• বাংলাদেশ-আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ
  • " />

     

    'নির্লিপ্ত' আফিফ 'উল্লসিত' দর্শকদের চাহিদাই তো মেটালেন?

    ‘আফিফ, আফিফ’-- মিরপুরের দর্শকরা কোরাস ধরেছে। 

    মিরপুর বা উপমহাদেশের দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দুই রকমের-- উল্লাস অথবা নিস্তব্ধতা। দুয়োর বালাই নেই, এতো এতো ফেস্টুন, ড্রেস-আপ, ব্যানারের সুযোগ নেই। কন্ঠস্বরের কম্পাঙ্কের উঠানামায় পরিস্থিতি বুঝানোর জটিলতা নেই। হয়তো চিৎকার করো, অথবা চুপটি মেরে বসে থাকো মাথায় হাত দিয়ে। 

    বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার ধসে যাওয়ার নিস্তব্ধতা চিড়ে আফিফ-মোসাদ্দেকের ব্যাটিংয়ে সেই উল্লাস ভাসছে তখন। হয়তো তারা বুঝতে পেরেছেন, তারা যা চান, আফিফ এদিন তাদেরকে সেটা দিতে পারবেন। অথবা নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে ভাল লাগছে না আর তাদের, একটু চিৎকারের উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন আফিফ। ইনিংসের শুরুতেই যেমন একটা সিঙ্গেলেও চিৎকার করেন তারা।

    তখনও ম্যাচটা এদিক-ওদিক করছে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের মাঝে। ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনছেন এতো মানুষের চিৎকার, তাও তার নাম ধরে। তার স্বপ্ন ছিল এমন, বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতাবেন। সব ক্রিকেটারেরই হয়তো থাকে। 

    আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকটা আরও বছর দেড়েক আগেই হয়ে গেছে তার। সেবার ব্যাটিংয়ে আক্ষরিক অর্থেই কিছু করতে পারেননি। মিরপুরের এই ইনিংসটাকে তাই তার নতুন করে শুরু বলার চেষ্টা করা যায়। আফিফ অবশ্য নির্লিপ্ত। সেসব মানতে রাজি নন, দেড় বছর আগেই তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরু হয়ে গেছে। আফিফ নির্লিপ্ত থাকলেন ম্যাচশেষের সংবাদ সম্মেলনের পুরোটা জুড়েই প্রায়! 

     

     

    “মানসিকভাবে প্রস্তুতি বলতে, আমি বাদ পড়েছি সেটা দেখার বিষয় না। যেখানে সুযোগ পেয়েছি আমার সেরাটা খেলার চেষ্টা করছি। প্রস্তুতি বলতে- এইচপি, 'এ' দলে যখন সুযোগ পেয়েছি খেলার চেষ্টা করেছি”, মাঝের সময়টাকে এ কয়টা কথায় ব্যাখ্যা করে দিলেন এই বাঁহাতি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে দলের নেওয়া পরিকল্পনাতেই হয়তো সে সুযোগটা পেলেন তিনি। নামলেন আট নম্বরে। যে সময় হয়তো আপনি আশা ছেড়ে দেন। মিরপুরের দর্শকরা আশা ছেড়ে দেন। 
     


    মাদজিভার বলটা স্লটে পেয়ে গেলেন আফিফ। তার মুখোমুখি হওয়া প্রথম বল। ‘ক্লিন-হিট’, যে হিটে আত্মবিশ্বাস মিশে থাকে। “অবশ্যই মোমেন্টাম ঘুরিয়ে দিয়েছে। ওরা (বৃত্তের ভেতর কম ফিল্ডার রেখে) আক্রমণের চেষ্টা করেছে। আমি বলটা বুঝতে পেরে মারতে পেরেছি”, নিজের প্রথম শট নিয়ে আফিফের চিন্তা-ভাবনা। 

    ব্যাটিংয়ের আগে থেকেই ভাবনা ছিল, খেলবেন নিজের মতো করে। পরিস্থিতি বুঝে। প্রায় সবাই তো সেটি চান! আফিফ এদিন সেটা করতে পারলেন। মোসাদ্দেক ও তিনি মিলে টেনে তুললেন বাংলাদেশকে। শেষ ১৮ বলে প্রয়োজন ছিল ২৮ রান। দুজন জানতেন, রান-বলের ব্যবধান খুব বেশি নয়, “বলের চেয়ে খুব বেশি রান লাগে না। দুই-তিনটা বাউন্ডারি হলেই রান-বল সমান হবে।” 

    কাইল জারভিসের হোল্ড করা বলটার জন্য এরপর অপেক্ষা করে থাকলেন। খেললেন র‍্যাম্প শট। পরের বলে করলেন স্কুপ। বিহাইন্ড দ্য স্কয়ারে পরপর দুই বলে দুই বিপরীতমুখি জায়গা ঠিক করে সফল হলেন আফিফ। “তখন ফিল্ড সেট-আপ দেখে মনে হচ্ছিল, এখানে বোলিং করতে পারে। ফিফটি ফিফটি ছিল। ভাগ্য পক্ষে এসেছে, সেখানেই বল করেছে।” 

    এর আগেই তিনি খেলেছেন দাপুটে কাভার ড্রাইভ। কাট করেছেন। তুলে মেরেছেন। মেরেছেন ৮টি চার, ১টি ছয়ের সঙ্গে। ফিফটির পর মোসাদ্দেক মাথায় হাত দিয়ে অভিনন্দন জানালেন তাকে, তিনি তখন ব্যস্ত পানি আনতে বলায়। দ্বাদশ ব্যক্তি এসে তোয়ালেটা দিয়ে মুখ মুছে দিতে চাইলেন, একটু পর সেটা তুলে নিলেন নিজের হাতেই। আফিফ নির্লিপ্ত। ফিফটি হয়েছে, সেটা জানতেন না ঠিক নাকি তখন। তবে উদযাপন করতে চেয়েছিলেন একেবারে ম্যাচ জিতিয়ে, যেটি স্বপ্ন ছিল তার। পারেননি। ৩ রান বাকি থাকতে আউট হয়ে ফিরেছেন।

    এ ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলতে আসারই কথা ছিল না আইসিসির সদস্যপদ আপাতত হারিয়ে ফেলা জিম্বাবুয়ের। তাদের সঙ্গে এ ম্যাচের জয়ে তাই হয়তো আফগানিস্তান টেস্টে হারের ক্ষত শুকিয়ে যাবে না বাংলাদেশের। বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামোর সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে না আফিফের ব্যাটিংয়ে।  

    তবে রোদ-বৃষ্টিতে জ্বলে-ভিজে লাইনে দাঁড়িয়ে, অথবা হয়তো চড়া মূল্যে অন্যের কাছ থেকে টিকেট কেটে এসে, বৃষ্টি-বাগড়া, ফ্লাড-লাইট বিড়ম্বনা সহ্য করে থেকে, নিজের মোবাইল ফোনের ফ্লাশ-লাইট জ্বালিয়ে থাকা দর্শকরা এদিন আফিফের ইনিংসে হয়তো সেটিই পেলেন, যা তারা চান এতকিছুর পর। 

    সে কারণেই হয়তো, ম্যাচশেষের পরও কানে ভেসে আসে স্টেডিয়াম থেকে বের হতে যাওয়া মানুষের সারি থেকে কোরাস-- ‘আফিফ। আফিফ!”