• ফুটবল

একজন জহুরীর গল্প - শেষ পর্ব

পোস্টটি ২৪৫৬ বার পঠিত হয়েছে

স্যার এলেক্স ফার্গুসন ইউনাইটেড কে সফল করেছিলেন তার ট্যাকটিকস এর সাথে কিছু গুণের সমন্বয় ঘটিয়ে যার মধ্যে অন্যতম ছিল গ্রেট ম্যান ম্যানেজমেন্ট, মাস্টার ট্যাকটিসিয়ান, জহুরী যেমন হীরে চিনে বের করতে পারে তেমন ফার্গুসন মার্কেট থেকে ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় খুঁজে বের করতে পারতেন, আর টিম সিলেক্টর হিসেবে তিনি ছিলেন রুথলেস এবং এগ্রেশিভ,  তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের ট্যাকটিক ব্যবহার করলেও বেসিক ব্যাপার গুলো মোটামুটি একই ছিল, দেখে নেয়া যাক তার ফরমেশন ও স্ট্র্যাটেজি - 

ফরমেশন ও ট্যাকটিকস -

ফার্গুসন বিভিন্ন রকমের ফরমেশন এবং কৌশল ব্যবহার করেছেন, তার কোনো নির্ধারিত কৌশল ছিল না, প্রতিপক্ষ/ম্যাচ অনুযায়ী তার কৌশল সাজাতেন তিনি, আমি ৯৯ এর ট্রেবল জেতা দলের কৌশল দিয়ে শুরু করি।  ৯৯ এ তার ট্রেবল জয়ী দলের ফরমেশন ছিল ৪-৪-২ , তার দল ফাস্ট ফুটবল খেলবে, দলের শেইপ হবে ফ্লুইড, টেম্পো হাই হবে না, অর্গানাইজড ডিফেন্স থাকবে, বক্স টু বক্স মিড থাকবে ডিফেন্স ও এটাক এ সমান ভাবে সাহায্য করার জন্যে, ফুলব্যাক ওভারল্যাপ করবে এবং প্রতিপক্ষ বক্সে ওভারলোড করবে। আর এই দলে ছিলো নেভিল, গিগস, বেকহ্যাম এর মত ট্যালেন্টেড খেলোয়াড়, পিটার স্মাইকেল এর মত গোলকিপার যার ফাস্ট থ্রো করার এবিলিটির জন্যে ইউনাইটেড তারাতারি এটাক করতে পারতো,  পাস করতে করতে তার টিম শেইপ মেইন্টেন করে প্রতিপক্ষ মিড পর্যন্ত যাবে এবং সেখান থেকে ওয়াইড পজিশনে বল পাঠাবে লেফট অথবা রাইট মিড এবং তারপর বল টার্গেট ম্যান এর কাছে যাবে এবং সেখান থেকে গোল আসবে, তার দলের প্রধান গুন ছিল যত যাই হোক না কেনো ম্যাচ হারা যাবেনা, মোটামুটি এই ছিল ৯৯ এ তার ট্যাকটিকস এর একটা চিত্র, 

২০০৭/০৮  এ তিনি তার ডাবল জেতা দলে তিন রকমের কৌশল এপ্লাই করেছেন, তার দল লীগে খেলতো ৪-৪-২ ফরমেশন এ, সে বছর ইউনাইটেড গোল করেছিল ৮০ টি, রুনি রোনালদো তেভেজ কে নিয়ে তৈরী হয়েছিল এক ভয়ংকর ট্রিও, এদের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল এদের ফ্লেক্সিবিলিটি, এরা তিনজন সহজেই একে অপরের সাথে পজিশন চেঞ্জ করে খেলতে পারতেন, এবং এরাই ওই সিজনে ৭০% গোল করেছিল, তারা যেহেতু বার বার নিজেদের সাথে পজিশন চেঞ্জ করতো সেই জন্যে ফ্রন্টে হ্যাভোক এর সৃষ্টি হত এবং ডিফেন্ডাররা কনফিউজ হয়ে যেত যে কাকে মার্ক করবে, কে কাট ইন করে ঢুকবে বা কে বক্সের বাইরে থেকে শট নেবে সেটা অপোজিশন এর জন্যে বুঝে ওঠা বেশ কঠিন ছিল। সে বছর এটাকের সাথেসাথে তাদের ডিফেন্স ভাল সলিড ছিল, তার প্রমাণ ইউনাইটেড মাত্র ২২ টি গোল হজম করেছিল লীগে, ব্রাউন এভরা ফার্ডিন্যান্ড ভিদিচ কে নিয়ে তৈরী হত তাদের ডিফেন্স লাইন আর কিপার ছিল ভ্যানডার স্যার, দুইজন সেন্টার ব্যাকের মধ্যেকার বোঝাপড়া ভালো ছিল, দুইজনের মধ্যে ফার্ডিন্যান্ড ছিল দ্রুত, বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন, এবং কম্পোজড, আর ভিডিচ ছিল ট্যাকেলার এবং লিডার। দুইজন বক্স টু বক্স সেন্ট্রাল মিড খেলতো প্রিমিয়ার লীগের ৪-৪-২ সিস্টেমে, এদের মধ্যে ক্যারিক নিচে নেমে আসতো যার ফলে স্কলস উপরে উঠে প্লে মেকারের ভূমিকা পালন করতে পারত, দুইজন সেন্টার ব্যাকের মত দুইজন সেন্ট্রাল মিডের বোঝাপড়া ভালো ছিল এবং এদের দুইজনের বেশ কিছু নিজস্ব সামর্থ্য ছিল, যেমন ক্যারিক ছিল কম্পোজড, ভালো ডিফেন্সিভ এবিলিটির অধিকারী এবং ডিপ লায়িং প্লে মেকার, আর স্কলস এর ছিল ভালো ভিষন, স্পেস খুঁজতে ওস্তাদ আর লং শট থেকে গোল করার এবিলিটি। রোনালদো রাইটে খেলবে না কি লেফটে তার উপর নির্ভর করে দলে আসতো ন্যানি অথবা গিগস, রোনালদো কাট ইন করে বক্সে ঢুকতো অথবা প্রয়োজনে নীচে নেমে বিল্ড আপ করতে সাহায্য করতো, অপর দিকে ন্যানি বা গিগস উইং থেকে বল বক্সে চালান করতো। এই ছিল মোটামুটি লীগের কৌশল।

চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ফার্গুসন দুটি ফরমেশন এবং কৌশল এপ্লাই করেছেন, যার একটি হচ্ছে হাইব্রিড ৪-৪-২, লীগের ৪-৪-২ আর এর মধ্যে পার্থক্য ছিল এক জায়গাতে, সেটি হল লীগ এর ৪-৪-২ এ একজন সেন্ট্রাল মিড এটাক করতে সাহায্য করতো আর একজন সেন্ট্রাল মিড নিচে নেমে আসতো, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ৪-৪-২ এ দুইজন মিডই ডিপে থাকতো যার ফলে খেলা বিল্ড করার জন্যে উইং এর উপর বেশি ডিপেন্ড করতে হত। আরেকটি ফরমেশন হল ৪-২-৩-১, এই ফরমেশন এর লাইনাপ এ দুটি চেঞ্জ ছিল তেভেজ এর বদলে সেন্টার ফরোয়ার্ড ছিল রোনালদো, তেভেজ এর বদলে এটাকিং মিড হিসেবে আসতো এন্ডারসন, উইং এ ন্যানি/গিগস এর বদলে আসতো পার্ক, রুনি খেলতো লেফট উইঙ্গার এর মত, কারণ রুনির ডিফেন্সিভ এবিলিটি ছিল রোনালদো থেকে ভালো আর পার্ক জি সুং এর স্ট্যামিনা বেশি হবার দরুন সে গিগস/ন্যানির থেকে প্রাধান্য বেশি পেত এই কৌশলে, এই কৌশলের প্রধান সুবিধা ছিল ফ্লেক্সিব্যালিটি, রুনি আর রোনালদো নিজেদের মধ্যে বার বার পজিশন চেঞ্জ করত, আর রোনালদো বক্সের ডান বাম যেকোনো পাশেই ড্রিফট করতো।স্যার  অ্যালেক্স ফার্গুসন সবসময়ই ইন্ডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ানস এ বিশ্বাসী ছিলেন। ২০০৭/০৮ এর ডাবল এ ইন্ডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ানস বেশ বড় ভূমিকা রেখেছিল।

আমার দেখা সেরা ট্যাকটিশিয়ানদের একজন হলেন ফার্গুসন, ফুটবল এ কোচদের তালিকায় তার স্থান সবসময়ই উপরের দিকে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।