• ফুটবল

মাউন্ট, মেসন মাউন্ট

পোস্টটি ৫৫৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ফুটবলার হবার স্বপ্নে বিভোর ছেলে মেসনকে একটা পরামর্শই দিয়েছিলেন বাবা টনি মাউন্টঃ আর যাই হও ভুলেও বিলাসি ৮ কিংবা ১০ নম্বর হয়ো না। সেরাদের কাতারে থাকতে হলে অবশ্যই খেলার কদর্য দিকটা (ডিফেন্ডিং) রপ্ত করে নিতে হবে তোমাকে।“ বাবার আদেশ যে শিরোধার্য হিসেবে মেনে চলেছেন মাউন্ট সেটা বলাই বাহুল্য। চেলসির একাডেমিতে ছয় বছর বয়স থেকে বেড়ে ওঠা মাউন্ট এখন চেলসির ভবিষ্যৎ, ইংলিশ জাতীয় দলেও তাঁর অবাধ বিচরণ। তবে অনেক চরাই-উৎরাই তো তাঁকে “মাউন্ট” করতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে, দলবদলে আবার কেরামতি দেখাতে শুরু করা চেলসি বোর্ডের বার্তাটাও স্পষ্টঃ নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে না পারলে খোলনলচে পাল্টানো চেলসি দলে খেলার সুযোগ মিলবে না। কিন্তু পরিশ্রম যে মাউন্টের পরম বন্ধু, নীল জার্সি গায়ে তো তাঁর আরো কিছু করাই বাকি আছে। মেসন মাউন্ট যে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন সেটা অল্পসময়েই সবাই ভালোমত বুঝে গেছেন।

NINTCHDBPICT000577466516সেই ছোট্টটি থেকে নীল জার্সিটাকে আপন করে নেয়া

পোর্টসমাউথের টনি মাউন্ট লোকটা কখনো পেশাদার ফুটবল খেলেননি। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নটা ছেলে পূরণ করুক মনে মনে এমন আশাই হয়তো করতেন। কিন্তু মানুষটা তো নিরেট বাস্তববাদী। কই লাখ লাখ ছেলেই তো পেশাদার ফুটবলার হবার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু আকাশছোঁয়া সেই স্বপ্নকে বাস্তবের জমিনে নামিয়ে আনতে পারে ক’জন? ছয় বছর বয়সে যখন চেলসির একাডেমিতে মেসনের ডাক পড়লো তখনো ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত টনি। চেলসির একাডেমিতে সব ধরণের আধুনিক সুযোগ সুবিধায় দেশের সেরা কোচদের অধীনে ফুটবলার হবার দীক্ষা নেবে মেসন, তাহলে টনির ভয় কীসের? অপ্রিয় সত্যটা সবারই জানা – চেলসির একাডেমিতে বেড়ে ওঠা তরুণদের মধ্যে কেবল জন টেরিই নীল জার্সিতে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, বাকি অনেকেই হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলান্তে। চেলসির একাডেমির অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা মেসনের যখন ১৭ পূর্ণ হলো তখন টনির মনের আকাশ থেকে দুঃচিন্তার মেঘ সরেনি। মেসনকে যদি পেশাদার চুক্তিতে সই করার সুযোগ না দেওয়া হয়? খেলাপাগল ছেলেটার ভবিষ্যত কী হবে তখন? বলাই বাহুল্য ফুটবলার হিসেবে বেড়ে ওঠার সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে বাবাকে ভুল প্রমাণ করে চলেছেন মেসন মাউন্ট। বিজ্ঞানীরা বলেন ভুল প্রমাণিত হওয়ার মানসিক জ্বালা নাকি একজন মানুষের কাছে শারীরিক পীড়নের শামিল, কিন্তু টনি মাউন্টের কাছে সেটা দুনিয়ার সেরা অনুভুতিই হওয়ার কথা।

 

একদম ছোট্টটি থেকেই ফুটবল বলতে অজ্ঞান ছিলেন মেসন। সারা বাড়িজুড়ে গোলকটা তাঁর নিত্যসঙ্গী, বড় বোনকে টার্গেট বানিয়ে হরদম শ্যুটিং প্র্যাক্টিস চলতো। স্থানীয় ক্লাব পোর্টসমাউথ তখন দ্বিতীয় বিভাগে, ফ্রাটন পার্কের মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানোর স্বপ্ন হয়তো উঁকি দিতে শুরু করেছিল মাউন্টের শিশুমনে। “পম্পি”দের স্কাউটরাও মাউন্টের ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে দলে টানতে চেয়েছিল কিন্তু লন্ডন থেকে আসা এক ফোনকল মেসনের চেনা পৃথিবীকে আপাদমস্তক পাল্টে দিলো। রোমান আব্রামোভিচের অর্থের ঝনঝনানিতে ইংল্যান্ডের নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত চেলসি। তাদের ডাক অগ্রাহ্য করার উপায় ছিল না টনি মাউন্টের। এরপর সপ্তাহান্তে ৭৩ কিলোমিটার ড্রাইভে পোর্টসমাউথ থেকে লন্ডনে যাওয়াটাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেললো বাপ-বেটা। মেসনের ভাগ্য বেশ সুপ্রসন্নই বলা যেতে পারে, চেলসির স্বর্ণালী সময় স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতাটা অতুলীয়ই হওয়ার কথা। পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলো ক্লাবের অবকাঠামোতেও, ভাড়া করা হার্লিংটন থেকে চেলসি নিজেদেরকে সরিয়ে নিলো অত্যাধুনিক কোবহাম ট্রেনিং সেন্টারে। মাউন্টদেরকেও বেছে বেছে সবচেয়ে ভালো কোচ দেওয়া হলো। কিন্তু কোনও না কোনওভাবে তো তাৎক্ষণিক সাফল্যের মূল্য চুকাতে হয়। বারবার কোচ বদল আর ট্রফি এনে দেওয়ার সার্বক্ষণিক চাপে থাকা কোচেরা তারুণ্যকে এড়িয়ে চলতে লাগলেন। চেলসির উঠতি প্রতিভাবানদের ক্যারিয়ারের গতিপথটা তাই নির্ধারিত হয়ে গেলোঃ চার পাঁচ বছর বিভিন্ন ক্লাবে ধারে খেলতে যাওয়া যার একটি ভিতেস আর্নহাইম, চেলসির হয়ে গুটিকয় কাপের খেলা ক্যামিও খেলা আর সবশেষে মাঝারি বা নিচুসারির ক্লাবে যোগ দেওয়া। কার্লটন কোল, স্যাম হাচিন্সন, মাইকেল ম্যান্সিয়েন, জশ ম্যাকেকরান, গায়েল কাকুতা কিংবা হালের রায়ান বার্ট্রান্ড, টমাস কালাচ কিংবা প্যাট্রিক ভ্যান আনহল্টদের সাথে কমবেশি এমনটাই হয়েছে। মাউন্টরা সফল হবেন কীভাবে? কিন্তু বক্সার দাদুর কাছ থেকে মেসন লড়াকু মানসিকতা পেয়েছেন, তাঁকে ঠেকিয়ে রাখে এমন সাধ্যি কার? দেখা গেছে প্র্যাক্টিস শেষে সবার তল্পিতল্পা গোটানো শেষ এমন সময়ে মাউন্ট মাঠে দৌড়িয়েই যাচ্ছেন। ফুটবলার হিসেবে সফল হওয়ার জন্য মেসন মাউন্টের মূলমন্ত্রঃ পরিশ্রম, পরিশ্রম এবং আরো পরিশ্রম। চেলসির বয়সভিত্তিক দলে অমিত সম্ভাবনাময় একেকজন সঙ্গী পেলেন মাউন্ট, ফলাফল টানা দুই বছর উয়েফা ইয়ুথ লীগ আর টানা পাঁচ বছরসহ নয় বছরে সাতবার এফএ ইয়ুথ কাপের চ্যাম্পিয়ন চেলসি। মাউন্ট ১৬-১৭ মৌসুমে তো অধিনায়ক হিসেবেই ইয়ুথ কাপ জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন। এরপর ২০১৭ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোতে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হলেন মাউন্ট, ইংল্যান্ডের শিরোপা নির্ধারক গোলেও সরাসরি অবদান থাকলো বিস্ময়বালকের। কিন্তু তারপরেও মূলদলে সুযোগ তো মিলছিল না। এব্রাহাম, বোগা, সোলাঙ্কি, মুসোন্ডা কিংবা তমোরিদের পথেই হাঁটতে হলো মাউন্টকে। চেলসির খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার “রাইট অফ প্যাসেজ” হিসেবে নেদারল্যান্ডসে ধারে খেলতে পাঠানো হলো মাউন্টকে, গন্তব্যঃ সেই ভিতেস আর্নহাইম।

Mason-Mount-Vitesse-Arnhem-1068x580ভিতেসের হয়ে ক্রুইফের দেশে লিগ মাতিয়েছেন

ভিনদেশে শুরুটা ভালো হলো না মাউন্টের। কোচ হেঙ্ক ফ্রেসার মাউন্টের ওপর ভরসা রাখতে পারছিলেন না, তাই বেঞ্চেই কাটছিল সময়। নতুন পরিবেশে, নতুন সংস্কৃতিতে আজীবন প্রথম একাদশে খেলা মাউন্টকে হতাশা জেঁকে ধরাটা অস্বাভাবিক কিছু হতো না কিন্তু উল্টো তাঁর জন্য সেটা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করলো। দলে সুযোগ পেতেই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে নিজের জায়গাটা পাকাপাকি করতে সময় লাগলো না ইংলিশ সেনসেশনের। লিগে ৮ গোল আর ৯ অ্যাসিস্টে ভিতেসকে ইউরোপা লিগে খেলার টিকিট পাইয়ে দিলেন মাউন্ট। ক্লাবের বর্ষসেরা খেলোয়াড় তো হলেনই, এরিদিভিসির বর্ষসেরা একাদশেই ঠাই মিলল। পরের বছর ডার্বির হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে যাওয়া। একে তো ইংলিশ, তার উপর বড় হয়েছেন চেলসির একাডেমিতে তাই সমবয়সী আরো অনেকের মতো ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডকে যে আদর্শ মেনে বড় হবেন এটাই স্বাভাবিক। সেই ল্যাম্পার্ডের অধীনে খেলবেন সেটা যেন ফুটবলবিধাতা আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন। ডার্বিতে এসেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেন মাউন্ট। লিগে দুর্দান্ত পারফর্মেন্স তো ছিলোই, লিগ কাপে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ছিটকে দিয়ে সবার তাক লাগিয়ে দিলো ল্যাম্পার্ডের তরুণ নির্ভীক দল। পরের রাউন্ডে চেলসির বিপক্ষে দারুণ খেলেও হেরে গেলো ডার্বি, “অভিভাবক”এর বিরুদ্ধে মাউন্টের পেলেন একটি অ্যাসিস্ট। ’১৯ এর ফেব্রুয়ারি-মার্চে চোটের কারণে ছিটকে পড়লেন তিনি, ডার্বিও সমানে হোঁচট খেতে লাগলো – ১০ ম্যাচে মাত্র ২টি জয় এলো। শেষমেশ আরেক চেলসি জুটি এব্রাহাম-টেরির অ্যাস্টন ভিলার কাছে প্লে-অফ ফাইনালে হার মানতে হলো ল্যাম্পার্ড-মাউন্টদেরকে। কিন্তু ৮ গোল আর ৫ অ্যাসিস্টে মাউন্ট লন্ডনে বার্তা পাঠিয়ে দিলেন মাউন্ট : চেলসির চ্যালেঞ্জ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত তিনি।

1257074334.jpg.0প্রথম মৌসুমেই বাজিমাত

এরপরের সমীকরণটাও নিখুঁতভাবে মিলে গেলোঃ ল্যাম্পার্ডের চেলসির দায়িত্ব নেয়া, ট্র্যান্সফার ব্যানের কারণে সরাসরি একাদশে ঢুকে যাওয়া, তারপর তারুণ্যের ঝাণ্ডা উড়িয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দেওয়া। নতুন মৌসুমে লিগের প্রথম গোল মাউন্টের পা থেকে এলো, সেটা একেবারে “মাউন্টিয়” কায়দায়ই। লেস্টারের উইলফ্রেড এনদিদি আলস্যভরে পাস বাড়াতে চেয়েছিলেন, প্রেসিংয়ে সিদ্ধহস্ত (নাকি পদ) মাউন্ট চোখের পলকে সেখানে হাজির, এনদিদির পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে স্মাইকেলের মুখোমুখি হলেন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে নেওয়া শটে জাল খুঁজে নিলো। পরের সপ্তাহে আবারো গোল করা, ফেরা নতুন ইতিহাস গড়া। মাউন্টের পঞ্চম গোলটিসহ মলিনিউয়ে করা পাঁচ গোলের প্রতিটিই এসেছে চেলসির একাডেমি “প্রোডাক্ট”দের পা থেকে। তারপর বুলগেরিয়ার বিপক্ষে “থ্রী লায়ন”দের পরম আরাধ্য সাদা জার্সিতে অভিষেক, দু’মাস পরে ইংল্যান্ডের হয়ে গোলও পেয়ে গেলেন। অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে করা দারুণ ভলি, এভারটনের বিপক্ষে হাফভলি আর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মৌসুমের শেষ ম্যাচে অসাধারণ ফ্রী-কিকঃ মৌসুম শেষে সুখস্মৃতির ঝুলিটা বেশ ভারীই লাগার কথা মেসন মাউন্টের। কিন্তু আসল মাউন্টকে চিনতে হলে প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকা অবস্থায় তাঁর দিকে চোখ রাখতে হবে। ক্ষিপ্রগতিতে যেভাবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ধাওয়া করে বেড়ান, সময়মতো “রান” নিয়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়া – মাউন্ট কোচদের জন্য স্বপ্নের খেলোয়াড়। দূরপাল্লার শট  কিংবা সেটপিস নেওয়ার দারুণ নৈপুণ্যের কারণে অনেকে ল্যাম্পার্ডের ছায়া খুঁজে পাবেন। কিন্তু দুনিয়াজোড়া লাখ লাখ চেলসি ভক্তের আশা, তিনি নতুন ল্যাম্পার্ড না হয়ে “মাউন্ট” হবেন।

 

চেলসিতে তরুণদের মধুচন্দ্রিমা শেষ। ট্রান্সফার ব্যান উঠে যাওয়ার পরপরই দলকে ঢেলে সাজাতে পয়সার ব্যাপারে কার্পণ্য করছেন আব্রামোভিচ। বিশ্বমানের প্রতিভাদের ভিড়ে এব্রাহাম, লফটাস-চীক, মাউন্টদেরকে টিকে থাকার জন্য জোর লড়াই করতে হবে। চেলসির তরুণদের সোনালি প্রজন্ম কি পারবে চ্যালেঞ্জটা সামাল দিতে? নাকি পূর্বসুরিদের মতোই সাফল্য সন্ধানের চাকায় পিষ্ট হবে তারা। সামনের মৌসুমে একাদশে জায়গা করে নিতে হলে কী করতে হবে – মেসন টনি মাউন্টকে যদি কেউ এই প্রশ্ন করে তবে সেটার উত্তর আমাদের সবারই জানা। লাজুক হেসে বলবেন, “পরিশ্রম, পরিশ্রম এবং আরো পরিশ্রম।"