• ফুটবল

মার্সেলো'র যে গল্প আমাদের জানা দরকার!

পোস্টটি ১৯৯২ বার পঠিত হয়েছে

২০১৮ চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল; লিভারপুলের বিপক্ষে মাঠে নামার ঠিক আগ মুহুর্তে! আমার শ্বাস নিতে কস্ট হচ্ছিলো। চেস্টা করছিলাম, যেনো ঘাবড়ে না যাই। এমন অনুভূত হচ্ছিলো যেনো আমার বুকের মাঝে কিছু একটা আটকে আছে, প্রবল চাপ অনুভব করছিলাম। খেলোয়াড়দের মাঝে মাঝেই এমন স্নায়ুচাপে ভুগতে হয়; কিন্তু এটি কেবলই স্নায়ুচাপ ছিলোনা, বরং এর চেয়েও বেশিকিছু ছিলো, আলাদা ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো কেউ যেনো আমার শ্বাসরোধ করে আছে। সবকিছুর শুরু হয়েছিলো, ফাইনালের আগের রাত থেকেই। আমি খেতে পারছিলাম না, ঘুমাতে পারছিলাম না। আমার মাথায় কেবলই ম্যাচের কথা ঘুরপাক খাচ্ছিলো।

সামান্য পরিমাণ স্নায়ুচাপ ফুটবলে স্বাভাবিক। তুমি যদি একটি ফাইনাল ম্যাচের আগে স্নায়ুচাপে না ভুগো তবে তুমি আসলে মিথ্যা বলছো, তবে তুমি কোন বাস্তবসত্ত্বা নও। হ্যা এটাই সত্যি, ব্রাদার।

লিভারপুল ম্যাচের আগে এই চাপ আমার জন্যে তীব্র আকার ধারণ করে। অনেকেই ভাববে, আমি ইতিমধ্যে টানা ২ টা চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল জিতেছি, তাহলে এই প্রচন্ড চাপের রহস্য কোথায়!

বেশ। তবে তুমি যখন ইতিহাস সৃষ্টির একদম দ্বারপ্রান্তে, তুমি সেই ওজন খুব ভালোভাবেই অনুভব করবে। কিন্তু কিছু কারণে আমি খুব ভালোভাবেই সেই ভার অনুভব করতে পারছিলাম, আমি আমার ক্যারিয়ারে এতটা উদ্বীগ্ন আগে হইনি, আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না যে আমার সাথে কি ঘটতেছে! একবার ভেবে বসলাম, চিকিৎসকের পরামর্শ নেই; কিন্তু ভয় পেলাম যদি তিনি আমায় খেলা থেকে বিরত রাখার উপদেশ দেন!

কাউকে কিচ্ছু বলতে পারছিলাম না! কেনোনা আমাকে খেলতে হবে, আমাকে খেলতেই হবে! আমার আমাকে কিছু প্রমাণ করতে হবে!

ফাইনালের কয়েকদিন আগে একজন সাবেক মাদ্রিদ খেলোয়াড় টেলিভিশন চ্যানেলে আমায় নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন, যা আমার মাথায় চড়ে বসে। উনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, ফাইনাল নিয়ে উনার মন্তব্য কি! উনি উত্তরে বলেছিলেন - মার্সেলোর উচিত মোহাম্মদ সালাহ'র একটা পোস্টার কিনে দেওয়ালে সাপটে রাখা আর প্রতিরাতে প্রার্থনা করা!

মাদ্রিদে আমার ১২ বছর কাটানোর পর, সাথে ৩ টা চ্যাম্পিয়নস লীগ ট্রফি জয়ের পরেও তিনি ঠিক এইভাবে আমার প্রতি অসম্মানসূচক কথা বলেন। উনার এই মন্তব্য যেনো আমার সম্মানবোধ'কে মিশিয়ে দেয়। কিন্তু উনার এই বক্তব্যই আমায় প্রেরণা জোগায়, আমার ভিতরে জিদ ঢুকিয়ে দেয়!

আমি চেয়েছিলাম ইতিহাস গড়তে। আমি চেয়েছিলাম ব্রাজিলের ছোট ছোট বাচ্চারা আমায় এমনভাবে দেখুক, ঠিক যেমনভাবে আমি একজন রবার্তো কার্লোস'কে দেখতাম। আমি চেয়েছিলাম, ওরা ওদের চুলগুলোকে মার্সেলোর মত করে বড় করুক!

আমি আমার লকারে বসে, দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছিলাম, নিজের সাথেই লড়াই করছিলাম, নিজের সাথেই কথা বলছিলাম! "পৃথিবীতে কতজনই বা ফুটবল খেলে? তাদের মাঝে ক'জনই বা চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখে? মিলিয়ন! মিলিয়ন! মিলিয়ন! আর আমি সেই স্বপ্নের সামনে, যদিও এটিইই প্রথমবার নয়! নিজেকে শান্ত রাখো! জুতোজোড়ার ফিঁতে বেধে নাও, ব্রাদার!"

আমি জানতাম, কেবল আমি যদি মাঠে নামতে পারি তবে আর কিছুই আটকে থাকবেনা, সবকিছু আমার অনুকুলে চলে আসবে। ফুটবল মাঠে কোনকিছুই আমায় খেলা থেকে মনোযোগ সরাতে পারবেনা। হাজারো দর্শকের চিৎকার, উন্মাদনা; কিন্তু যখনই পা'য়ে বল আসবে, তখন সন যেনো শান্তু, নিরব!

শেষমেশ যখন আমি মাঠের ঘাস স্পর্শ করলাম, ঠিক তখনও আমি ভুগছিলাম, নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিলো। ভাবছিলাম, আমি বুঝি আজ এখানেই মারা যাবো! ফা* ইট! 

সম্ভবত আমার কথা তোমাদের কাছে পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছে, কিন্তু এটাই সত্যি। তোমাকে বুঝতে হবে, এই মুহুর্তের গুরুত্বটা আমার কাছে ঠিক কতখানি! আমার শৈশবকালের কথা ভাবা যাক.. রিয়াল মাদ্রিদ??  চ্যাম্পিয়নস লীগ?? এসবের স্বপ্ন দেখা মানে আবোলতাবোল ভাবা! এ যেনো রুপকথার মতো! বেকহাম, জিদান, রবার্তো কার্লোস, এরা আমার কাছে ব্যাটম্যানের মতো বাস্তব; যাদের বাস্তব জীবনে কখনো ছোঁয়া যায়না! তুমি কখনোই কল্পরাজ্যের সুপারহিরোদের সাথে হাত মিলাতে পারবেনা নিশ্চয়ই! তুমি ঠিক বুঝতে পারছো তো, কি বলছি আমি?

সুপারহিরোদের কেউ বাতাসে ভাসে, কেউ বা ঘাসে বল নিয়ে দৌড়ায়! এখনো কোটি শিশু কিশোরদের জন্যে ব্যাপারটা একই রয়ে গেছে!

একটা ঘটনা বলি। মাদ্রিদে আমার বাসার বাগানে এক কিশোর কাজ করতো। একদিন কার্লোস আমার বাসায় আসে, আমরা গল্প করছিলাম। এমন সময়, ছেলেটি রুমে প্রবেশ করে। সে সম্পুর্ণরুপে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, যেনো একটা ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে আছে! আমি বললাম, ইনি রবার্তো কার্লোস! সে বলতে লাগলো - না! এটি হতে পারেনা! ইনি রবার্তো হতে পারেনা! রবার্তো বললো - হ্যা, এটি আমিই, রবার্তো কার্লোস!

বিশ্বাস করুন, ছেলেটি রবার্তোর মাথা ছুয়ে বিশ্বাস করে যে হ্যা সে সত্যিকারের রবার্তোকেই দেখছে! শেষমেশ সে উচ্ছাস আর আবেগে চিৎকার করে বলে উঠে - রবার্তো! সত্যিই রবার্তো!

রিয়াল মাদ্রিদ, কিংবা চ্যাম্পিয়নস লীগ; আমার কাছে অনেকটা এমনই! আলাদা, সবকিছুর চাইতে আলাদা!

যেদিন আমি আমার প্রথম চ্যাম্পিয়নস লীগ ম্যাচ খেলি, আমার কানে সেই সুর বেজে উঠে, আমি নিজেকে বলেছিলাম - এটা কি ভিডিও গেমের মত? ক্যামেরা খুব কাছ থেকে তোমার মুখমণ্ডল ধারণ করবে, কিন্তু তুমি হাসতে পারবেনা!


শুনো! কয়েক বছর আগে আমি ব্রাজিলে গিয়েছিলাম, যাওয়ার সময় আমার বন্ধুদের জন্যে চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল ম্যাচের একটি বল নিয়ে গিয়েছিলাম। তারা বলটি নিয়ে খেলছিলো, কিন্তু যখনই তারা জানলো যে এটি চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনাল ম্যাচের বল, তারা খেলা থামিয়ে দিলো! তারা বলটিকে এমনভাবে দেখছিলো যেনো এটি চাঁদ থেকে আনা কোন শীলা পদার্থ!

ছোট ছোট বাচ্চারা যেনো বিশ্বাসই করতে চাচ্ছিলোনা! এমনকি তারা এটি স্পর্শ করতেও ইতস্তত বোধ করছিলো! যেনো এটি অনেক দামী, যেনো এটি অনেক পবিত্র!


তুমি এখন বুঝতে পারছো তো? রিও'র সেই ছোট্ট মার্সেলো থেকে আজ টানা তিন চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতার দ্বারপ্রান্তে!  চাপ! চাপ! অনেক চাপ! সত্যি বলতে ভয় নেই, আমি আমার রক্তে আর প্রতিটি হাড়ে এই চাপ অনুভব করছিলাম!

খেলা শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে যখন সেন্টারে বল'টি দেখলাম, মাঠের চারপাশের আলোয় আলোকিত সব, যেনো সবকিছু পাল্টে গেলো! পবিত্র গোলকটিকে অনুভব করতে পারছিলাম, আমি চাঁদের সেই শীলা পাথরটুকু দেখতে পারছিলাম! বুকে জমা সেই চাপা পাথর যেনো নিমিষেই হালকা হয়ে গেলো! শান্তি পাচ্ছিলাম! তখন আমার মস্তিষ্কে কেবল একটি জিনিসই ঘুড়তে লাগলো, ফুটবল!

ঐ ম্যাচটি সম্পর্কে খুব বেশি বলতে পারবোনা; কিন্তু দুইটা ঘটনা খুব করে স্মরণ আছে।

খেলার যখন ২০ মিনিট বাকী, আমরা ২-১ এ এগিয়ে, কর্নার নিতে গিয়ে নিজেরে বলেছিলাম - আমার দেওয়ালে সালাহ'র পোস্টার? হ্যা! থ্যাংকিউ ব্রাদার, সেদিনের মোটিভেশনের জন্যে।

খেলার আর ১০ মিনিট বাকী, আমরা ৩-১ এ এগিয়ে, তখন সত্যিই মনে হচ্ছিলো যে আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছি!

আমি খেলা শেষ হওয়ার আগেই কাঁদছিলাম, ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম! এমন সুখানুভূতি আগে কখনো পাইনি, যা আমাকে এতটা আবেগাপ্লুত করে!

একজন প্রফেশনাল খেলোয়াড় হিসেবে এটা আমাদেত দায়িত্ব নিজেকে অন্যের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলা! কিন্তু আমরা ঠিক সুপারহিরো নই। এটা বুঝাতেই আপনাদের এই গল্প শুনালাম। এটাই বাস্তবতা। আমরা মানুষ। আমরাও ঘাবড়ে যাই, আমরাও উদ্বীগ্ন হই, আমরাও অধৈর্য্য হই!

৫ বছরে ৪ টি চ্যাম্পিয়নস লীগ; প্রতিবারের গল্পগুলোই অনেক কঠিন! তোমরা আমাদের দেখো ট্রফি হাতে, হাসিতে, উচ্ছাসে, কিন্তু এর পিছনের গল্পগুলো অনেকেই জানেনা।

প্রতিটা ফাইনালের কথা ভাবলেই আমার মাথায় যেনো কিছু সুন্দর চলচ্চিত্র ঘুড়তে থাকে! শুরু থেকে শেষ, সকল গল্প!

২০১৭ সালের ফাইনাল, প্রতিপক্ষ জুভেন্টাস। গল্পটা হলো - টেবিলের চারপাশে সবাই বসে; আমি, কাসেমিরো, দানিলো, ক্রিস্টিয়ানো। পিনপতন নিরবতা। কেউ কিচ্ছুটি বলছেনা। সবাই কেবল তাদের খাবারের দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছে। শেষমেষ, ক্রিশ্চিয়ানো বলে উঠলো, কারো কিছু বলার আছে.. আমরা বলে উঠলাম, হ্যা আছে.. ক্রিশ্চিয়ানো জিজ্ঞাসা করলো, তোমরাও কি আমার মতো ক্ষুধার বদলে কি চাপ অনুভব করছো.. সবাই উত্তরে বললো, হ্যা ঠিক তাই...

কেউ এটি নিজে থেকে বলতে চায়নি, কিন্তু যেখানে স্বয়ং রোনালদো চাপের কথা স্বীকার করলো, তখন আর কেউ লুকোয়নি। ক্রিশ্চিয়ানো একজন বরফ শীতল মানুষ! সে অব্দি ফাইনালের চাপ অনুভব করছে!?

ক্রিশ্চিয়ানো বললো, শুরুতে এটি কঠিন হবে, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আমরা সুন্দর সহজাতভাবে ম্যাচ জিতে নিবো। আমি কক্ষনো এটি ভুলবোনা! সে যেনো ভবিষ্যৎ বানী করে গিয়েছিলো। যা আমাদের সকল চাপকে প্রশমিত করে দেয়!

এরপর রোনালদো বলে উঠে, “Gonna take it down, man. Gonna take it down.” 

আমি রোনালদোর সেই চেহারা কখনো ভুলবোনা, মস্তিষ্কে গেঁথে আছে সেই মুহুর্ত, যখন রোনালদো বলছিলো - “Gonna take it down, man. Gonna take it down.” 

এগুলো সুন্দর! গল্পগুলো যেনো সব সৌন্দর্য কে হার মানায়! যে গল্প গুলো একটা সময় নাতি-নাতনীদের রাত জেগে শুনাবো।

যখন আমি তাদের রোনালদো কিংবা মেসি'র গল্প করবো; তারা হয়তো বলবে যে আমি পাগল হয়ে গেছি! তারা হয়তো বলবে - সিজনে ৫০ গোল?? তুমি মিথ্যা বলছো দাদু! তুমি পাগল হয়ে গেছো! তুমি বার্ধক্যজনিত প্রলাপ করছো! তোমার ডাক্তার দেখানো দরকার, দাদু!

২০১৬ সালের ফাইনাল, প্রতিপক্ষ এটলেটিকো! গ্রীজি বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে, আমি ওকে মার্ক করছি। ও আমাকে কাটিয়ে বল নিয়ে যায়, ঠিক সেই সময় আমি গ্যালারি থেকে একটি চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই, কাঁদোকাঁদো কন্ঠে!

সাধারণত ম্যাচ চলাকালীন অন্যকিছুতে নজর দেওয়ার সুযোগ নেই, ভক্তদের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। এতে করে মাঠে উদ্বীগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, ঠান্ডা মাথায় খেলায় মনোযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু মিলানের মাঠে সেদিন খেলোয়াড়দের পরিবারের সদস্যরা বেঞ্চের একদম পাশেই বসে ছিলো, মাঠের খুব কাছে।

আমার কানে যেই কন্ঠটি ভেসে আসে, তা আর কারো নয়, আমার ছেলে এঞ্জো'র! "দৌড়াও বাবা, দৌড়াও!" ওর সেই কন্ঠ যেনো আমায় শক্তি যোগায়!

ম্যাচ যখন পেনাল্টিতে গড়ায়, আমার একট মুহুর্তের কথাই মনে পড়ে, লুকাস বল হাতে নিয়ে এক আঙ্গুলের উপরে ঘুড়াচ্ছে, ভাবখানা এমন যে আমরা যেনো শিশুপার্কে ফুটবল খেলছি! শান্তশিষ্ট এই ছেলেটা বল পায়ে অনেক কিছুই করেছে, কিন্তু আজ যদি যে পেনাল্টি মিস করে; এই চিন্তাই মাথায় ঘুড়পাক খাচ্ছিলো! তারপর আমি দেখলাম, লুকাস ঠান্ডা মাথায় স্কোর করে ফেললো!

আমি দেখলাম, সবাই সবাইকে শক্ত করে জড়িয়ে আছে। কাসেমিরো হাঁটুতে ভর করে বসে প্রার্থনা করছে। পেপে ছোট বাচ্চা'র মতো কাঁদছে!

আমি ক্রিশ্চিয়ানো কে বললাম - জুয়ানফ্রান এবার মিস করবে, তুমি আমাদের জন্যে বাকী কাজটা করে আনো ব্রাদার! আমি দেখলাম, জুয়ানফ্রান মিস করলো, ক্রিশ্চিয়ানো ম্যাচটা জিতিয়ে দিলো!

আমি লক্ষ্য করলাম আমি দৌড়াচ্ছি, যেনো ২০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায়! দৌড়িয়ে আমার স্ত্রী সন্তানের কাছে গেলাম, ওদের জড়িয়ে ধরলাম!

আমি এতটাই সুখী ছিলাম যেনো খুশিতে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম!

২০১৪ সালের ফাইনাল, প্রতিপক্ষ এটলেটিকো! আমি একাদশে নেই। আমি বারবার আমার দাদা'র একটি কথা স্মরণ করতে লাগলাম, তিনি বলতেন - এই ফুটবল খেলার জন্যে আমি সব ছাড়তে রাজি, আমার চুল, আমার দাড়ি, আমার গোঁফ!

সেকেন্ড হাফে আমি ওয়ার্ম আপ করতে লাগলাম; আমি কেবল জানতাম আমার মাঠে নামতেই হবে, কোচ কিছু জানানোর আগেই আমি ওয়ার্ম আপ করতে লাগলাম!

শেষমেশ ট্রেইনার আমায় বললো, ওয়ার্ম আপ করে নিতে! আমি বললাম, ইতিমধ্যে আমার শরীর দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, আমি প্রস্তুত!

আমি জানিনা, ঐ ম্যাচে আমি কেমন খেলেছিলাম, হয়তো ভালো, হয়তো খারাপ! শুধু জানি, আমি যখন মাঠে নেমেছিলাম, নিজের সবটুকু দিয়ে খেলেছিলাম!

এই ফাইনালের কথা বললেই, সকলের মাথায় যা প্রথমে আসে তা হলো ৯২:৪৮! সেই হেড! সার্জিও রামোস! আমাদের দলনেতা!

আমরা প্রায় মৃতপ্রায়, হারতে বসেছি, অতঃপর সার্জিও আমাদের দেহে প্রাণ সঞ্চার করে!

কিন্তু এটির চেয়েও আমার মাথায় যেই গল্পটা ঘুড়ে তা হলো, ম্যাচ জেতার পরের ড্রেসিংরুমের গল্প! আমাদের কিটম্যান ম্যানোলিন আমায় বলছিলো - "মার্সেলো আমি টানেলে নিথর দাঁড়িয়ে আছি, তখন খেলার শেষ মিনিট, এটলেটিকো'র একজন কিটম্যান ওদের চ্যাম্পিয়ন টি শার্ট নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে! আমি যেনো নিজের জীবনকে হারাত্র বসেছিলাম, সেই সময় রামোস আমাকে নতুন করে বাঁচার উৎস খুঁজে দেয়!"

সে বলছিলো, আর কাঁদছিলো!

আমি ওকে বললাম, "এখন আমি শান্তিতে মরতেও পারবো!"

এই গল্পগুলো কখনো ভোলার নয়! ট্রফি ক্যাবিনেটে চলে যায়, স্মৃতিগুলো আজীবন হৃদয়ে গেঁথে যায়!

৫ বছরে ৪ টি চ্যাম্পিয়নস লীগ; প্রতিবারের গল্পগুলোই অনেক কঠিন! তোমরা আমাদের দেখো ট্রফি হাতে, হাসিতে, উচ্ছাসে, কিন্তু এর পিছনের গল্পগুলো অনেকেই জানেনা! তোমরা ফলাফল দেখো তোমরা আমাদের উপরে বয়ে যাওয়া চাপ গুলো দেখোনা!

রিয়াল মাদ্রিদে "ঠিকাছে, আজ নয়তো কাল" বলে কিছু নেই! আছে কেবল "আজই!"

আমি যেনো সেই একই আবেগ অনুভব করছি ঠিক যেমনটা হতো যখন আমি ছোট ছিলাম! ১৮ বছর বয়সে আমি যখন স্পেনে আসি, আমি জানতাম'ও না যে আমি মাদ্রিদের হয়ে সাইন করাতে যাচ্ছি!

রিয়াল মাদ্রিদ যেনো একটা রুপকথার গল্পের মতো, মনে আছে? আমি প্লেনে চড়েছি, তখনো বলতে পারিনি আমি মাদ্রিদের হয়ে খেলতে যাচ্ছি! এগুলো আমার কাছে আবোলতাবোল শোনায়, স্বপ্নের মতো দেখায়!

আমি মাদ্রিদ অফিসে বসে কফি খাচ্ছিলাম, কেউ এখন এসে বললো - মার্সেলো, তুমি বরং গিয়ে একটা জার্সি নিয়ে নাও! আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, জার্সি কেনো!

লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বললো - কেনো বলতে কি বুঝাইলা তুমি? প্রেজেন্টেশনের জন্যে ছেলে, বার্নাব্যু তে তোমার প্রেজেন্টেশনের জন্যে!

কিইইইইইইইইইইইইইইইইই!

তারা আমার সামনে যখন কন্ট্রাক্ট পেপার নিয়ে আসলো, আমি সর্বপ্রথম আমার নামের দিকে তাকালাম দেখলাম, সত্যিই! এটি আর অন্য কিছু নয়! "মার্সেলো ভিয়েরা দা সিলভা জুনিয়র"

আমি যদি আমার রক্ত দিয়ে আমার নামটা লিখতে পারতাম, ব্রাদার!

আমার মনে আছে, এটি ছিলো ৫ বছরের চুক্তি; আমি পন করলাম, আমার এটিকে ১০ বছরে নিয়ে যেতেই হবে! যাই হোক, এখন মাদ্রিদের সাথে আমার সম্পর্কের ১৩ বছর হতে চললো! কিন্তু এখনও আমার মাঝে রিও'র সেই ছোট্ট মার্সেলো'কে দেখতে পাই!

আমি কোথাও যাচ্ছিনা, যেতে চাইনা! সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে মাদ্রিদের জার্সি গায়ে থাকা আমার কাছে রেকর্ডের চাইতেও অনেক বেশি সম্মানের! এটা অনেকটা রুপকথার মতো! এটা আমার অস্তিত্ব, আমার উন্মাদনা!

আমি আশা করি, আমার গল্প শোনার পর তুমি বুঝবে, মাদ্রিদ আমার কাছে কি, মাদ্রিদের স্থান আমার হৃদয়ের কোথায়!

(দা প্লেয়ার্স ট্রিবিউন - এ মার্সেলো'র লেখা "Brothers, I Have To Tell Some Story To You" হতে অনুদিত)  

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।