• ফুটবল

লিওনেল, আমি ক্রিস্টিয়ানো বলছি

পোস্টটি ২৩১২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

মেসি, কী এক অস্থির সময় কাটাচ্ছি আমরা সবাই; তুমি তো জানো। তোমার নিজেরও নিশ্চয়ই মন ভালো নেই। থাকবে কী করে বলো! এত এত খারাপ খবরের মধ্যে ভালো থাকার জোঁটা কোথায়।

তবুও তো আমাদের ভালো থাকতে হচ্ছে, খেলতে হচ্ছে। জন্মদিনও এসে গেছে তোমার। অনেকবার তোমাকে শুভেচ্ছা জানাবো ভেবেও জানানো হয়নি। এবার আর সেরকম করতে ইচ্ছে করলো না। তোমাকে চিঠিটা লিখতে বসেই গেলাম।

***

লিও,
তোমাকে প্রথম কবে দেখলাম সেটা বলি আগে, শুভেচ্ছা না হয় পরে জানানো যাবে। বার্সেলোনার জার্সিতে তুমি প্রথম খেলতে নামলে যখন, তখনই তোমাকে প্রথম দেখা। ১৬ বছরের কিশোর তুমি। তখনো তোমার চুলগুলো বড় বড়। তুমি প্রথম দিনে নামলে ৭৫ মিনিটে, তবুও নজর কাড়লে। আগেও তোমার কথা শুনেছিলাম অনেক, কিন্তু সেবারই স্বচক্ষে প্রথমবার দেখা।

তখনো তো জানি না তুমি কী দুর্বিষহ সময় পার করে এসেছো এখানে। দারিদ্রতায় পিষ্ঠ ছিল, হরমোনজনিত সমস্যায় তোমার ফুটবল খেলা নিয়েই নাকি সন্দেহ জেগেছিল। এরপর বার্সা তোমাকে টিস্যু পেপারে সাইন করে রেখে দিলো লা মাসিয়াতে।

এসব ঘটনা যখন তোমার সঙ্গে ঘটছে, আমিও তখন পার করছি এক অনিশ্চিত জীবন। তারও আগে বাবা-মা নাকি পৃথিবীর মুখই দেখাতে চাননি আমাকে। মায়ের জোড়াজুড়িতে এই দুনিয়ায় আসা।

শুরুতে আমার মনে হতো, না আসাটাই বোধ হয় ভালো ছিল। বাবা মদ খেয়ে পড়ে থাকতেন। মা অন্যের বাসায় কাজ করে যেটুকু পেতেন, তা দিয়ে খেতেও পারতাম না ঠিকঠাক।

এত এত সমস্যার মধ্যেও একটা জিনিস ধ্যানজ্ঞান হয়ে গেল আমার, ফুটবল। তোমার মতো। পেয়ে বসলো জেদ। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিনিয়ত।

এই দেখো, তোমাকে লিখতে বসে নিজের কথা বলে ফেলছি বেশি। তার অবশ্য কারণও আছে, তোমার মতো ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা তো ছিলো না আমার। তাই চেষ্টা করেই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হয়েছে।

তোমার বাবা নাকি ফুটবল কোচিং করাতেন টুকটাক। তোমার মা ঝাঁড়ু দিতেন রাস্তা। তুমি পড়ে থাকতে ফুটবল নিয়ে। সবাই বলে, আমি নাকি খুব পরিশ্রমী। তোমার বেলায় কেন সবাই এই ব্যাপারটায় এত কার্পন্য করে কে জানে!

তুমিও তো লড়াই করে এসেছো এই জায়গাটাতে। হরমোনের সমস্যা কাটিয়ে ফুটবল দিয়ে গেয়েছ মুক্তির গান। ভাগ্যিস তুমি সেটা করেছিল, না হলে হয়তো আমিও আজ থাকতাম না এই জায়গাটাতে।

নিশ্চয়ই ভাবছো, কেন আমি এমনটা বলছি? আরে, তুমিই তো শুরু করলে। আমি প্রথমে ব্যালন ডি অর জিতলাম একটা। তুমি কিনা একে একে জিতে ফেললে চারটা! আমি আমার সংখ্যাটা তিনে নিতেই তুমি সেটা নিয়ে গেলে পাঁচে।

আমিও অবশ্য ছেড়ে কথা বলিনি। সংখ্যাটা সমান করে তবেই থেমেছি। গেলবার অবশ্য আবার তুমি এগিয়ে গেলে। যে অনুষ্ঠানে আমি গেলাম না, কেন যাব বলো? তোমার এগিয়ে যাওয়া দেখতে? তুমি আমার শত্রু নও সত্যি, তবে তোমাকে ছাড়িয়ে যাওয়াই তো আমার অনুপ্রেরণা। তোমার এগিয়ে যাওয়া দেখতে কী আর ভালো লাগে!

শোন, তোমাকে দাওয়াত দিয়ে রাখলাম আগেভাগে। আমি যখন আবার তোমাকে ছুঁবো কিংবা ছাড়িয়ে যাবো। তখন আসবে কিন্তু। তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে পুরস্কার নিতে আমার দারুণ লাগে। তুমি নিলে বাড়ে জেদটা। সবাই ভাবে আমি বুড়িয়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেছি। আমি জানি, তুমি অন্তত বিশ্বাস করো- আমাদের লড়াইয়ের সমাপ্ত না এখানেই।

এসব কথা বলছি, যাতে বুঝতে পারো তুমি আমার কতটা কাজে আসো। আমার প্রতি মিনিটের অনুশীলনে, বল পায়ের প্রতিটা শটে কীভাবে গোলপোস্টে লক্ষ্যভেদে তোমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশা মিশে থাকে। এসবের জন্য একটু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দেই এই চিঠিতে।

তোমার আর আমার কয়েকটা জায়গায় খুব মিল আছে। তোমার আর আমার বয়সের যা পার্থক্য, আমার ছেলে রোনালদো জুনিয়রের সঙ্গে তোমার বড় ছেলে থিয়াগোরও ততটা। আরেকটা জায়গার কথাও নিশ্চয়ই তোমার মনে পড়ছে, যেখানটাতে আমাদের দুজনের মিল আছে।

যার কথা মনে পড়লে নিশ্চয়ই তোমার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। আক্ষেপ, হাহাকার আর না পাওয়ার বেদনা ঝাঁপটে ধরে। একটা বিশ্বকাপ না জেতার কথা বলছি আমি। তোমাকে আর আমাকে যে সর্বকালের সেরার কাতারে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তো আমরা পিছিয়ে যাই এই একটি জায়গাতে।

তুমি তো খুব কাছেও পৌঁছেছিল। শিরোপাটা প্রায় ধরেই ফেলেছিলে। সোনালী সেই ট্রফির সামনে তোমার মায়ামাখা আর প্রাণপনে চেষ্টা করে কান্না আটকে রাখা মুখের ছবিটা, আমি প্রায়ই দেখি জানো। আর ভাবি, ভাগ্য কত নির্মম হতে পারে। না পাওয়ার বেদনা, আক্ষেপ হতে পারে কতটা তীব্র!

সবাই ভাবে, আমি তোমার প্রতিপক্ষ। তুমি বিশ্বকাপ না জেতায় বোধ হয় আমি খুব খুশি হয়েছি। বিশ্বাস করো, একটু্ও না। এক বিন্দুও। বরং যতটা আফসোস করা সম্ভব, ততটাই করেছি আমি। আর শিখেছি, সবকিছু কাটিয়ে তুমি আবার যেভাকে ফিরে আসলে।

***

ক্যারিয়ারের শুরুতেই তুমি স্পেনে খুব নাম করে ফেললে অল্প দিনে। তোমার পায়ের জাদুর মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো পুরো বিশ্ব। ততদিনে আমি পর্তুগাল ছেড়ে চলে এসেছি ইংল্যান্ডে, ইউনাইটেডের হয়ে খেলি। আমারও নাম ছড়াতে লাগলো। চলে এলাম তোমার মুখোমুখি হতে, তোমার ক্লাবের চিরশত্রুর ঘরে। রিয়াল মাদ্রিদে।

এরপর থেকে আমাদের একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াইটা চলেছে সমানভাবে। একটা দশক আমরা পাল্লা দিয়ে ছাড়িয়ে গেছি একে-অপরকে। আমার বিশ্বাস, তাতে বরং ফুটবলের সৌন্দর্যই বেড়েছে।

আমি অনেকের মুখে শুনেছিও সেটা। আমাদের এই লড়াই নাকি আলোচনা চলে চারদিকে। আমি তো সাদা জার্সিটা ছেড়ে চলে এসেছি লিও, স্পেন ছেড়ে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছি। তোমার কি তাতে খারাপ লাগেনি? মিস করো না আমাকে?

আমি এল-ক্লাসিকোর প্রহর গুনতাম জানো। তোমার মুখোমুখি হওয়াটা কী যে উপভোগ্য, কীভাবে বুঝাই তোমাকে। এখন তো আর সেটা হয় না তেমন। তোমার অবিশ্বাস্য কীর্তি দেখা হয় না খুব একটা সামনে থেকে। আমি তোমাকে খুব মিস করি, এটুকু বলতি পারি কোনো দ্বিধাতে না পড়ে।

আরেকটা জিনিস মনে রেখো লিও। আমাদের লড়াইটা কিন্তু এত দ্রুত শেষ হচ্ছে না। তুমি তো জানো, আমি কেমন জেদি। আমি নিশ্চয়ই ফিরে আসবো ভালোভাবে, তোমার বিরুদ্ধে লড়বো আবার শিরোপা জয়ের লড়াই।

এই চিঠি শেষ করে দেবো। তবে তার আগে কয়েকটা চাওয়া বলে নেই। আমি ইউরো জিতলেও বিশ্বকাপটা ছুঁয়ে দেখতে পারিনি। তুমি দেশের হয়ে জিততে পারোনি কোনো শিরোপাই। আমি চাই, আমরা অবসরে যাওয়ার আগে দুজনের কারো হাতে একটা ট্রফি থাকুক। ঈশ্বর নিশ্চয়ই সে প্রার্থনা কবুল করবে।

আমি যখন বৃদ্ধ হয়ে যাবো। জুনিয়র ততদিনে অনেক বড় হয়ে যাবে। আমার চোখে হয়তো মোটা ফ্রেমের একটা চশমা থাকবে। আমি তখনো তোমার খেলা দেখে জেদটা বাড়াবো। তোমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকতে চাইবো। তোমার আরও লাখো কোটি ভক্তেরও হয়তো তেমনই ইচ্ছে হবে, অন্য কোনো কারণে।

এসব কিছুর জন্য ধন্যবাদ লিও। আমাকে বারবার তাঁতিয়ে দেয়ার জন্যও। শুভ জন্মদিন। তুমি বেঁচে থাকো আরও অনেক অনেক দিন।

প্রেরক,
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো,
তুরিন, ইতালি

প্রাপক,
লিওনেল মেসি
বার্সেলোনা, স্পেন

(এই লেখার পুরোটাই লেখকের কল্পনা। বাস্তবে এমন কোনো চিঠি লেখা হয়নি।)