• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    ম্যান ইউনাইটেডের বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা কতোখানি?

    বাফুফে ভবনে মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ সংবাদকর্মীদের ভীড় দেখলে মনে হতে পারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবটিই হয় চলে এসেছে বাংলাদেশে। আসার সম্ভাবনাতেই যে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে তাতে ইউনাইটেড শেষ পর্যন্ত ঢাকার মাঠে ইউনাইটেড খেলতে এলে সেটা উন্মাদনার পর্যায়ে চলে যাবে। বাংলাদেশে ম্যান ইউনাইটেডের আসার ব্যাপারটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। 

    আজ ২৬ নভেম্বর, ইউনাইটেডের চারজনের একটি পরিদর্শক দল ঘুরে গেছেন ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। নিরাপত্তাব্যবস্থা, হোটেলসহ বাকি বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করে গেছেন তারা। সব কিছুর বিচারে ইউনাইটেডের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা কতোটুকু?

    প্রথম সমস্যা মাঠ নিয়ে...  
    ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বাফুফে ভবনে বৈঠক শেষে চার সদস্যের ইউনাইটেড অফিসিয়ালরা ঘুরে গেছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। প্রথমে তারা দেখেছেন মাঠের অবস্থা, এর পর ড্রেসিংরুম, গ্যালারি সবকিছুই পর্যবেক্ষেণ করেছেন। ইউনাইটেডের পক্ষ থেকে কেউ অবশ্য সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটির সঙ্গে যুক্ত সাবেক ফুটবলার আব্দুল গাফফার জানিয়েছেন মাঠের অবস্থা মনঃপুত হয়নি ইউনাইটেডের প্রতিনিধি দলের।

    "মাঠ দেখে মনে হলো তাদের খুব একটা পছন্দ হয়নি। তারা বলেছে তোমাদের মাঠে পাঁচ ধরনের ঘাস, জিজ্ঞেস করেছে এমন কেন?"- জানিয়েছেন আব্দুল গাফফার। প্রতিনিধি দলকে অবশ্য  তারা আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে আগামী বছর জুন-জুলাইয়ে মাঠের অবস্থার উন্নতি হবে, সে কথাও জানিয়েছেন তিনি। 

    নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষকে হয়ত রাজি করাতে পারলেও মাঠের অবস্থা বড় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দিচ্ছে। তার ওপর ম্যাচটির সম্ভাব্য দিন-তারিখ জুলাই মাসের ২৩ ও ৩০। বাংলাদেশে তখন বর্ষাকাল। গত অক্টোবরে বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ বাছাইয়ের ম্যাচ শেষে কাতার কোচ ফেলিক্স সানচেজ ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সবার আগে বলেছিলেন মাঠের অবস্থার কথা। খেলোয়াড়দের এমন মাঠে খেলেও ইনজুরি হয়নি- সে কথা বলতে বলতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন সানচেজ। তারও আগে এবছরই ভুটান কোচও সমালোচনা করে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠের।

    ঘাসের মান নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই, মাঠ আবার পুরোপুরি সমানও নয়। জায়গায় জায়গায় ছোট-বড় গর্তও আছে। ড্রেসিং রুম-ডাগ আউট এসব রাতারাতি বদলে ফেলা গেলেও মাঠের মান বদলানো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কথা বাদ দিন, এমন মাঠে কে খেলতে চাইবে?

    অবশ্য প্রাক-মৌসুমে বদখত পিচে খেলার অভ্যাস এরই মধ্যে করে ফেলেছে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো। আবহাওয়া থেকে শুরু করে মাঠের অবস্থা- সবকিছু নিয়েই এর আগে অভিযোগ জানিয়েছেন প্রাক মৌসুমে এশিয়ায় খেলসে আসা প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর কোচরা। ২০১৭ সালে বেইজিংয়ে অবশ্য পিচের কারণেই ম্যানচেস্টার ডার্বি পরিত্যক্ত হয়েছিল। হোসে মরিনহোও কড়া সমালোচনা করেছিলেন বেইজিংয়ের মাঠ নিয়ে।  

    কোচরা বিপক্ষে থাকলেও ক্লাবগুলোর কমার্শিয়াল ম্যানেজাররা এই বিতর্কে জিতে যাচ্ছেন। তাদের কথা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের চড়া বেতন চালু রাখতে হলে প্রাক-মৌসুমে প্রীতি ম্যাচ খেলে অর্থ উপার্জনের বিকল্প নেই।     

    বাংলাদেশে কেন আসতে চায় ইউনাইটেড? 
    প্রাক-মৌসুমে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর এশিয়া ভ্রমণ নতুন কিছু নয়। যে কারণে সিঙ্গাপুর, চীন খেলতে যাওয়া, সে কারণেই বাংলাদেশকে সম্ভাব্য তালিকায় রাখা। ক্লাবগুলোর মূলত লক্ষ্য থাকে দুইটি, বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া ও নতুন পরিবেশে খেলোয়াড়দের নতুন মৌসুমের জন্য প্রস্তুত করা। সঙ্গে প্রচারণা ও বিপণনের চিন্তা তো থাকেই। 

    এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতেই পারে ইউনাইটেড। লা লিগা এরই মধ্যে বাংলাদেশের জন্য আলাদা বিপণন পরিকল্পনা সাজিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। ক্রিকেট গ্যালারি যতই উপচে পড়ুক আর ফুটবল মাঠ যতই ফাঁকা যাক- বাংলাদেশে ইউরোপিয়ান ফুটবলের কদর গত দশ বছরে বেড়েছে বহুগুণ।  এর আগে ২০১১ সালে টেলিকম সংস্থা এয়ারটেলের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ঘুরে গিয়েছিলেন ইউনাইটেডের সাবেক দুই কিংবদন্তী ফুটবলার ব্রায়ান রবসন ও ডুয়েট ইয়র্ক। ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের বাজার ধরতে চাইবে যে কোনো দলই। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খেললেও দক্ষিণ এশিয়ায় এর আগে কখনোই খেলা হয়নি ইউনাইটেডের। ব্যবসার দিক দিয়ে চিন্তা করলে ইউনাইটেডের জন্য সবচেয়ে বড় বাজার ভারতে, এর পরই বাংলাদেশ।   

    ২৮ কোটি টাকা? 
    ইউনাইটেডের দাবি-দাওয়ার কথা অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। ইউনাইটেডকে বাংলাদেশে আনার ব্যপারে অন্তর শোবিজ ও সিএমজি একসঙ্গে কাজ করছে। এর আগেও ঢাকায় আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়ার ম্যাচটি আয়োজন করেছিল এই দুইটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। অন্তর শোবিজের স্বপন চৌধুরী জানিয়েছেন আপাতত ৩ মিলিয়ন ইউরো চেয়েছে ইউনাইটেড। বাংলাদেশী টাকায় যেটা ২৮ কোটি টাকা।

    ইউনাইটেডের প্রতিনিধি দল ইংল্যান্ড ফিরে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও চাহিদা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। আব্দুল গাফফার বলছেন তাদের পক্ষে থেকেও দরদাম করার পর ব্যাটে-বলে হলেই কেবল পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়ার ম্যাচ আয়োজনে খরচ হয়েছিল ৩০ কোটি টাকা। ইউনাইটেডের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম হচ্ছে তারা ম্যাচটি খেলবে বিপিএল এর সেরা একাদশের বিপক্ষে। ৩০ কোটি টাকার একটি অংশ দিতে হয়েছিল নাইজেরিয়াকেও, এক্ষেত্রে প্রায় পুরো টাকাটাই দাবি করছে ইউনাইটেড। অর্থের পরিমাণটা বেশি শোনালেও ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর চাহিদার অঙ্কটা এমনই।  

    বাংলাদেশের লক্ষ্য কী? 
    আগামী বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে বিশেষ আয়োজনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও। এর আগেও বছরের শুরুর দিকে ঢাকায় ইতালি-জার্মানি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের একটি গুজব শোনা গিয়েছিল। সবশেষ গত মাসে আর্জেন্টিনার আরও একবার প্রীতি ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশে আসার কথাও বেশ ফলাও করে প্রচার হয়েছিল। তবে এবার ইউনাইটেডকে আনার ক্ষেত্রে তোড়জোড় দেখা গেল- ব্যাপারটা তাই শুধু আর গুজব নয়।

    বাফুফে না যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়- কারা প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে সেটা অবশ্য নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে দুই পক্ষই ইউনাইটেডকে আনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করে বিদেশী দলকে দেশের মাঠে খেলিয়ে কী উপকার হবে- সে বিতর্ক আলাদা প্রসঙ্গ। তবে মুজিবশতবার্ষিকীতে দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে ইউনাইটেডের ম্যাচটি- সেটা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। 

    ইউনাইটেডের বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা কতোখানি? 
    আপাতত পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। কিছুই নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই, আবার একেবারে উড়িয়েও দেওয়ার উপায় নেই।