাবত। আমরা ছোট লোক নয়।" উচ্চ ব্যক্তিত্বের এ মানুষটি একটি বস্তি থেকে ওঠে এসেছে, যে জীবনে কখনো পড়ালেখা করেননি! ভাবা যায়! ১৯৯৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর অংশ নেওয়া সকল খেলোয়াড়কে সরকারি অনুদানে জমি আর গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। মোহাম্মাদ রফিক সে টুর্নামেন্টের ১৯ উইকেট নিয়েছিলেন আর ফাইনালে করেছিলেন ম্যাচজয়ী ২৫ রান। তাঁর সে জমি দান করেছিলেন এলাকার বস্তিতে স্কুলের জন্য; আর গাড়ি বিক্রির টাকায় উঠেছিল স্কুলের বিল্ডিং। বলেছিলেন, "আমরা তো লেখাপড়া করতে পারি নাই। পোলাপাইনগুলা যেন পারে।" পরবর্তীতে তাঁর দান করা এক জমিতে হয়েছিল চক্ষু হাসপাতাল। ক্রিকেটের বাইরে সাদাসিধে মানুষটাকে কেউ যদি মাঠের খেলা (ইউটিউবে) না দেখে— যিনি পুরান ঢাকায় আঞ্চলিক  ভাষায় কথা বলে— তাহলে হয়ত বুঝাই যাবে না, এ মানুষটা টেস্টে ১০০ ও ওয়ানডেতে ১২৫ উইকেট পাওয়া একজন বাঁহাতি বোলার; একজন প্রফেশনাল বোলার হয়েও যিনি ব্যাটিংয়ে নেমে ক্যামিও ছড়াতে পারতেন। টেস্টে উইকেট সংখ্যাটা দ্বিগুণ হতে পারত— হয়নি, কারণ তখন বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিংয়ের সুযোগ পেতেন খুব কম। টেস্টে স্পিনাররা সবচে' বেশি বেনিফিসারী হয় ৪র্থ-৫ম দিনে— অথচ বাংলাদেশ ৪র্থ-৫ম দিনে টেস্টটা নিয়ে যেতে পারতেন না। কি বোলিং, কি ব্যাটিং, কি ফিল্ডিং, কি ব্যক্তিত্ব— ক্রিকেট মাঠ ও মাঠের বাইরের প্রতিটি বিভাগেই নিজেকে উজাড় করে তিনি প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন উনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। দেশপ্রেমের স্মারক রেখে গেছে প্রতিটি বিভাগেই। সৌরভ গাঙ্গুলীর মাধ্যমে ভারতে খেলার প্রস্তাব এসেছিল; দেশের স্বার্থে হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সে প্রস্তাব। আর স্পোর্টসম্যানশীপের কথা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না— যা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটে মডেল বলা যায়। উইকেট পাওয়ার পর 'পাড়ার ক্রিকেটে শিশু-কিশোররা যে শিশুসুলভ সেলিব্রেশন করে', ঠিক সেটাই দেখা যেত মোহাম্মদ রফিক উইকেট পাওয়ার পর— যা আপনি ইউটিউবে 'Mohammad Rafique' সার্চ না করলে কল্পনাও করতে পারবেন না। তাঁর সেলিব্রেশন প্রমাণ করে দেয় তিনি কত নিখাদ মনের মানুষ। আপনি আসলে গুলিয়ে ফেলবেন, মানুষটার কিসে আসলে ভক্তরা ভক্ত ছিল— ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং না-কি ব্যক্তিত্ব? ক্রিকেট মাঠের বাইরে এক অভাবনীয় মাটির মানুষটির আসলে কী ছিল না— ক্যারিয়ার-টাকা থেকে শুরু করে কী? কোথায় তিনি সফল ছিলেন না— মাঠে না মাঠের বাইরে? বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের ক্রিকেটার তৈরি হওয়ার শুরু তাঁর থেকে। তাঁকে দেখে বাহাতি স্পিনাররা স্বপ্ন দেখত; স্বপ্ন দেখতে দেখতে ওঠে এসেছিল এনামুল জুনিয়র-রাজ্জাক-সাকিবের মতো স্পিনার। দুর্ভাগ্য এ যে, উনার বাঁহাতি স্পিনকে আইডল মেনে অনেকে দলে এসেছে; তবে উনার ডেডিকেশন, ব্যক্তিত্ব আর গ্রেট-স্পোর্টসম্যানশীপকে ধারণ করতে পেরেছে খুব কম ক্রিকেটার। ১৯৯৫ থেকে ২০০৮— দীর্ঘ এক যুগের বেশির ক্যারিয়ারে তিনি স্পোর্টসম্যানশীপের এক মহানজির সৃষ্টি করেছেন; সারাজীবনে ধারণ করেছেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক মোহাম্মদ রফিককে। বাংলাদেশে 'জ্ঞানীদের কদর না করার একটা সিস্টেম আছে'। সে সিস্টেমে বলি হয়েছেন তিনিও। টক শোতে নিজের সরল ভঙ্গিতে-ভাষায় কথা বলে যাওয়া মানুষটা বিপিএলের মত লিগে ডাক পেলেই হাসিমুখে ছুটে এসে সাধ্যমত দিয়ে যান দেশের ক্রিকেটের জন্য; এরপর চলে যান বুড়িগঙ্গার ঐ পাড়ের নিজের রডের ব্যবসা দেখতে। এত বড় ক্রিকেট বোর্ড, ক্রিকেট দল, বয়স ভিত্তিক দল, এইচপি দল— কোথাও তাঁর ঠাই হয়নি, তাঁকে ডাকা হয় না; অথচ এ সেক্টরগুলোতে উনার মত উজাড় করে একজন মানুষের, একজন কোচের, একটা ব্যক্তিত্বের বড্ড প্রয়োজন। উনি ছুটে গিয়েছেন সে নিজের এলাকায়, যেখান থেকে উদাহরণ হয়ে ওঠে আসে লাখে একটা মোহাম্মদ রফিক। বাকিদের স্বপ্ন চাপা পড়ে। এখন আর একজনটাও তেমন ওঠে আসে না। সারাজীবন নিজের এলাকার-দেশের মানুষের জন্যই ভেবেছেন। …"বুড়িগঙ্গার ওইদিকে বাবু বাজারে একটা ব্রিজ হলে মানুষের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হতো", সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দিতে চেয়েছিলেন বিশ্ববিজয়ের পুরস্কার। তিনি বেছে নিয়েছিলেন তার শেকড়কে; বুড়িগঙ্গা পাড়ের সেই বস্তিকে! শেকড় থেকে ওঠে এসে অনেকের আবার শেকড়ে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু ফিরে গিয়ে শেকড়কে আঁকড়ে ধরতে খুব কম মানুষে পারে; মোহাম্মদ রফিক ব্যতিক্রমীদের একজন। আজ এ মহান ব্যক্তিত্বের ৪৮ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ আজকের দিনে জন্ম হয়েছে দেশের এ গ্লোবাল আইকনের। জন্মদিনে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা রইল প্রিয় ব্যক্তিত্বের এ মহাতারকার প্রতি। - - - -
'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।