• অন্যান্য

আহত নেকড়েই যেন এখন তেজী বাঘ

পোস্টটি ১১১৯ বার পঠিত হয়েছে

তাদের সমর্থকেরা হয়তো এরকম দিন সবসময় দেখে না। তাই এমন দিন তাদের কাছে স্বপ্নময়ই হওয়ার কথা। তিন বছর আগেও দ্বিতীয় বিভাগে ধুঁকত দলটি। সেই তারাই কেমন করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে এফ এ কাপের সেমি-ফাইনালে! 

                     যদিও এই মৌসুমে তাদের সমর্থকেরা এরকম দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত । প্রিমিয়ার লীগের তথাকথিত ‘বিগ সিক্স’ এর বিপক্ষে তাদের পারফরমেন্স সেই কথাই বলে। সিটির সাথে হোমে 1-1 ড্র, ওল্ড ট্রাফোর্ডে গিয়ে 1-1 ড্র, এমিরেটস ভ্রমণেও 1-1 ড্র। ড্র করে স্টামফোর্ড ব্রীজেও। এখানেই শেষ নয়। চেলসিকে নিজেদের মাঠে 2-1 এ হারানো এবং ওয়েম্বলিতে শিরোপা দৌঁড়ে প্রাণ ফিরে পাওয়া টটেনহ্যামকে 3-1 গোলে ভূমিসাৎ করে তাদেরকে শিরোপা দৌঁড় থেকে ছিটকে দেওয়া। এই ধরনের পারফরমেন্সই এ মৌসুমেই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়া উলভসকে আর ‘মিনোজ’ উপাধিতে থাকতে দেয়নি।

                      ছয় মৌসুম আগে 2011-12 মৌসুমে তারা প্রিমিয়ার লীগ থেকে অবনমিত হয়। চার মৌসুম ধরে কতবার ম্যানেজার বদলেও কোনো সুবিধা করতে পারছিল না। ব্যর্থতায় পিষ্ট হয়ে অবশেষে ক্লাবটাকে বিক্রিই করে দেয় ক্লাবটির তৎকালীন মালিকপক্ষ। ক্লাবটিকে কিনে নেন চীনের ‘ফসুন ইন্টারন্যাশনাল’ গ্রুপ। 2017-18 তে ক্লাবটির চেয়ারম্যান হয় জেফ শি। তাদের কোচ হিসেবে পোর্তো থেকে নিয়ে আসে নুনো এসপিরিতো সান্তোকে। শুধু নুনো নামেই তিনি অধিক পরিচিত। এরপরই সব ভোজবাজির মতো পাল্টে যেতে লাগল। কোচ নুনোর প্রথম মৌসুমেই বাজিমাত। 46 ম্যাচে 99 পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্তরের চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার লীগে উত্তীর্ণ হয়। এরপরই তারা দলটিকে ঢেলে সাজায়।

                          খুব তারকাসম্ভারের দল তাদের না। সবচেয়ে তূখোড় ফুটবল সমর্থকেরও হয়তো দুজনের ব্যাপারেই জানাশোনা ছিল। রাউল হিমেনেজ, যাকে বেনফিকা থেকে ধারে আনা হয় এবং হোয়াও মুতিনহো, যাকে এ মৌসুমে পাঁচ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে মোনাকো থেকে কিনে আনে। এ দুজনের মধ্যেও ছিল ফুরিয়ে যাওয়ার আভাস। বাকিদের মধ্যে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে সাড়ে বার মিলিয়নে জোটা, পোর্তো থেকে দশ মিলিয়নে বলি, ফ্রি ট্রান্সফারে স্পোর্টিং লিসবন হতে রুই প্যাট্রিসিও এবং ধারে জনি ও ডেনডঙ্কারকে আনা হয়। মোট তাদের এ মৌসুমে খরচ ছিল 62.6 মিলিয়ন ইউরো। বর্তমান ট্রান্সফার মার্কেটে যেখানে গোলকিপারের দামও 80 মিলিয়ন ছোঁয় সেখানে মাত্র 62.6 মিলিয়নের দল গড়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। তারা করেছিল কিনা তাও কেউ জানে না। কিন্তু তারা তা-ই করে দেখাচ্ছে।

                            দলকে কোচ নুনো সাধারণত খেলান 3-5-2 ফর্মেশনে। গোলবারের নিচে প্যাট্রিসিও । রক্ষণ সামলান বেনেট , কোডি এবং বলি। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখেন ডেনডঙ্কার ও অভিজ্ঞ মুতিনহো । স্ট্রাইকারদের বল জোগানোর সৃষ্টিশীল দায়িত্ব মুতিনহোর। সমানতালে তাকে সাহায্য করে নেভেস। আর আধুনিক উইংব্যাকের ভূমিকায় থাকেন ডোহার্টি এবং জনি। গোলের জন্য কোচ নুনোর মূল সৈনিক হিমেনেজ যিনি প্রিমিয়ার লীগে ইতোমধ্যে বার গোল ও আট অ্যাসিস্ট দ্বারা দক্ষ একজন সৈনিক হিসেবেই নিজেকে প্রমাণ করছেন। তার স্ট্রাইক পার্টনার জোটাও কম যান না। প্রিমিয়ার লীগে তারও যে ছয় গোল ও সাত অ্যাসিস্ট । তবে শুধুমাত্র একটি ফর্মেশনই কোনো চৌকস কোচের পরিচায়ক নয়। তাই, প্রতিপক্ষ ও পরিস্থিতি বুঝে নুনোও ফর্মেশনের ক্ষেত্রে ভালোই নমনীয়তার পরিচয় দিতে পারেন। যখন দলকে আক্রমণাত্মকভাবে সাজাতে হয় তখন হিমেনেজকে ‘নাম্বার নাইন’ রেখে তার নিচে থাকেন জোটা ও কস্তা। দলে গতির প্রয়োজন হলে তার তূরুপের তাস হয় আদামা ট্রায়োর। কোনো একজনের উপর নির্ভরশীল বা ‘ওয়ান ম্যান শো’ র দল না হয়ে সকলেই নিজের জায়গা থেকে সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দেয়। একটি প্রকৃত দল যার মূল নায়ক হিসেবে কখনো একজনের নাম মুখে আসে না। হিমেনেজ , মুতিনহো , জোটা , ডোহার্টি কাউকেই এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় না। বাদ দেয়া যায় না কোচ নুনোর নামও ।

                            দলে পর্তুগীজ খেলোয়াড় আটজন। তাদের কোচও পর্তুগীজ । মৌসুমের শুরতে ‘পর্তুগীজ এক দল ’ সামাজিক মাধ্যমে এরকম নানা ট্রলের শিকার হয় তারা। কিন্তু, এই এক ভাষা, এক জাতিসত্তাই তাদেরকে যেন এক সুতোয় বেঁধেছে। সেই সুতোর বাঁধনকে ক্রমাগত মজবুত করেই এক পাহাড় ডিঙানোর অভিযানে নামে তারা। যাতে যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন তারা সাফল্যের আলো দেখতে পায়। নাহলে প্রিমিয়ার লীগে সপ্তম অর্থাৎ ‘বিগ সিক্স’ এর পরের স্থান এবং এফ এ কাপের সেমি-ফাইনালে যাওয়া । তা-ও পথে ইংল্যান্ডে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দুই ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও লিভারপুলকে নক-আউট করে। ‘বিগ সিক্স’ এর বিপক্ষে সম্ভাব্য *24 পয়েন্টের মধ্যে 10 পয়েন্ট অর্জন । একে আর অন্য কোনোভাবেই হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না।

                              শেষ পর্যন্ত এই মৌসুমে তারা কি করবে তা জানার জন্য এখনো আমাদের সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। এফ এ কাপের ফাইনালে হয়তো তাদের নাও উঠা হতে পারে। পয়েন্ট টেবিলের ষষ্ঠ স্থানের সাথে তাদঃর ব্যবধান তের পয়েন্টের হওয়ায় সপ্তম স্থানের উপরে তাদের হয়তো যাওয়া সম্ভব না । কিন্তু তাও তাদের হার-না-মানা মানসিকতা , ম্যাচে এগিয়ে গেলে ‘ মিনোজ’দের মতো অতিরক্ষণাত্মক না হয়ে আরেকটি গোলের জন্য ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া, মাঠের মধ্যে সর্বসাহসী ও সর্বগ্রাসী মনোভাব হয়তো ফুটবলপ্রেমীদের সেরিব্রামে তাদের এক দীর্ঘ স্থান দিয়ে দিবে। 

                       

 

*চব্বিশ মার্চ পর্যন্ত 

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।