• ফুটবল

হে মহান বাফুফে, সুফিলদের অন্তত রক্ষা করুন

পোস্টটি ১৩৩৮ বার পঠিত হয়েছে

গত ৯ মার্চ থেকে দেশের ফুটবলে হালকা স্বস্তির বাতাস বইছে। বিদেশের মাটিতে ৩ বছরের জয়-খরা কাটিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ে ২০ ধাপ এগিয়ে থাকা কম্বোডিয়াকে তাদের মাঠে ১-০ গোলে হারানো স্বস্তির বিষয়ও বটে। খাঁ খাঁ মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আসে ম্যাচে রবিউল হাসানের একমাত্র গোল— তবে, রবিউলকে ছাপিয়ে ম্যাচটি ঘিরে আলোচনায় তাকে গোল করতে বল বাড়িয়ে দেওয়া মাহবুবুর রহমান সুফিল ও সুফিলের গতি। সুফিলের দৌঁড়ের দুরন্ত  গতিতে মুগ্ধ হয়েছিল সেদিন সবাই। সুফিল শুধু এ কদিনে নয়, দেশের ফুটবলে উদয়ীমানদের মধ্যে বেশ আলোচিত নাম বেশ আগে থেকেই। গত বছরের মার্চে লাওসের বিপক্ষে ম্যাচে সুফিলের গায়ে জাতীয় দলের জার্সি তুলে দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু ওর্ড। ম্যাচের বদলি সময়ে অভিষেক হওয়া সে-ম্যাচেই গোল করেন সুফিল। এরপর সেপ্টেম্বরে ঘরের মাঠে সাফ ফুটবলে ভুটানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় ম্যাচেই চোখজুড়ানো গোল করেছিলেন। বাংলাদেশের স্ট্রাইকারদের বল প্রথম দফায় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরও ঠিকঠাক পোস্টে রাখতে না পারার বদনাম আছে। সেখানে সুফিল প্রথম স্পর্শেই বল সরাসরি জালে জড়িয়ে দিয়ছিলেন সে-ম্যাচে!

তবে আজ আরেকটু অবাক হলাম একটি তথ্য পেয়ে। তথ্যটি জানার পর যে-কেউই অবাক হতে বাধ্য। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্সধারী ও বাংলাদেশের অন্যতম কোচ মারুফুল হকের কৃতিত্বে এবং প্রথম আলোর সাংবাদিক রাশেদুল ইসলামের আজকের একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানতে পারলাম, ১৯ বছর বয়সী সুফিলের গতি প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৮.৯ মিটার (হিসাবটা গত বছরের); ঘণ্টায় যা ৩২.০৪ কিলোমিটার। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা ‘জিপিএস’ যন্ত্রের রিপোর্টের মাধ্যমে এসেছে সুফিলের গতির এ তথ্য, যা মারুফুল হকের কম্পিউটারে সংরক্ষিত আছে। সারাবিশ্বে বল পায়ে গতির জাদু দেখানো ফুটবলারের মধ্যে প্রথমে আছে কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম। ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের তথ্যানুসারে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে মাঠ কাঁপানো এই তারকা বল নিয়ে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৩৬ কিলোমিটার গতিতে দৌঁড়েছেন। তারপরে আছেন অ্যাথলেটিকো বিলবাওয়ের উইলিয়াম। স্পেনের এই খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গতি রেকর্ড করা হয়েছে ঘন্টায় ৩৫.৭ কিলোমিটার। আর সে-তালিকার দশ নম্বরে ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের ন্যাচো। তিনি বল নিয়ে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৩৪.৬২ কিলোমিটার গতিতে দৌঁড়েছেন। বিশ্বমাতানো ফুটবলারদের তুলনায় খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও সুফিলের দৌঁড়ের গতি বিশ্বমানের বলছেন মারুফুল হক। যা সর্বশেষ ২০১৮-তে শেষ হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে ফুটবলারদের গতির চূড়ান্ত তালিকার প্রথম ৫০ জনের মধ্যে শেষ পনেরো জনকে লক্ষ্য করলে বুঝা যায়। ১৫ জনের সে তালিকায় আছেন আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড পাভোন, ফ্রান্সের এমবাপ্পে ও গ্রিজমানের মতো তারকারা— যাদের গতি সুফিলের সমান ঘণ্টায় ৩২.০৪ কিলোমিটার। ভৌগলিক অবস্থান ও বাংলাদেশের আবহাওয়া বিবেচনায় সুফিলের এ গতি সত্যিই বিস্ময়কর।

কিন্তু এবার আরেকটু বিস্মিত ও হতাশ হবেন আরেকটি তথ্য জেনে। বাংলাদেশ ফুটবল টিম বস জেমি ডে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নিয়ে ফরোয়ার্ড লাইনের মূল লক্ষ্য হিসেবে সুফিলকে এশিয়ান গেমসে খেলিয়ে বাজিমাত করেছেন। এশিয়াডে দুর্দান্ত খেলা সুফিল থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে গোলও করেছিলেন। এরপর সাফেও জেমির আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন তিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ যে, ২০১৮ সালের পূর্ণ মৌসুম আরামবাগের জার্সিতে রাইটব্যাক হিসেবে খেলেছেন সুফিল। শুধু তাই নয়, এশিয়াড ও সাফে ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে দূর্দান্ত পারফরমেন্সের পরেও ঘরোয়া লিগের এবারের মৌসুমেও স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোনের আওতাধীন বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে আবারও রাইটব্যাক হিসেবে খেলতে হচ্ছে সুলিফকে। এ নিয়ে হতাশ বাংলাদেশ দলের কোচ জেমি ডে। হতাশ হবেন নাই-বা কেন!  আক্রমণভাগের মতিন মিয়া, বিপলু আহমেদ, জাফর ইকবাল ও আরিফুর রহমানের মতো লিগে আলো ছড়ানো তরুণদের ছাপিয়ে নাম্বার নাইন হিসেবে যে শারীরিক যোগ্যতার প্রয়োজন, তা কেবল সুফিলেরই আছে। সদ্য কম্বোডিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচই এর উদাহরণ। আশার কথা, শীঘ্রই বাহারাইনে অনুষ্ঠিতব্য এএফসি অনুর্ধ্ব-২৩ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে সুফিলকে নাম্বার নাইন হিসেবেই খেলাবেন বাংলাদেশ বস। তবে বুঝাই যায়, লিগে রাইটব্যাক আবার জাতীয় দলে উইঙ্গার— এভাবে স্থায়ী পজিশনহীন সুফিল সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিতে ব্যর্থ হবেন। অথচ তার গতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সুফিলের সাবেক কোচ মারুফুল হক প্র‍থম আলোকে দেওয়া সাক্ষৎকারে বলেছেন, ‘‘সুফিল সেকেন্ডে ৮.৯ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। ও এই শক্তিটা মূলত পেয়েছে প্রকৃতিগতভাবে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক কঠোর পরিশ্রম। তবে জন্মগতভাবে না পেলে কঠোর অনুশীলন করে গতি খুব বেশি বাড়ানো যায় না।’’

সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সুফিলের এ গুণ সঠিক পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে— যার নজির আমরা আগেও অনেক দেখেছি। সুফিলের পাশাপাশি স্থায়ী পজিশনহীনতায় ভূগছেন আরেক উদয়ীমান নক্ষত্র সাদ উদ্দিন। সাদ-সুফিলদের নিয়ে এখনই কোনো পরিকল্পনা না করলে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে আবারও— যেমনটা হয়েছিল হেমন্তের সাথে। এর দায়ভার কি আমাদের মহান বাফুফে নিতে পারবে? বা কারোর-ই কি এর দায়ভার নেওয়ার ক্ষমতা আছে?

এতো জটিল সমীকরণে যেতে না চাইলে সাদ-সুফিলদের নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। কী জানি, ফুটবলের বড় হর্তাকর্তাদের এ বিষয়ে ভাবার সময় আছে কিনা! সময় থাকলে কি আর ১৯২ র‍্যাঙ্কিং নিয়ে দেশের ফুটবলের পিঠ এভাবে দেওয়ালে ঠেকে যেত?

 

তথ্যসূত্র:

 

বোনাস:

 

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।