• অন্যান্য

বৃহস্পতিবার রাত, শুক্রবারের বৃষ্টি ও একটু ব্যাট করতে চাই

পোস্টটি ৮৯১ বার পঠিত হয়েছে

Captureবৃহস্পতিবার রাত। পরদিন স্কুল নেই, শুক্রবার। ঘুমোতে তাই ইচ্ছে করছে না একদম। চারপাশে নিরবতা নেমে আসে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে শোনা যায় জোনাকির ডাক। আরাফের কল্পনায় ভেসে ওঠে সকালটার দৃশ্য।

একটা মাঠ। লম্বা অনেক, দু ধারে ছোট ছোট গর্ত। বল বারবার তাই আনতে হয় পানি থেকে। তাতে এতটুকুও ক্লান্তি নেই কারো। আসিফ, মুহতাসিম, আল আমিন ভাই, আরও অনেকে। ব্যাট আর বল, সকাল থেকে বিকেল অব্দি। স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই, মায়ের বারণও। এসব ভাবতে ভাবতেই চোখ লেগে আসে, ঘুমও ধরে আষ্ট্রেপিষ্ঠে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও আর টিকে থাকা যায় না, অনিচ্ছায় ঘুম চলে আসে।

সে স্বপ্নে হারায়। দু চোখ বন্ধ করে একটা গ্লাভস পেয়েছে আরাফ, জাদুর। যেটা পরলে হাঁকানো যায় চার, বড় বড় ছক্কা। একটা সুতা কেটে এনে ট্রাউজারে সেলাই করলে বল হাতেও হওয়া যায় সফল। যে বলে উইকেট চায় মনে মনে, সে বলেই স্টাম্প যায় উপড়ে। একটার পর একটা।

চারদিকে সুনাম ছড়ায়। আরাফ একদিন জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যায়। বিশ্বের সবচেয়ে নামী ক্রিকেটারও হয়। এরপর হুট করে তার ঘুম ভাঙে। বাইরে তাকিয়ে দেখে এখনো মাঝরাত্রি। চারপাশের সব অন্ধকার। জানালার ফাঁক গলে একটু একটু চাঁদের আলো এসে মশারি ভেদ করে পড়ছে তার গায়ে। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার যায় ঘুমিয়ে।

                                                                                     ***

শুক্রবার ভোর। চারপাশে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। ঘুম ভেঙে যায় আরাফের। মা পাশ থেকে উঠে যান, ফজরের নামাজ পড়তে। সে শুয়ে থাকে। খানিক বাদে আবার ঘুম আসে। সে ঘুমিয়ে পড়ে।

এরপর ঝিঁড়িঝিঁড়ি বৃষ্টি নেমে আসে আকাশ থেকে। টিনের চালে টুপটুপ শব্দ হয়। ঘুম ভাঙে তার। তাড়াহুড়ো করে তাকায় ঘড়িতে, সকাল আটটা। বাইরে বেরিয়ে আরও হতাশা।

বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিয়েছে সব, নিশ্চয়ই মাঠটাও। মন খারাপ হয় আরাফের। বৃষ্টিটাকে বকে দিতে ইচ্ছে করে। এক লাফে বাইরে বেরিয়ে খুব করে কাঁদতেও। উঠোনে নেমে অন্তত বৃষ্টিতে ভিজে একটু দুঃখ তো ভোলাই যায়।

অথচ এর কিছুই হয় না। মা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন পেছনে। 'বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর আসবে, তখন কে দেখবে শুনি!' বলে বকে দেন। আরাফের তাতে মন মানে না। মা চলে যান, নিজের ঘরে শুয়ে থাকেন।

আরাফ মন খারাপ করে পাঁয়চারি করতে থাকে তাদের টিনের ঘরটাতে। বৃষ্টি পড়ে, টুপটুপ শব্দ হয়, তাতে তার বাড়ে বিরক্তি। দরজাটা বন্ধ, হঠাৎ জানালার ধারে কারো উপস্থিতির টের পায় সে। কেউ একজন এসেছে, ফিসফিস করে তাকে ডাকছে।

আরাফ বুঝতে সময় নেয় খানিকটা। এরপর কান পাতে। এ তো পরিচিত গলা, সাকিবের! সে ভালোভাবে কান পাতে। শুনতে পায়, 'খেলতে যাবি?'

চিন্তায় পড়ে যায় আরাফ। বলে, 'তুই যা, আমি আসছি'। ধীরে ধীরে ঘরের দরজা খুলে। বাইরে থেকে আটকে দেয় দরজাটা। এরপর দৌড়, উসাইন বোল্ট কি এতো গতিতে দৌড়েছেন কখনো! একটু দূরে গিয়ে চিৎকার দেয় আরাফ, আনন্দের। যেখানে মা নেই, কোনো বাধাও। যার বাধ টানার ক্ষমতা নেই কারো, প্রচণ্ড মার খাওয়ার ভয়েরও।

                                                                                    ***

বিশাল এক বিল চোখের সামনে দেখে আরাফের। অনেক বড়। অগ্রহায়ন মাসের ধান অর্ধেকটায়, বাকিটা খালি। অবিরত পড়তে থাকা বৃষ্টিটা ততক্ষণে ভিজিয়ে দিয়েছে তার পুরো শরীরটা। এদিক-ওদিক তাকায় সে। ঝাঁপসা ঝাঁপসা চোখে ছোট ছোট কয়েকটা মানুষ দেখতে পায়। দৌড়ে যায় সেখানটায়।

একটা পাঁচ নম্বরের ডিয়ার বল। সাড়ে পাঁচশ টাকা দাম। এত টাকা নেই তাদের কারো। বলটা বড় ভাইদের। তারা এখন ঘুমে, না বলেই নিয়ে আসা। ধরা খেলে কপালে লেখা আছে চরম ভর্ৎসনা। তাতে তাদের থোড়াই কেয়ার! আজ তো কাঁদা মাঠে ফুটবলের দিন।

দুদলে কম করে চল্লিশজন। তাদের বিশাল বড় বাড়ি। প্রায় হাজারখানেক মানুষের বাস আশেপাশে। খেলার সাথীও তাই অনেক। তাদের ফুটবল শুরু হয়। ভাগ করা হয় দুদলে।

কাউকেই চেনার উপায় নেই যদিও। দুই রঙের জার্সি নেই, চেনার অন্য কোনো রাস্তাও। খেলা শুরু হতেই আর ঠিক নেই কিছুই। ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার এর তো কোনো বালাই নেই-ই, গোলরক্ষকও নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না দুই ধারে এক হাত লাঠি কুপে দিয়ে বানানো গোলপোস্টের মাঝে।

তারা সব একজোট হয়। দলা পাকায়। পানি আর কাঁদার ভেতর বলটাই হয়ে যায় অদৃশ্য। কিন্তু তাদের বল নিয়ে কাড়াকাড়ি শেষ হয় না। এদিকে লাথি দেয়, ওদিকেও। বলটা কোথায় আছে না জেনেও। বলের কি দরকার! এর মাঝে তারা একে অপরকে ঝাঁপটে ধরে। পানিতে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে একে অপরকে।

বলটা এক সময় খুঁজে পায় তারা। গোল করে, গোল খায়। গোনার কোনো লোক নেই। এক, দুই, দশ গোল; আসলে যে জয় কিংবা পরাজয়ই নেই!

                                                                                      ***

আরাফদের কাছে ক্রিকেট মানে শট বাউন্ডারি। আর একটু ফিল্ডিং, বড় ভাইদের কথায় এদিক-ওদিক থেকে বল কুড়ানো। সবার আগে মাঠে আসে, ব্যাট তখনো আসে না। খানিক পর একজন, দুইজন করে মাঠে আসে। ব্যাট আর বলও উপস্থিত হয় ততক্ষণে।

আগ্রহ ভরে তাকিয়ে থাকে আরাফ। ব্যাটটা যদি একটু হাতে তোলা যায়; হয় না। এইজন, সেইজন করে একটু যদি উঠেও, পরক্ষণেই অন্য কেউ তুলে নেয় তা হাতে। আরাফের ভীষণ মন খারাপ হয় তাতে।

এরপর খেলা শুরু হয় আবার। টস হয়, কড়ই পাতার 'ভাও' আর 'উল্টো'। মাঝেমধ্যে কারো কাছে কয়েন থাকলে ভালো, না থাকলেই বা কী? পাতার কি অভাব নাকি! কখনো আগে ব্যাট করে আরাফের দল, কখনো পরে। তাতে তার ভাগ্যের খুব একটা হেড়ফের হয় না।

আট কিংবা বারো ওভার খেলা হয়। একজন-একজন করে আউট হয়। তাতে আরাফের পালাটা আর আসে না। এমনও হয়-এক ওভারে উইকেট হাতে আছে দুইটা। সে তখন মনে মনে প্রার্থনা করে নিজ দলের ব্যাটসম্যানের আউট হওয়ার। তার প্রার্থনা হয় কবুলও। কিন্তু একেবারে শেষ বলটায়। একটা বলও আর খেলা হয় না। আত্মচিৎকারে আরাফ বলে, 'একটু ব্যাট করতে চাই'।

                                                                                        ***
তারপর একদিন আরাফ আবিষ্কার করে, এখনো বৃষ্টি নামে। টিনের ঘরে হয় টুপুর টুপুর শব্দও। ঘরের কাঠগুলোতে একটু ঘুণে ধরে গেছে এই যা। বাকি সব ঠিকঠাক। তবুও কিছু একটা গড়মিল।

কী? এখনো বৃষ্টি নামলে কাঁদা হয়। তবে শুক্রবার এখন আর তার ছুটি না। কাঁদা মাটিই এখন আর সে খুঁজে পায় না শহরের উঁচু উঁচু দালান আর পাকা রাস্তার মাঝে। খুব ইচ্ছে করলেও তাই কাঁদা মাঠে আর ফুটবল খেলা যায় না। মায়ের বারণ না থাকলেও এখন আর ভেজা হয় না বৃষ্টিতে।
 
আরাফ আরও আবিষ্কার করে, এখন তার আশেপাশে অসংখ্য ব্যাট। এখন আর বল কুড়াতে হয় না তাকে, নামলেই সবার আগে পাওয়া যায় ব্যাটিংও। তবুও এখন আর খেলার সময় হয়ে ওঠে না।
'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।