• ফুটবল

একটি গোল, একটি হ্যাট্রিক, একটি কোমায় থাকা কিশোরের গল্প এবং একজন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

পোস্টটি ৩৩৯২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

c62e8ae3bcdd6e53e9445bde158c7d33লোকে বলে ফুটবল সৌন্দর্যের খেলা। আবার এটা গোলের খেলাও বটে!জিততে হলে আপনাকে গোল করতেই হবে।আচ্ছা একটা গোল খুব বেশি হলে কী কী করতে পারে? একটা ম্যাচে জয়, হয়তো কোনো রেকর্ড কিংবা একটা ট্রফি—এই তো। সে ট্রফি হতে পারে কোনো লিগের, কোনো মহাদেশীয় শিরোপা, এমনকি হয়তো প্রতিটি ফুটবলারের স্বপ্নের সুন্দরী মানে বিশ্বকাপও। কিন্তু এ সবকিছুর মূল্য কি একটা জীবনের চেয়ে বেশি? একটা গোল কি পারে কোনো জীবন বাঁচাতে?

পারে, যদি সেটি হয় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোল! সিনেমার গল্প নয়, এ একেবারে জীবন থেকে নেওয়া।আসুন সে-সম্পর্কে একদম ঘটনা প্রবাহের শুরু থেকেই জেনে নেওয়া যাক।

 

 

১৯ নভেম্বর ২০১৩,মঙ্গলবার।আপনার-আমার কাছে দিনটি সাধারণ চারটি দিনের মত শুরু হলেও পর্তুগিজ ও সুইডিশদের দিনের শুরুটা একরাশ উৎকন্ঠার মধ্যদিয়ে।কারন আজ যে পর্তুগাল বনাম সুইডেন প্লে-অফের ম্যাচ।সুইডেনকে জিততে হবে কমপক্ষে ২-১ গোলের ব্যবধানে আর পর্তুগালের ড্র হলেই যথেষ্ট।প্রথমার্ধ শেষে স্কোরলাইন ০-০।২য় অর্ধের খেলা শুরুর ৫ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ ম্যাচের বয়স যখন ৫০ মিনিট তখনই রোনালদোর গোল।সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো। ভাস্কো ডা গামার উত্তরসূরীদের জাহাজ ব্রাজিলের দিকে চলছিলো বেশ।মধ্যে একবার রোনালদোর পায়ে ক্রাম্প করলো একবার শিকার হলেন বাজে ফাউলের। তবুও স্বপ্ন জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছিলো ব্রাজিল পানে।কিন্তু হঠাৎ ঝড়!না সামুদ্রিক ঝড় নয়, এ ঝড়ের নাম ইব্রাহিমোভিচ।মাত্র চার মিনিটের ঝড়ে টালমাটালে পর্তুগিজ শিবির।৬৮ ও ৭২ মিনিটে দুইগোল করে ইব্রা মৃতপ্রায় সুইডিশ স্বপ্নের জীবনদান করেই ফেলেছিলেন প্রায়।যখন পালগুলো ছিড়ে যেতে লাগলো,বড্ড চেনা পথটাও খুব অচেনা হতে শুরু করলো, সহযোগী নাবিকরা প্রায় হালই ছেড়ে দিলেন, পায়ের ক্রাম্পটা মাথাচারা দিয়ে উঠে শরীরটাও বিদ্রোহ করে বসলো।ঠিক তখনই প্রবল বিক্রমে রুখে দাঁড়ালেন পোড় খাওয়া পর্তুগিজ কাপ্তান।ম্যাচের বয়স ৭৬ মিনিট পেরিয়ে ৭৭ এ পা দিয়েছে। ধারাভাষ্যকারের কন্ঠে শোনা গেলো, " It’s Ronaldo,who can brake again.Can he kill the Swedish dream?He has done surely...." স্কোরলাইন ২-২।ঠিক তার দুই মিনিট পরের ঘটনা।এবার ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে শোনা গেলো, "It's a chance for Ronaldo.And Ronaldo done it again.Hat-trick........." ধারাভাষ্যকারের মুখ থেকে যখন এই শব্দগুলো বের হচ্ছিল ঠিক তখনই পর্তুগিজ স্বপ্ন জাহাজ ব্রাজিলে নোঙ্গর করে ফেলছিলো আর অন্যদিকে আলৌকিকভাবে ঘটনা প্রবাহে জড়িয়ে গেলো এক কিশোর।সে কিশোরটি ডেভিড পলেকজিক। পোলিশ এই কিশোরটি সাইকেল চালাতে গিয়ে আঘাত পেয়েছিল গাড়ির ধাক্কায়। সেই দুর্ঘটনা তাকে ঠেলে দিল কোমায়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসকের কাছে একটাই উপায় ছিল।সেটা শব্দ থেরাপি। পছন্দের শব্দগুলো নিয়মিত শুনিয়ে যেতে হবে কানের কাছে, সে শব্দ শুনে যদি চেতনা ফিরে পলেকজিকের।

রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থক ১৪ বছরের পলেকজিক ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো অন্তঃপ্রাণ। বাবা-মা তাই ভাবলেন ছেলের কানের কাছে রোনালদোর ম্যাচের ধারাভাষ্য বাজালে কেমন হয়।বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে পর্তুগাল-সুইডেন প্লে-অফের দ্বিতীয় লেগ চলছিল। হাসপাতালের বিছানায় তখনো কোমায় পলেকজিক। রেডিওটা এনে রাখা হলো কানের কাছে। একটা করে গোল করে যান রোনালদো, ধারাভাষ্যকারের চিৎকার বাজে পলেকজিকের কানে। নিজের তৃতীয় গোলটা করে ওদিকে রোনালদো নিশ্চিত করলেন পর্তুগালের বিশ্বকাপ খেলা, এদিকে চোখ মেলে তাকাল পলেকজিক। শেষ গোলটা কোমা থেকে জাগিয়ে তুলেছে কিশোর পলেকজিককে!

পোলিশ দৈনিক ফাকট-এ অবিশ্বাস্য এ ঘটনা ছাপা হওয়ার পর তা পৌঁছায় রোনালদোর কাছেও। আবেগাপ্লুত হয়ে যান তৎকালীন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।পরবর্তীতে ২০১৪ সালে, পলেকজিক এবং তার বাবা-মাকে আমন্ত্রণ জানান সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে এসে রিয়াল মাদ্রিদ-ডর্টমুন্ড চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচটা দেখার জন্য। পোলিশ কিশোরের কাছে এ তো স্বপ্নের চেয়েও বেশি!

স্বচক্ষে রোনালদোর খেলা দেখাই হলো না শুধু, পলেকজিক পেল এর চেয়েও বড় কিছু। ম্যাচের পর তাকে ডেকে জড়িয়ে ধরেছেন রোনালদো, উপহার দিয়েছেন নিজের স্বাক্ষর করা জার্সি। রোনালদোর এমন মহানুভবতা আর ছেলে পলেকজিকের উচ্ছ্বাস কাঁদিয়েছে তার মা ইসাবেলাকেও, ‘কতবার সে (পলেকজিক) আমাদের বলেছে ওকে মাদ্রিদ নিয়ে যেতে। আমরা পারিনি। যখন রোনালদোর কাছ থেকে আমন্ত্রণ এল সে খুশিতে কান্না থামাতে পারছিল না। বিশ্বাস করতে পারছিল না এটা সত্যি। রোনালদো, আপনার হূদয় সত্যিই বিশাল। আমরা আপনার কাছে ঋণী।’

 

 

 

আজ সেই গোলের,সেই হ্যাট্রিকের ৬ বছর পূরন হলো।মাঝেমধ্যে হঠাৎ করেই যখন রোনালদোর এই গোলটার কথা মাথায় আসে তখন একটা কথাই জানতে ইচ্ছে হয়,আচ্ছা ক্রিস্টিয়ানো গোল করে জীবনেতো কত পুরস্কারই পেয়েছেন কিন্তু এর চেয়ে বড় কিছু কি আর পেয়েছেন কখনো?