• ক্রিকেট

ইংল্যান্ডের রোটেশন পলিসি

পোস্টটি ৫৩৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

              রোটেশন কথাটা শুনলেই হয়তো আপনাদের প্রথমে ফুটবল নিয়েই মাথা কাজ করবে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের এই সময়টাতে যেখানে লীগের প্রতিটি ম্যাচ শিরোপানির্ধারণী হয়ে দাঁড়ায়, চ্যাম্পিয়নস লীগের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো এগিয়ে আসতে থাকে এবং জাতীয় দলের হয়েও অধিকাংশ ফুটবলারের তিন-চারটা ম্যাচ খেলতে হয়। এ অবস্থায় এত জটলাবাঁধা ফিক্সচারের গ্যাঁড়াকলে পড়ে প্লেয়ারদের যেন কোনো ইঞ্জুরি না হয় অথবা তারা যাতে বেশি অবসাদগ্রস্ত হয়ে না পড়ে এই জন্য তাদেরকে কয়েক ম্যাচ পর পর এক ম্যাচ না খেলিয়ে অথবা পুরো নব্বই মিনিট শেষ হবার আগেই মাঠ থেকে উঠিয়ে নিয়ে তাদের বিশ্রাম দেবার ব্যবস্থা করেন বেশিরভাগ কোচ। এটাকেই প্রচলিতভাবে রোটেশন পলিসি বলে। এবং বর্তমান সময়ে যেখানে বড় দলগুলোকে পঞ্চাশের উপরে ম্যাচ খেলতে হয় তাদের জন্য এটা খুবই স্বাভাবিক এবং প্রচলিত একটি সিস্টেম।

                এখন ফুটবলে না হয় এরকমটা করা যায়। যেহেতু সেখানে সাবস্টিটিউশন সম্ভব এবং অনেক বেশি ম্যাচ খেলে একটা দল এক বছরে। কিন্তু ক্রিকেটে এটা করা যায় কেউ ভাবতে পারত না। অন্তত এতদিন পারত না। কিন্তু সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা এবং ভারত সফরকে সামনে রেখে যেখানে তাদেরকে চার মাসের মত এই উপমহাদেশে কাটাতে হচ্ছে, ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড প্লেয়ারদের এই অবসাদ থেকে দূরে রাখতে রোটেশন পলিসি প্রয়োগ করে। ইংল্যান্ড আগেও তাদের হাতে বিকল্প ক্রিকেটারদের ঝালিয়ে দেখতে কিছু প্লেয়াদের নাড়িয়ে চাড়িয়ে একাদশ সাজাত সাদা বলের ক্রিকেটে। কিন্তু এবার তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আঙ্গিকে এবং প্রথমবারের মত লাল বলের ক্রিকেটেও সে পদ্ধতি নিয়ে এগিয়ে চলে। ইংল্যান্ড এর সাফল্যও পায় আবার মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখতে পায়। কিন্তু তাদের এই পরিকল্পনার প্রশংসা ভক্ত থেকে ক্রিকেটবোদ্ধা সবারই প্রশংসা না কুড়িয়ে পারে নি।

                করোনার আক্রমণের পর থেকে সবকিছুতেই কিছু বাধা চলে আসে। প্রত্যেক সফরকারী দলকে বাধ্যতামূলকভাবে ৭-১৪ দিন প্রথমে কোয়ারেন্টিনের মধ্যে থাকতে হয়। এরপর তাদেরকে একটি বায়ো সিকিউর বাবলের মাঝখানে বন্দী করে দেওয়া হয়। যেখানে না কেউ বাইরে থেকে আসতে পারে, না কেউ এই বাবল থেকে বাইরে বের হতে পারে। দীর্ঘদিন এভাবে এক জায়গাতে আটকে থেকে কতটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে সবাই তা এখন সবাই বুঝতে পারছে মোটামুটি। এখন এখান থেকে চোখ সরিয়ে ইংল্যান্ডের এই বছরের ফিক্সচারগুলোর দিকে তাকাই।

                ইংল্যান্ডের এই বছরের প্রথম দুটো সিরিজ ছিল অ্যাওয়ে। প্রথমটি শ্রীলঙ্কাতে দুটো টেস্ট এবং পরেরটি ভারতে চার টেস্ট, পাঁচ টি-টুয়েন্টি এবং তিন ওয়ানডের পূর্ণাঙ্গ সিরিজ। প্রতিটি অ্যাওয়ে সিরিজের আগে দলগুলোকে প্রায় এক মাস আগে দেশের মাটি ছাড়তে হয় কোভিড রেস্ট্রিকশনস গুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। আর কাছাকাছি সময়ে ও পাশাপাশি দুটো দেশে সিরিজ হওয়াতে ইংলিশ খেলোয়াড়েরা আর দেশে ফিরে যায় নি। তো শুধুমাত্র এই দুই সিরিজ মিলিয়েই তাদেরকে প্রায় সাড়ে তিন মাসের মতো দেশের ও প্রিয়জনদের থেকে দূরে কাটাতে হয় এবং সাত টেস্ট, তিন ওয়ানডে ও পাঁচ টি-টুয়েন্টি মিলিয়ে মোট বারোটি ম্যাচ খেলতে হবে। এর বাইরে যদি ধরি তাহলে ইংল্যান্ডের এ বছর মোট সতের টেস্ট, ১৬ ওয়ানডে এবং অন্তত বিশটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে হবে। যদি কোভিড পরবর্তী সময় থেকে শ্রীলঙ্কা সফরের সময়টুকু বিবেচনা করি তাহলে সেখানেও তাদের ব্যস্ত সময় কাটে যেখানে তারা জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৬ টেস্ট, ছয় ওয়ানডে ও নয়টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে। আবার ইংল্যান্ড দলের অনেক প্লেয়ারই গত বছর আইপিএল খেলে আরব আমিরাতে এবং এ বছরও আইপিএলে অনেকেই খেলবে। জানি আমার মত অনেকেই হয়তো এটুকু পড়েই ক্লান্ত হয়ে গেছেন। তাহলে খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক ধকলটা কল্পনা করুন। এই ধকল টেনে খেলোয়াড়েরা কতটুকু সেরাটা নিজেদের দিতে পারত তা নিয়ে সন্দেহ থাকেই। আর এই সন্দেহ মাথায় রেখেই ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড একটা পরিকল্পনা করে।

                ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফরের ছয়টি টেস্টকে তারা তিনটি ব্লকে ভাগ করে। শ্রীলঙ্কার সাথে দুই টেস্ট, ভারতের সাথে প্রথম দুই টেস্ট ও আহমেদাবাদে শেষ দুই টেস্ট। এই প্রতি ব্লকেই তারা কিছু কিছু প্লেয়ারকে বিশ্রাম দেয়। বিশ্রাম পাওয়ার ক্ষেত্রে আগে প্রাধান্য পায় যারা ইংল্যান্ডের হয়ে তিন ফরম্যাটেই খেলে থাকে তারাই। যার কারণে প্রথম ব্লকে অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার সাথে দুই টেস্টে বিশ্রাম পান বেন স্টোকস ও জফরা আর্চার। দ্বিতীয় ব্লকে এই বিশ্রাম লাভ করেন জনি বেয়ারস্টো, স্যাম কার‍্যান আর মার্ক উড। এদের জায়গা নেন বেন স্টোকস, ওলি পোপ আর জফরা আর্চার। ওপেনার জ্যাক ক্রলিকেও বিশ্রাম দিয়ে ররি বার্নসকে এই দুই টেস্ট খেলানো হয়। আবার পরের দুই টেস্টে বার্নসের জায়গা নেন ক্রলি । আবার জফরা আর্চারকে দ্বিতীয় ও চতুর্থ টেস্টে খেলানো হয়নি। মঈন আলিকে শুধু দ্বিতীয় টেস্ট খেলিয়েই ছুটি দেওয়া হয় এবং তিনি দেশে ফিরে যান। আবার উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে এই ছয় টেস্টের প্রথম তিনটি খেলেন বাটলার এবং শেষের তিনটি ফোকস। এবং সবচেয়ে মজার যে ব্যাপারটা ছিল যে এই ছয় টেস্টের মাঝে শুধু একটা টেস্টেই ইংলিশ বোলিংয়ের দুই অভিজ্ঞ সেনাপতি স্টুয়ার্ট ব্রড ও জিমি অ্যান্ডারসন একসাথে খেলে। আহমেদাবাদের তৃতীয় টেস্টটিতে। যদিও এটা নতুন কিছু না। বয়সের কারণে শরীর আর আগের মত সায় না দেওয়ায় এবং বর্তমান প্রজন্মের দুইজন শ্রেষ্ঠ টেস্ট বোলারকে একসাথে না খেলানোর বিলাসিতা দেখাতে বেশি রাজি না হওয়ায় তাদের দুইজনকে এভাবেই বিশ্রাম দিয়ে খেলানো হয়। যার কারণে গত দুই বছরে আটাশ টেস্টে মাত্র দশটাতে দুইজনকে একসাথে পাওয়া যায়। তো ভারতের বিপক্ষে চারটি টেস্টেই খেলে মাত্র পাঁচজন। যদি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্ট ধরি তাহলে ছয়টি টেস্টই খেলে মোটে তিনজন। ডম সিবলি, জো রুট এবং জ্যাক লিচ।

                       এমন কিন্তু না যে তারা শুধু লাল বল ক্রিকেটের কথা মাথায় রেখেই এই কাজটা করছে। সাদা বলের ক্রিকেটও তাদের খুব ভালোভাবেই মাথায় আছে। এই বছর ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তাই ভারতের সাথে পাঁচ টি-টোয়েন্টি, তিন ওয়ানডে এবং আইপিএল কোনোটাই তাদের সাদা বলের নিয়মিত খেলোয়াড়দের বাদ দেওয়া যাবে না। যাতে তাদের একদম সেরা প্রস্তুতি তারা নিতে পারে। এজন্যই আর্চারকে মাত্র দুই টেস্ট খেলানো, উড ও কার‍্যানকে ভারতের সাথে টেস্টে না খেলানো এবং স্টোকস ও বেয়ারস্টোকে এভাবে বিশ্রাম দেওয়া। আবার রুট তাদের টি-টোয়েন্টি দলের অংশ নয় বলেই শুধুমাত্র তাকে ছয়টি টেস্টেই খেলানো হয়। তার জন্য বরাদ্দ বিশ্রামটুকু ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতেই দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবং যেভাবে চলছে তাতে যদি মে মাসে ঘরের মাঠের দুই টেস্টে নিউজিল্যান্ডের সাথে স্টোকস ও বেয়ারস্টো দুইজনই না খেলে তাতেও অবাক হবার থাকবে না কিছুই।

                      এখন এতে তাদের লাভ ও ক্ষতি দুটোই হচ্ছে। ড্যান লরেন্স, ওলি পোপ বেন ফোক্সের মত খেলোয়াড় এসে তাদের স্কোয়াড ডেপথ বাড়াচ্ছে আবার মুদ্রার উল্টো পিঠে বেয়ারস্টো শ্রীলঙ্কাতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ভারতের বিপক্ষে খেই হারিয়ে ফেলে মোমেন্টামটা নষ্ট হবার জন্য। আশঙ্কা করা হচ্ছে যার শিকার হয়তো তিনিই একমাত্র হবেন না। কিন্তু তাদের প্রধান নির্বাচক এড স্মিথের ভাষ্যমতে সফরগুলোকে 'মডার্নাইজ' করার তাগিদে ইংল্যান্ড যে একটা নতুন যুগেরই সূচনা করতে চলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।