• ফুটবল

গল্পে গল্পে এল লোকো

পোস্টটি ১১১০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

আমাকে যদি কখনো জিজ্ঞাসা করা হয় যে কোন জিনিসটি হবার কথা ছিলো বা হলে ভালো হতো আমি দ্বিতীয়বার ভাবা ছাড়ায় উত্তর দিতাম আমার আর আমার ক্রাশের প্রেম।

না এ ধরনের প্রশ্ন কেউ কখনো করে না আর করলেও এটা আমার জবাবও হতো না।তবে একটা জিনিস কেন কাজ করলো না সেই প্রশ্ন মাথায় এখনো ঘুরে।সেটি হলো মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে তারকায় ঠাসা আর্জেন্টিনা দল কেন ২০০২ সালের ‘কোরিয়া-জাপান’ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিলো?কেন বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সবকিছু এসপারওসপার করা দলের তিনম্যাচে মাত্র দুই গোল?এই ক্রাশের মন বোঝার মতোন এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে যাওয়া নিতান্তই আর্সেনালের চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার মতোনই।তাহলে কী বার্সার সাথে ফাইনালের মতোন আমার বিরুদ্ধেও বাজে রেফারিং হয়েছিলো!? ধুর ছাই,আবারো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।বাজে অভ্যাস,চরম বাজে অভ্যাস।আমার ম্যাচের রেফারি কে ছিলো এবং আমি কি প্রিন্স নেইমির মতোন ক্রাশের মনে ঠিকমতোন ডাইভ দিতে পারিনি,পেনাল্টি কি পেতাম না!!

 

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের দক্ষিণের শহর অ্যাভেলেনেডা।মার্সেলো বিয়েলসা এবং তার এক বন্ধু-সহকর্মী মিলে আঞ্চলিক এক ফুটবল টুর্ণামেন্টের খেলায় এক মোটা ছেলের খেলা দেখছেন।দেখলেন এবং ছেলেটিকে নিউওয়েলস ক্লাবে নিয়ে আসলেন।মোটা ছেলেটিকে তার ডায়েটে পরিবর্তন আনতে বলা হলো এবং প্রায়ই বলতো বৃষ্টিতে ট্রেনিং করতে।এ দুটো কাজই ছেলেটির ভীষণ অপছন্দের ছিলো।সেইদিনের সেই মোটা ছেলেটি পরবর্তীতে সারা পৃথিবী জুড়ে “বাতিগোল” নামে পরিচিত ছিলো।

 

বিয়েলসা আর গ্রিফা তার সেই সহকর্মী-বন্ধু শীতের এক রাতে মারফি শহরের এক বাড়ির জানালাতে টোকা মারলেন।বাড়ির মানুষজন তো মনে  করলো নির্ঘাত চোর এসেছে এত রাতে।বিয়েলসা-গ্রিফা মিলে তাদের আশ্বস্ত করলেন এবং জানতে চাইলেন এটা মাউরিসিও পচেত্তিনোর বাসা কি’না।তাদেরকে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে দেয়া হলো।পচেত্তিনো তখন রাজ্যের ঘুমে বিভোর।বিয়েলসা তখন জিগ্যেস করলেন পচেত্তিনোর পা দেখা যাবে নাকি।পচেত্তিনোর পা দেখে বললেন এই ছেলের জন্ম তো ফুটবল খেলার জন্যে হয়েছে।

 

বিয়েলসা যখন প্রথমবারের মতোন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের মেইন কোচ হয় তখন তার ট্রেনিং এর একটা অংশ ছিলো প্লেয়ারদের হোমওয়ার্ক দেয়া।আর এই হোমওয়ার্কটা ছিলো প্রতিপক্ষ দল এবং দলের প্লেয়ার সম্পর্কে তারা কতটুকু জানে সেটা পরেরদিন ট্রেনিং এ আলোচলা করা।মূলত দলের প্লেয়াররাও যাতে আপকামিং ম্যাচ নিয়ে ফোকাসড থাকে সেটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি।বিয়েলসার ট্রেনিং এর অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ ছিলো কঠোর পরিশ্রম।বাতিস্তুতা বিয়েলসাকে নিয়ে বলতে গিয়ে প্রায়ই বলতেন বিয়েলসা নিজে স্বপ্ন দেখতে এবং আমাদের স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসতেন।এসব স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমও করতেন তিনি।আরিগো সাচ্চির মিলান তাকে ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করতো।নিউওয়েলসের ছেলেদেরও বলতেন সাচ্চি-মিলানের মতোন বিশ্বজয়ের।

DxIbZ_0XQAAwzwN

 

আরেকবার কোপা লিবার্তোদোরেসের এক ম্যাচে স্বদেশী ক্লাব রেসিং এর কাছে ০-৬ গোলে পরাজয়ের পরে নিউওয়েলস এর কিছু উগ্র সমর্থক বিয়েলসার বাড়িতে যায়।কী ছিলো তাদের উদ্দেশ্য সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।সেই লক্ষ্যে যখন গেলেন বিয়েলসার বাড়ি গিয়ে নিজেরাই গেলেন ভড়কে।কিছুক্ষণ চিল্লা-পাল্লা করলেন,তাদের দিকে বিয়েলসা ভ্রুক্ষেপ করলেন না।বেশ কিছু সময় হয়ে গেলো।এবার চটলেন এল লোকো।বেরিয়ে এলেন বাসার ভিতর থেকে।হাতে একটা হ্যান্ড গ্রেনেড।বললেন তার বাড়ির সামনের থেকে না গেলে এখনি মারবেন গ্রেনেডটি।চলে গেলো সবাই।নাহ এই মানুষটি সবার থেকে আলাদা। 

 

কোচ বিয়েলসার বলার মতোন আহামরী কোনো ট্রফি-সাফল্য নেই।শিরোপা জয়ই সবসময় সেরার উত্তর হতে পারে না।তাহলে ১৭ নমিনেশন থেকে ১১ টি অস্কার পাওয়া সিনেমা টাইটানিক হতো সর্বকালের সেরা।বা আমরা যদি ব্রিটিশ মিউজিশিয়ান ডেভিড বুয়ির কথা বলি তার কিন্তু অ্যালবাম সেলিং রেকর্ড তার প্রতিভা-প্রভাব- প্রতিপত্তি কোনোটিরই সঠিক প্রকাশ করে না।ম্যাচ হারার পর বিয়েলসা একা হয়ে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কাঁদতেন।কী ভুল করেছিলো দল সেই উত্তর খুঁজে বেড়াতেন।এসব সবার পক্ষে সম্ভব নয়।মাঝেমধ্যে নিজের বাসায়ই যেতেন না,ঘুমাতেন ক্লাব কমপ্লেক্সে।এমনি এক রাতে বিয়েলসা বেরুলেন হাটতে।রাত তখন ২ টা।কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা কর্মীরা ভাবলেন হবে হয়তো কোনো বহিরাগত।বেশ কয়েকবার ডাকার পরেও কোনো উত্তর না আসাতে গুলি বের করে তার দিকে এগিয়ে গেলেন।কানে রেকর্ডার ছিলো দেখে বিয়েলসা তাদের ডাক শুনতে পাননি।পরে নিরাপত্তাকর্মীদের বললেন আমি বিয়েলসা।এরকম অসংখ্য কাহিনি আছে বিয়েলসাকে নিয়ে।ফুটবলের অতীব রহস্যজনক এক চরিত্র।

 

“I have offended God & Mankind because my work didn’t reach the quality it should have”

জীবনের শেষ বয়সে এসে এমনই বলেছিলেন লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি।একথাটি যেন বিয়েলসার পুরো জীবনের প্রতিফলন।

বর্তমান যুগের সেরা কোচেরা তাকে মানেন গুরু বলে।মানবেই না কেন।তাদের সাফল্যের দীক্ষা এসেছে তো বিয়েলসার হাত ধরেই।