• ক্রিকেট

স্যার রিচার্ড হ্যাডলিঃ দ্য ফাইনেস্ট ক্রিকেটার নিউজিল্যান্ড হ্যাজ এভার প্রডিউসড

পোস্টটি ৬৫৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

"His lithe, whippy, side-on action made life uncomfortable for all the great batsman of his era, as he extracted pace, bounce and movement from even the least responsive of surfaces."- উইজডেন

লম্বা রান আপের সাথে হাই আর্ম সাইড-অন একশনে যেকোনো উইকেটে গতির ঝড় তুলতে পারতেন তিনি। ইংলিশ গতিদানিব ফ্রাঙ্ক টাইসনের ভাষ্যমতে, রিচার্ড হ্যাডলির গতি ছিল ম্যলকম মার্শাল কিংবা জোয়েল গার্নারের মতো। বাট সময় পরিবর্তনের সাথে রান-আপ আর গতি কমিয়ে মনযোগ দেন এক্যুরেসি, কন্ট্রোল এবং সুইংয়ের দিকে। ন্যাচারাল আউট সুংয়ের পাশাপাশি উইকেটের দুইপাশেই সুইং করাতে পারতেন তিনি৷

১৯৫১ সালের ৩ জুলাই ক্রাইস্টচার্চের বিখ্যাত ক্রিকেট পরিবারে জন্ম নেম রিচার্ড জন হ্যাডলি। বাবা ওয়াল্টার হ্যাডলিও ছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাম করা ক্রিকেটার। নিউজিল্যান্ডের হয়ে ১১ টেস্ট খেলা এই প্লেয়ারকে মনে করা হয় দেশটির অন্যতম সেরা অধিনায়ক। রিচার্ড হ্যাডলিরা ছিলেন পাঁচ ভাই এবং সবাই ছিলেন ক্রিকেটার। ১৯৭৫ বিশ্বকাপে তিন ভাই ব্যারি হ্যাডলি, ডেল হ্যাডলি আর রিচার্ড হ্যাডলি একসাথে খেলেছেন। বাবার পাশাপাশি মা কারেন হ্যাডলিও ১৯৭৮ সালে একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন নিউজিল্যান্ড প্রমীলা দলের হয়ে।

১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয়। কিন্তু অতটা আহামরি ভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি শুরুতে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত খেলেন ৩৪টি ওয়ানডে আর নেন ৩৮ টি উইকেট। এদিকে ১৯৭৭ পর্যন্ত টেস্ট খেলেন ১৭টি আর নেন ৬১ উইকেট। তিনি তার এই সময়েও নিউজিল্যান্ডকে ম্যাচ জিতিয়েছেন। ততকালীন ভারতীয় দলে প্লেয়ার হিসেবে ছিলেন সুনীল গাভাস্কার, দিলীপ ভেংসরকার, মহিন্দর অমরনাথ কিংবা গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের মতো ভয়ংকর সব প্লেয়াররা। ১৯৭৬'এ ওয়েলিংটন টেস্টে রিচার্ড হ্যাডলি পুরো একাই ধ্বসিয়ে দেন ভারতীয় এই বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইন-আপ। দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেট সহ নেন মোট ১১ উইকেট।

১৯৭৮ সাল স্যার হ্যাডলি যুগের শুরু। ১৯৭৮, আবার ওয়েলিংটন কিন্তু প্রতিপক্ষ ভিন্ন। এইবার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে তিনি নেন চার উইকেট আর দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ছয় উইকেট। কিউইদের দেয়া ১৩৭ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৬৪ রানেই গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ডের ইনিংস। ৪৮ বারের মোকাবেলায় প্রথম জয়।

ক্লাইভ লয়েড, গর্ডন গ্রীনিজ, ডেসমন্ড হেইন্স, জোয়েল গার্নার, মাইকেল হোল্ডিংদের নিয়ে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য ছিল উইন্ডিজ দল। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম দুই বিশ্বকাপ তাদের দখলে৷ বিশ্বকাপ শেষে ১৯৮০ সালে নিউজিল্যান্ড সফরে যায় উইন্ডিজ। এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট জিতে নেয় কিউইরা। ভয়ংকর অপ্রতিরোধ্য উইন্ডিজদের বিপক্ষে বাকি দুই ম্যাচ ড্র করে কিউইরা। আর তিন ম্যাচেরই নায়ক হ্যাডলি সাহেব। প্রথম ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে নেন ১১ উইকেট। সেই ম্যাচে ১০৪ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে যখন নিউজিল্যান্ডের ৫৪ রানে ৭ উইকেট নেই সেইখান থেকে তার করা মূল্যবান ১৭ রান ম্যাচ জয়ে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় টেস্টে তিনি করেন তার ক্যারিয়ারের প্রথম শতক, ৯৩ বলে খেলেন ১০৩ রানের ইনিংস।

অস্ট্রেলিয়া - নিউজিল্যান্ড , পাশাপাশি দেশ। ফাস্ট বোলারদের রাজত্ব সেই বহু আগে থেকেই দুই দেশে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত কোনো টেস্ট খেলেনি দুই দল একে অপরের বিপক্ষে। আর এরপর থেকে নিয়মিত হলেও অজিদের বিপক্ষে জয় পায়নি কিউই রা। আর রিচার্ড হ্যাডলি আসার পর তারা প্রথম ট্রান্স-তাসমানিয়া ট্রফি জয় লাভ করে। ব্রিসবেনে প্রথম টেস্টে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে হ্যাডলির গতির মুখে পড়ে অজিরা। ব্যাটিং লাইন আপের প্রথম আট ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফেরান তিনি। সেই ইনিংসে তিনি ৫২ রানে ৯ উইকেট নেন আর অন্যদিকে ১৭৯ রানে অল-আউট অজিরা। ব্যাটিংয়ে নেমে মার্টিন ক্রোর ১৮৮ ও রেইডের ১০৮ রানের ইনিংসের পাশাপাশি হ্যাডলির ৪৫ বলে ৫৪ রানের ক্যামিও অজিদের বিপক্ষে ৫৫৩ রানের পাহাড় দাঁড় করায়। জবাবে এলান বোর্ডারের অপরাজিত ১৫২ রানের ইনিংসের পরেও হার এড়াতে পারেনি অজিরা। সেই ইনিংসে হ্যাডলি নেন ৬ উইকেট৷ সিডনিতে দ্বিতীয় টেস্টে জয় না পেলেও তিনি নেন সাত উইকেট আর শেষ টেস্টে ১১ উইকেট নেন। আর পুরো সিরিজ মিলে একাই নেন ৩৩ উইকেট।

১৯৯০ সালে ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজে সঞ্জয় মাঞ্জেকারের উইকেট নিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে চারশ উইকেটের মালিক হন তিনি। ২০০২ সালে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা বোলার হিসেবে ঘোষণা করে উইজডেন। রিচার্ড হ্যাডলি নিউজিল্যান্ড টিমে খেলার সময় তারা ২২টি টেস্টে জয় লাভ করে আর সেই ২২টেস্টে তিনি ১৭৩টি উইকেট শিকার করেন। নিজ দলের জয় পাওয়া ম্যাচগুলোতে কমপক্ষে ১৫০ উইকেট নেয়া বোলারদের মাঝে সবচেয়ে কম এভারেজ রিচার্ড হ্যাডলির (১৩.০৬)।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮, পরিসংখ্যানের হিসাবে টেস্ট ক্রিকেটের দ্বিতীয় সেরা বোলিং এভারেজ স্যার হ্যাডলির। ৬০ ম্যাচে ১৯.৫৭ গড়ে নিয়েছেন ৩৩০ উইকেট। ৩২ বার পাঁচ উইকেট ও ৮ বার দশ উইকেট পুরেছেন নিজের ঝুলিতে। সবচেয়ে কম বোলিং গড়ের দিক দিয়ে সবার আগে আছে ইমরান খান। ৫৮ ম্যাচে ১৯.৩৯ গড়ে ২৭২ উইকেট নিয়েছেন ইমরান খান। হিসাবের দিক দিয়ে হ্যাডলির চেয়ে খেলেছেন দুই ম্যাচ কম নিয়েছেন ৫৮ উইকেটও কম।

১৯৯০, রিচার্ড হ্যাডলি যুগের শেষ যাত্রা। ৫ জুলাই ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরে যান তিনি। শেষ টেস্টেও তিনি তার বোলিং আগুনে বিপক্ষ দলের উইকেট উপড়ে ফেলেছেন। প্রথম ইনিংসে তিন উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬তম পাঁচ উইকেট নিয়েছেন সেদিন। অবসরের বছরই 'নাইটহুড' উপাধি লাভ করেন তিনি।

"Hadlee was a phenomenon - one of a kind, and will perhaps never be repeated. "- উইজডেন।