• ক্রিকেট

আশার মাঝে হতাশা

পোস্টটি ৩৭৮২ বার পঠিত হয়েছে

128, 74 ,76 বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের এই তিনটি সংখ্যা চিনতে খুব সমস্যা হবার কথা নয় । সম্প্রতি শেষ হওয়া নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তামিম ইকবালের তিনটি ইনিংস । পাঠক আপনাকে পাঁচ সেকেন্ড সময় দিলাম। পারলে প্রথমটির সাথে পরের দুটির পার্থক্য খুঁজে বের করুন তো।

 

ঠিকই ধরেছেন। প্রথমটিতে তামিম তিন অঙ্ক ছুঁতে পেরেছেন। পরের দুটিতে পারেন নি। বাংলাদেশের এই নিউজিল্যান্ড সিরিজটি হয় সম্পূর্ণ হতাশাময়। সেই হতাশার মধ্যে আশা ছিলেন তামিম ইকবাল । আবার আশার মধ্যে হতাশাও যেন তিনি। যখনই ভক্তরা তামিম ইকবালকে দেখে পঞ্চাশ পেরোতে তখনই প্রতি বলে তারা একটি করে স্বপ্নের প্রাসাদ গড়ে তোলে। যার দেয়ালজুড়ে ভেসে থাকে প্রিয় ব্যাটসম্যানের এক হাতে ব্যাট ও অন্য হাতে হেলমেট নিয়ে দুই হাত আকাশে তুলে উদযাপনের ছবি। সেই প্রাসাদ মূহুর্তেই চুরমার হয়ে যায় যখন তামিম এরকম 76 রানে আউট হয়ে যান। বা সাকিব হায়াদ্রাবাদে 81 অথবা মিরপুরে 80 রানে আউট হন।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটলেও যে তিন নক্ষত্র এদেশের ক্রিকেটের আকাশকে সবচেয়ে বেশি আলোকিত করে ধ্রুবতারা হিসেবে অবস্থান করেন তাঁরা হলেন – তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান এবং মুশফিকুর রহিম । কিন্তু সেঞ্চুরি থেকে হাতছোঁয়া দূরত্বে ফিরে আসার প্রবণতা যেন এই তিনজনেরই সবচেয়ে বেশি । তামিম ইকবালের ওয়ানডে পরিসংখ্যান রান- 6307 , সেঞ্চুরি -11 , হাফসেঞ্চুরি -42! টেস্টে রান-4327 , সেঞ্চুরি – 9, হাফসেঞ্চুরি -27! হাফ সেঞ্চুরির সংখ্যা যদি আপনাকে বিস্মিত করে তাহলে আরো বিস্মিত হবেন এই জেনে যে ওয়ানডেতে 75-99 এর মধ্যে আউট হন 10 বার এবং টেস্টে 9 বার। 90 এর ঘরে ওয়ানডেতে তিনবার ও টেস্টে একবার আউট হন। প্রতিবারই 95 রানে। অথচ এর অর্ধেক পরিমাণও যদি তিনি তিন অঙ্কে নিয়ে যেতেন তখন তাঁর পরিসংখ্যান আরো অভিজাত হত। তখন তাঁর পরিসংখ্যানগুলোই জানান দিত যে তিনিই সেই ব্যাটসম্যান যে লর্ডসে 89 বলে সেঞ্চুরি করেন। যিনি একমাত্র বাংলাদেশের ক্রিকেটার হিসেবে উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের তালিকায় জায়গা করে নেন।

 

ঠিক একই বিষয় লক্ষ্য করা যায় সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহিমের ক্ষেত্রেও । সাকিব আল হাসানের ওয়ানডে ও টেস্টে রান যথাক্রমে 5482 ও 3807। সেঞ্চুরি 7টি ও 5টি। হাফসেঞ্চুরি 39! ও 24! এর মধ্যে ওয়ানডেতে 75-99 এর মধ্যে আউট হন 6 বার যার মধ্যে একবার আবার 97 রানে। টেস্টে সংখ্যাটি দাঁড়ায় 12 টি তে। যার মধ্যে দুইবার 96 , একবার 97 , একবার 96 এ অপরাজিত , একবার 89 ও একবার 87। অর্থাৎ , তাঁর কাছে স্পষ্ট সুযোগ ছিল বাংলাদেশের 4 হাজার রান সংগ্রাহক ব্যাটসম্যানদের সংখ্যাটা তিনে নিয়ে যাওয়ার । বলতে পারেন যে সে তাঁর বোলিং দিয়ে তা পুষিয়ে দেন। কিন্তু, এই কটা রান যে তাঁকে সর্বকালের সেরা অল-রাউন্ডারদের তালিকায় আরো উপরে যেতে দিল না তা কি পুষিয়ে নিতে পারবেন? 

 

বাংলাদেশের সবচেয়ে সাউন্ড টেকনিকের ব্যাটসম্যানের কথা বললে সবার আগেই আসে মুশফিকুর রহিমের নাম। অথচ তাঁর পরিসংখ্যানও খুব একটা ব্যাতিক্রম নয়। ওয়ানডেতে রান 5192 , সেঞ্চুরি 6 , হাফসেঞ্চুরি 30! যার মধ্যে 75-99 এ আউট হন 11 বার! যার একটি 98 , একটি 99 ও একটি 90। ওয়ানডেতে হয়তো ব্যাটিং পজিশনের দোহাই দিতে পারেন। কিন্ত টেস্ট? সেখানেও তিনি সদ্য 4000 রান পেরোলেন। সেঞ্চুরি 6 , হাফসেঞ্চুরি 19। 75-99 এর মধ্যে আউট হন 7 বার। যার একটি 95 , একটি 92 এবং একটি ইনিংস 93 রানের। অথচ সুযোগের সদ্ব্যবহারে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হয়তো হতেন এই পকেট রকেট। কিন্তু, যাঁর গলে ডাবল সেঞ্চুরি, হায়াদ্রাবাদ ও ওয়েলিংটনে সেঞ্চুরি আছে তাঁর কেন মিরপুরে, হোম অফ ক্রিকেটের 110 নম্বর সেঞ্চুরিটি প্রথম সেঞ্চুরি হবে? তাঁর কি উচিত ছিল না এই 110 কে 125 নিয়ে যাওয়ার । শুধু তিনিই কেন? তাঁদের তিনজনেরই কি উচিত ছিল না এই 110 কে 150 এ নিয়ে যাওয়া?

 

আমি তাঁদের কৃতিত্ব, সাধনা , পরিশ্রম কোনোটাকেই ছোট করছি না। তারা হয়তো নিজেদেরকে ইতোমধ্যেই দেশের ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানদের জায়গায় নিজেকে নিয়ে গেছেন। কিন্তু, ইতিহাস হয় প্রতি মূহুর্তেই। একসময়ে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তুলনীয় মমিনুল হক যে গতিতে এগোচ্ছেন তাতে ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁকে ছাড়াতে না পারলেও সেঞ্চুরির সংখ্যায় তাঁকে ছাপিয়ে যাবেন বলেই আমার বিশ্বাস ।যখন তাঁরা তিনজন তাঁদের ক্যারিয়ারের বেলাশেষে দেখবেন যে , এই মমিনুল বা অন্য কাউকে এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানের স্বীকৃতি দিচ্ছেন সমালোচকেরা তখন হয়তো টিভি বা পত্রিকার সামনে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঠোঁটের কোণে একটি বাঁকা হাসি ফুটে উঠবে উত্তরসূরির এমন কৃতিত্বে। কিন্তু, তাঁর সাথে কি একটা দীর্ঘশ্বাসও পড়বে না? 

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।