X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

আদিয়োস, এল হেনেরাল!

পোস্টটি ৪৫১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
সাও পাওলোর করিন্থিয়ানস অ্যারেনায় ডিজিটাল ঘড়িতে তখন নির্ধারিত ৯০ মিনিট পূর্ণ হয়েছে। ডার্ক কাইটের রিভার্স পাসে আলতো করে ব্যাকহিল করলেন ওয়েসলি স্নাইডার। বল পেয়ে গেলেন আরিয়েন রবেন, বক্সে ঢুকে মওকামতো শট নেয়ার জন্য আরেকটা টাচ দিয়ে নিলেন। রবেনের বাঁ পায়ের বিষে অসংখ্যবার নীল হয়েছে প্রতিপক্ষ, পঞ্চাশ হাজার দর্শকের মধ্যে আকাশী-নীলে বুঁদ হওয়া সমর্থকেরা তখন নিশ্চয়ই প্রমাদ গুনেছিলেন। তবে রবেনের জোরালো শটে জাল স্ফীত হলো না, কারণ ডাচ স্বপ্নে বাগড়া দিতে সেখানে হাজির হাভিয়ের মাচেরানো। স্লাইডিং ট্যাকেলের টেক্সটবুক থেকে হুবহু তুলে আনা এক ট্যাকেলে রবেনের শট ঠেকিয়ে দিলেন। নিতম্বের পেশি ছিঁড়ে গেলো, কিন্তু তবুও আত্মনিবেদনের চূড়ান্ত দেখিয়ে সেদিন পুরো সময়টা মাঠে ছিলেন। দল সেদিন রোমেরো বীরত্বে শিরোপার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল, তবে আলবিসেলেস্তে সমর্থকেরা কিন্তু তাদের “মিডফিল্ড জেনারেল”এর সেই ট্যাকেলের মাহাত্ম্য ভোলেনি। মাচেরানো এর আগে-পরে বহুবার ফুটবল মাঠে নেমেছেন, শিরোপা উল্লাসে মেতে উঠেছেন, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ডুকরে কেঁদেছেন- তবে আজ অবসরের পর সেই মুহূর্তের ফ্রেমটাতেই যেন আটকে আছেন, ছিলেন, থাকবেন।
 
  • ১৯৮৪ জুন মাসের ৮ তারিখে পৃথিবীতে এসেছিলেন হাভিয়ের আলেহান্দ্রো মাচেরানো। বিশ্বজয়ী দলটার নাম তখন ইতালি, পাওলো রসি নামক এক লিকলিকে লোকের জাদুতে চার বছরের জন্য বিশ্বশাসন করার সুযোগ পেয়েছে আজ্জুরিরা। তবে দুই বছরের মধ্যেই সোনার ট্রফিটা নিজেদের করে নিলো আকাশী-নীলেরা। ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামধারী খর্বাকায় লোকটার ছোট্ট কাঁধদুটিতে চেপে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। অদৃষ্টে তাই লেখাই ছিল, মাচেরানো ফুটবলারই হবেন। ১৫ বছর বয়সে পরিবার আর সান লরেঞ্জোর চেনা জগত ছেড়ে বালক হাভিয়েরকে পাড়ি জমাতে হলো ২০০ মাইল দূরে রাজধানী বুয়েনোস আইরেসে। উদ্দেশ্য ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেটের যুবদলের হয়ে পেশাদার ফুটবলের অ-আ-ক-খ শেখা। রিভার প্লেটে দুই মৌসুম খেলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলে পাড়ি জমানো। কে জানতো সাও পাওলোর যে মাঠটিতে একসময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মাচেরানো, সেই মাঠেই আট বছর পরে ম্যাচ বাঁচানো ট্যাকেলটা করবেন ? এরপর ইউরোপে পাড়ি জমানো। তবে রেয়াল-বার্সা-লিভারপুল নয়, তরুণ মাচেরানোকে দলে টানলো কিনা ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড। আজ অবধি তেভেজ আর মাচেরানোর জোড়া ট্রান্সফার নিয়ে হাজারোটা প্রশ্ন আছে, আইনের ফোঁকর গলে কিন্তু ঠিকই মাঠে নেমেছিলেন এই দু’জন। তবে কোচ অ্যালান পারডিউয়ের কোচিংয়ের ধরণ বড্ড সেকেলে, খর্বাকায় মাচেরানোকে তাই দলে কিছুটা ব্রাত্যই হয়ে পড়েছিলেন। তবে রাফা বেনিতেজের জহুরি চোখ কিন্তু হীরে চিনতে ভুল করেনি। প্রথমে ধারে যাওয়ার পর শেষমেশ স্থায়ীভাবেই অ্যানফিল্ডের সদস্য হয়ে গেলেন “মাচে”।
000_dv108222
  • লিভারপুলে চার বছর ছিলেন মাচেরানো, উপভোগ করেছেন প্রতিটা মুহূর্ত। “ফ্যান ফেভারিট” হতে সময় লাগেনি মোটেও, “সেভেন নেশন্স আর্মি” এর সুরে তাঁকে নিয়ে গানও বেঁধে ফেলেছিল রেড সমর্থকেরা। জেরার্ড, জাবি আলন্সো আর মাচেরানোকে নিয়ে দারুণ এক মিডফিল্ড ত্রয়ী বানিয়েছিলেন বেনিতেজ। তবে শিরোপাভাগ্যটা নেহায়েত মন্দ ছিল, উত্তর ইংল্যান্ডে কিছুই জেতা হয়নি আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারের। শিরোপা জিততেই হয়তো কাতালোনিয়ায় আগমন, বার্সেলোনার জার্সি গায়ে চাপানোটা সম্ভবত মাচেরানোর জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত। প্রথমে নিজের পছন্দের পজিশন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও কিংবদন্তি কার্লেস পুয়োলের বিদায়ের পর পুরোদস্তুর সেন্টারব্যাক বনে গেলেন তিনি। উচ্চতার কমতি ছিল, কিন্তু খেলা পড়ার অতুলনীয় দক্ষতা আর বল কাড়ার ক্ষমতা নিয়ে সেই অভাব পুষিয়ে দিয়েছিলেন। আর ট্যাকলিং আর দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা তো বোধহয় জন্ম থেকেই পেয়েছিলেন। দু’বার ইউরোপিয়ান কাপ আর পাঁচবার লা লিগা ও কোপা দেল রেসহ ছোট বড় অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন, বার্সেলোনাও তাঁকে দলে টানতে যে ২৪ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছিল সেই টাকাটা যে উসুল হয়েছিল সেটা বলাই বাহুল্য। ব্লাউগারানা সমর্থকদের হৃদয়ের খুব কাছেই ছিল মাচেরানোর স্থান, আবেগঘন এক অনুষ্ঠানে ন্যু ক্ল্যাম্পকে বিদায় জানিয়েছিলেন তিনি। এর চীনে হেবেই চায়না ফরচুনের হয়ে দুই মৌসুম খেলার পর নাড়ির টানে জন্মভূমিতে ফেরা। এস্তুদিয়ান্তেসের হয়ে ১১ বার মাঠে নামার পর বুটজোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
136060097.jpg.0
  • আর্জেন্টিনার মতো সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্যের দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচের রেকর্ডটা জানিয়ে দেয় আকাশী-নীলদের জন্য মাচেরানো কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রজন্মের অন্যদের মতোই মাচেরানোর কাছে আন্তর্জাতিক ফুটবল দীর্ঘশ্বাসের অন্য নাম। চারবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে উঠেছেন, শিরোপা জেতার সৌভাগ্য হয়নি। শেষ দু’বার তো পেনাল্টি নামের লটারিতে চিলির কাছে হেরে গেলেন। তবে মাচেরানোকে গোটা ফুটবল বিশ্ব অবাক হয়ে দেখলো ২০১৪ বিশ্বকাপে। দলের মহাতারকা মেসি হলেও অনেকের মতেই দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন এই হাভিয়ের মাচেরানোই। সবচেয়ে বেশি ট্যাকেল জিতেছেলেন টুর্নামেন্টে (৩০), পাসের তালিকায়ও তাঁর নাম ছিল তৃতীয় স্থানে (৫৭৬)। “ডেস্ট্রয়ার” হিসেবে প্রতিপক্ষের রক্ষণ দানা বাঁধার আগেই গুঁড়িয়ে দিতেন, মাঝমাঠকে শাসন করতেন দক্ষ জেনারেলের মতোই। সেমিফাইনালের সেই মহারণেও মাথায় জোরেসোরে আঘাত পেয়েছিলেন, তবে “কনকাশন’এর চোখরাঙ্গানিকে উপেক্ষা করেই পুরো সময়টা খেলে গেছেন। মাচেরনো এমনই, “জয়” নামক শব্দটার জন্য সবর্স্ব বিলিয়ে দিতেও তাঁর আপত্তি নেই। অনেক “যদি”, “কিন্তু” আফসোসের জন্ম দেয়া ফাইনালে জার্মান “মেশিন” এর জন্য হাতছোঁয়া দূরত্বে থেকেও সোনার কাপটা উঁচিয়ে ধরা হলো না। বরফের দেশ রাশিয়াতে পরের বিশ্বকাপেও গেছিলেন, দ্বিতীয় রাউন্ডে স্নায়ুক্ষয়ী এক ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে যাওয়া ম্যাচটাই বিখ্যাত আকাশী-সাদায় মাচেরানোর শেষ ম্যাচ হয়ে থাকবে।

argentinas-javier-mascherano-makes-a-tackle-on-netherlands-forward-arjen-robben

 
এখন থেকে আর সকালে উঠে অনুশীলন মাঠে দৌড়াতে হবে না, নিজেকে ফিট রাখতে জিমে ঝরাতে হবে না ঘাম, নিজের পছন্দের খাবারগুলোও ইচ্ছেমত চেখে দেখতে পারবেন। পথের শেষে পেছন ফিরে তাকালে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসেবে এক আশ্চর্য সাম্যাবস্থা। ক্লাব পর্যায়ে সবকিছু জিতেছেন, জাতীয় দলের অপূর্ণতার ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার জন্য অলিম্পিক মেডেল দুটো যথেষ্ট হওয়ার কথা না। ক্ষুদে নেতার (স্প্যানিশ ভাষায় “এল হেফেসিতো”) বর্ণিল ক্যারিয়ারের বাঁকে বাঁকে তাই পাওয়া-না পাওয়া যেন হাত ধরাধরি করে আছে। বলার মতো কত গল্পই না জমেছে, কিন্তু আজ আর তাড়া নেই। অদূর ভবিষ্যতে আকাশী-নীলের কোনো এক কাপ্তান না হয়ে স্বর্ণালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরুক। হাভিয়ের আলেহান্দ্রো মাচেরানো সেদিন পাগলের মতো উল্লাস করবেন, দু’গাল বেয়ে অঝোর ধারায় নামবে অশ্রু, সেই অশ্রু কষ্টের নয়, স্বস্তির। অস্ফুটে হয়তো বলে উঠবেন, “ওরা পেরেছে।"