• ক্রিকেট

কালচারাল মারপ্যাঁচ

পোস্টটি ২৯৪৫ বার পঠিত হয়েছে

মুরুব্বী মানুষদের সাথে যখন কথা হয় তখন তারা স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে একটা কথা প্রায়ই বলেন যেটা বেশ কিছু সময়ের জন্য শিক্ষক পেশায় নিয়োজিত থাকা মানুষদের মুখেও শোনা যায়। আগে ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করলে সকলে ঐ ছাত্রকে জবাবদিহির মুখে ফেলত। কিন্তু এখন যুগ বদলের পরিক্রমায় সেই জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় শিক্ষকদের। ছাত্রদের খারাপ ফলাফলের দায় যেন শিক্ষকদেরই এখন।

               আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যদের বয়সের মাপকাঠিতে এখন মুরুব্বীই বলা চলে। কিন্তু আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে তারাও জানে । এ সত্যের প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি বাংলাদেশের হেড কোচ স্টিভ রোডসকে ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে। " তার সাথে আসলে আমাদের কালচার মিলে না। ভারত ম্যাচের আগে লম্বা ছুটিতে তিনি রাখলেন ঐচ্ছিক অনুশীলন । ফলে ক্রিকেটাররা অনুশীলন না করে ঘোরাঘুরি করে বেড়ায়। এভাবে হয়তো তাদের দেশের খেলোয়াড়েরা চলতে পারে। কিন্তু আমাদের তা হয় না। এটা তো আমাদের কালচারের সাথে যায় না।" স্টিভ রোডসকে ছাঁটাইয়ের পর বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের এরকম ভাষ্য শোনা যায়। তাকে ছাঁটাইয়ের বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে এটাকে তিনি অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ সেই একই কথা। শিষ্যের খারাপ ফলাফলের কোপটা গুরুর ঘাড়েই পড়ল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা বৈকি।

                  কিন্তু এ কথার মাধ্যমে তিনি যেন নিজের অজান্তেই আমাদের ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতির এক নির্মম সত্যই তুলে ধরলেন। উন্নতির তাড়নাটা নিজের থেকেই আসতে হয়। জয়ের ক্ষুধাটাও নিজেকেই তৈরি করতে হয়। সাফল্যের অংশীদার নিজেকেই হতে হয়। তাই সেই সাফল্যের পেছনের শত পরিশ্রমও নিজ তাগিদেই করতে হবে । জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখনো কোনো ক্লাস ২ এর অবাধ্য ছাত্র নয় যে তাদেরকে মেরে ধমকিয়ে পড়তে বসাতে হবে। সেটা করা সম্ভবও নয়। সবকিছুই বোঝার মতো মানসিক সক্ষমতা তাদের আছে। তাই নিজেকে এক ধাপ ওপরে নেয়া এবং শাণিত করার জন্য অনুশীলনটাও নিজেকে করতে হবে। কোচ অনুশীলন ঐচ্ছিক রাখুক আর অনৈচ্ছিক ।

                 এবং এটাই হয়তো দেখায় যে কেন আনামুল হক বিজয়ের ছয় বছরেও কোনো ফুটওয়ার্কে উন্নতি নেই। কেন সৌম্য সরকার চার বছরেও তার খেলায় নতুন কিছু যোগ করতে পারেননি। যার জন্য ১০-১৫ ইনিংসের আগে তার কাছ থেকে ভালো কোনো ইনিংস পাওয়া যায় না। কেন তাসকিন আহমেদ ২০১৫-২০১৬ সালের দিকে ভবিষ্যতের গতিদানবদের মধ্যে অন্যতম হবার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ চার বছর পর তাকে স্পেলের চার নম্বর ওভারে ১৩০ কিমি এর নিচে বল করতে দেখা যায়। কেনই বা মুস্তাফিজ উইকেট পেলেও তার এখন প্রায় ম্যাচেই সাতের কাছাকাছি ইকোনমি থাকে। অথবা কেনইবা সাব্বির রহমান যে কিনা তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ফিল্ডার হিসেবে স্বীকৃত তার ফিল্ডিংয়ের ইদানীং এমন দৈন্যদশা। নাসির হোসেনের কথা বাদই দিলাম । আর কেনইবা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যত নিয়ে ভক্তরা আশাবাদী হতে পারে না। এমনও নয় যে তাদের সামনে কোনো উদাহরণ নেই। সাকিব আল হাসান বিশ্বকাপের আগে যখন আইপিএলে ছিল তখন সে ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেয়ে বসে না থেকে তার গুরু সালাউদ্দিনকে ভারতে ডেকে নিয়ে নিজের মতো নিজেকে ঠিকই শাণিয়ে নেয়। আর তার ফল তো আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং বিশ্বকাপে সবাই আমরা দেখেছিই। আবার বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটার বলা হয় মুশফিকুর রহিমকে। ঐচ্ছিক অনৈচ্ছিক কোনো প্র্যাকটিসই নাকি তিনি মিস করেন না। তাই তার ব্যাটিংটা দেখলেও তাকে দলের আর সব ব্যাটসম্যানের চেয়ে 'আ লেভেল অ্যাবোভ' মনে হয়। এবং আমাদের বিশ্বকাপের যা কিছু পজিটিভ তা ওদেরকে ঘিরেই। এমনকি শ্রীলঙ্কা সিরিজেও একমাত্র পজিটিভ মুশফিকুর রহিম। তাই কোচকে বাদ দিয়ে খেলোয়াড়দের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে কোন কালচার তারা অনুসরণ করছেন তা তাদের সকলের ক্রিকেট মস্তিষ্ককেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে দেয়।

                    আর ধরে নিলাম যে তাদের চিন্তা-ভাবনাই ঠিক। দোষটা হয়তো কোচেরই। কিন্তু প্রশ্ন তখনও থেকে যায়। উপরে যাদের সমলোচনা করলাম তাদের সকলকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত কান্ডারী হিসেবে ভাবা হত। কিন্তু তাদের সকলেরই পতন ঘটে হাথুরুসিংহের আমলে। তো তাহলে আমাদের বোর্ড প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী আমাদের ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতির দায় অধিকাংশই হাথুরুসিংহের উপরেই বর্তায়। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী সেই হাথুরুসিংহেই নাকি বাংলাদেশের পরবর্তী কোচের পদের জন্য ফেভারিট । তাহলে আসলেই তারা কোন কালচার অনুসরণ করছেন? যদি হাথুরুসিংহেই পরবর্তী কোচ হয় তাহলে সংবাদমাধ্যম , ভক্ত , সমালোচক সবার কথার জবাব হয়তো তারা দিতে পারবেন। কিন্তু নিজেদের বিবেককে কি জবাব দিবেন তারা?

                   এতক্ষণ কালচারের কথা যখন ঘাঁটালাম তখন আরেকটু চালিয়ে যাই। এই কালচারটা বেশি দেখা যায় আমাদের সিনিয়র ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে । আর তাহল শতভাগ ফিট না হয়েও জোর করে ম্যাচ খেলতে চাওয়া । এই বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাহমুদুললাহ রিয়াদ কাঁধের চোটে বল করতে পারছিলেন না। বিশ্বকাপও পুরোটা খেলেন ইন্জুরী নিয়ে । আর তার প্রভাব পুরো বিশ্বকাপ এমনকি এই শ্রীলঙ্কা সিরিজেও দেখা যায়। মাশরাফিও হ্যামস্ট্রিংয়ের একটা চোট নিয়েই পুরো বিশ্বকাপ চালিয়ে যায়। আর ফলশ্রুতিতে তার পারফরমেন্সও ছিল যাচ্ছেতাই। যদি কোনো খেলোয়াড় শতভাগ ফিট না থাকে তাহলে তার জায়গায় শতভাগ ফিট কাউকেই খেলতে হবে। ম্যাচ জেতার এটাই নিয়ম । ২০০৭ পরবর্তী ভারতের কথা তো সবারই জানা। পাঠক আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন যে এদের বিকল্প কে? কাকে খেলাব? বিকল্প কেউ আছে কিনা সেটা জানা নেই। কিন্ত যদি কাউকে সুযোগ না দিয়ে এই ৩০-৪০ ভাগ ফিট কাউকেই দিনের পর দিন খেলানো হয় তাহলে বিকল্প জানার সুযোগও তো পাচ্ছি না আমরা। এবং এক প্রজন্ম ক্রিকেটার হয়তো এভাবেই হারিয়ে যাবে। আমি একদম সজ্ঞানে বলছি। তাদের আত্মনিবেদনকে আমি ছোট করছি না। কিন্তু রূঢ় একটি সত্য হল যে এই চোট নিয়ে খেলা আমাদের মত কয়েকজন ছোটখাটো ব্লগারদের কিছু আবেগী স্ট্যাটাস দিতেই যা সাহায্য করে। অন্য কোনো লাভে খুব একটা আসার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে না।

                 আমি খালি আমার মতামতটাই দিতে পারি। যেরকম পারেন এই লেখাটা যারা পড়ছেন তারা সবাই। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বোর্ডের । তাদেরই এখন বুঝতে হবে যে কোনটা ঠিক। কালচারের সাথে খাপ খায় না বলে কাউকে বাদ দিয়ে দেয়া। নাকি এমন কাউকে আনা যে আমাদের ক্রিকেটকে 'চ্যাম্পিয়ন কালচার'- এর সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দিতে পারবে।

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।