• টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ
  • " />

     

    তীরে এসে তরী ডোবার সেই চেনা গল্পের চক্রে বাংলাদেশের পরাজয়

    তীরে এসে তরী ডোবার সেই চেনা গল্পের চক্রে বাংলাদেশের পরাজয়    

    গ্রুপ পর্ব, নিউ ইয়র্ক (টস - দক্ষিণ আফ্রিকা/ব্যাটিং)
    দক্ষিণ আফ্রিকা - ১১৩/৬, ২০ ওভার (ক্লাসেন ৪৬, মিলার ২৯, ডি কক ১৮, তানজিম সাকিব ৩/১৮, তাসকিন ২/১৯, রিশাদ ১/৩২)
    বাংলাদেশ - ১০৯/৭, ২০ ওভার (হৃদয় ৩৭, মাহমুদউল্লাহ ২০, শান্ত ১৪, মহারাজ ৩/২৭, নরকিয়া ২/১৭, রাবাদা ২/১৯)
    ফলাফল - দক্ষিণ আফ্রিকা ৪ রানে জয়ী


    নাসাউ কাউন্টির ব্যবহৃত পিচে লো-স্কোরিং থ্রিলার হতে যাচ্ছে তা অনুমিতই ছিল। তবে ম্যাচের অধিকাংশ সময় ম্যাচ নিজেদের হাতের মুঠোয় রেখেও শেষ মুহূর্তে এসে স্নায়ু ধরে রাখতে পারল না বাংলাদেশ। আম্পায়ারদের শূলে চড়ানো যেতে পারে কয়েকটি সিদ্ধান্তের জন্য; তবে দিন শেষে বাংলাদেশি ব্যাটারদের ম্যাচের পরিস্থিতির হিসেব করতে ব্যর্থ হওয়া, শেষ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়কের দুটো গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচই ডুবিয়েছে বাংলাদেশকে।

    ১১৪ রানের লক্ষ্যে কাগিসো রাবাদার বিপক্ষে দুই চারে সাহসী শুরু করলেও ওই ওভারেই থামেন বলপ্রতি ৯ রান করা তানজিদ হাসান তামিম। এদিন ওপেন করতে নামা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে লিটন পাওয়ারপ্লেটা পার করে দেন রয়েসয়েই। তবে ২৯ রানের সেই পাওয়ারপ্লের পরের বলেই মহারাজকে জায়গা বানিয়ে এক্সট্রা কাভার দিয়ে মারতে গিয়ে সহজ ক্যাচ তুলে দিয়ে ১২ বলে ৯ রানে থামেন। আক্রমণে এসে এরপর প্রায় একাই বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেন আনরিখ নরকিয়া। একে তো পিচে বাউন্সের তারতম্য আছেই, সেই সাথে নরকিয়ার খুনে পেস - দুইয়ের মিশেলে দেওয়া তার দুই বাউন্সারেই কাবু সাকিব আল হাসান ও শান্ত। ৪ বলে ৩ রানে সাকিব ফেরার পর ধীর লয়ে এগুতে থাকা শান্ত একই ফাঁদে পড়ে থামেন ২৩ বলে ১৪ রানে।

    তবে এরপর উইকেটে এসেই হৃদয় যেন আগের দিনের পুনরাবৃত্তি করবেন বলেই মনে হচ্ছিল। সাথে মাহমুদউল্লাহও খেলছিলেন ঠাণ্ডা মাথায়। ৭-১০ ওভারের মধ্যে জেদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা কোনো উইকেট না হারিয়ে স্পিনারদের ওপর চড়াও হয়েছিল, সেই জায়গাটাতেই নরকিয়ার বদৌলতে ২৬ রান তুলতেই ৩ উইকেট খুইয়ে বসেছিল বাংলাদেশ। পরে অবশ্য মহারাজকে পেয়ে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে দারুণ ছয়ে হৃদয় নিজের খেলার প্রয়াসটা জানিয়ে দেন। পনেরো ওভার পর্যন্তই শক্তভাবেই ম্যাচে বাংলাদেশ, ওই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে দুই রান পিছিয়ে থাকলেও উইকেটে হৃদয়-মাহমুদউল্লাহ থাকায় ম্যাচে জয়ের পাল্লাটা হয়ত তাদের দিকেই হেলে ছিল।

    তবে এরপর আম্পায়ারের এক ভুল সিদ্ধান্তের মাশুলটা হয়ত দিতে হয় বাংলাদেশকে ম্যাচ হেরে। এর আগে ইয়ানসেনের একটি পরিস্কার ওয়াইড দেওয়া হয়নি, মাহমুদউল্লাহর মাথার পাশ দিয়ে যাওয়া একটা বলও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তে দেওয়া হয়নি ওয়াইড। তবে বার্টমানের বলে এবার খোলা চোখেই লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বলে আম্পায়ার এলবিডব্লিউ দিয়ে বসলেন, সেই যাত্রায় বলটা বাউন্ডারির দড়ি ছুঁলেও এই সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যোগ হয়নি কোনো রান। রাবাদার করা ১৮-তম ওভারে হৃদয়কে আম্পায়ার যে এলবিডব্লিউ দিলেন সেটা নিয়েও উঠতে পারে প্রশ্ন; তবে আম্পায়ারস কল দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে গেলে ৩৪ বলে ৩৭ রান শেষে থামতে হয় হৃদয়কে। বার্টমানের পরের ওভার শেষে শেষ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১১ রান।

    আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবারের মতো শেষ ওভার করার গুরুদায়িত্ব পেলেন মহারাজ, শুরুই করলেন ওয়াইড দিয়ে। তবে এরপর ঠিকই পুষিয়ে দিলেন লেংথ পেছনে টেনে, গতি কমিয়ে জাকের আলীকে ফেললেন লং অনের ফাঁদে। শেষ ২ বলে যখন ৬ রান প্রয়োজন তখন স্ট্রাইকে মাহমুদউল্লাহ, মহারাজ দিয়ে বসলেন ফুল টস। সারাদিন জুড়ে ফিল্ডিংয়ে একের পর এক ভুল করা দক্ষিণ আফ্রিকা আসল সময়ে ঠিকই জ্বলে উঠল। অধিনায়ক মার্করাম কিছুটা দৌড়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে লাফ দিয়ে লুফে নিলেন মাহমুদউল্লাহর বাউন্ডারি বরাবর শট। ২৭ বলে ২০ রানে থেমে মাহমুদউল্লাহর তখন মাথায় হাত, যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরের বলটাও খুব একটা ভালো না করলেও এক রান দিয়ে সেই মহারাজ তাই বের করে আনেন জয়।

    এর আগে টসে জিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং নেওয়ার সিদ্ধান্তে ভুরু কুঁচকেছিলেন মাঠে থাকা বেশ কিছু সাবেক ক্রিকেটার। তাদের শঙ্কাকে সত্যি করেই দুর্দান্ত ওপেনিং স্পেলে দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডার ধসিয়ে দিয়েছিলেন তানজিম হাসান সাকিব ও তাসকিন আহমেদ। মাঝে পঞ্চম উইকেটে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ রানের জুটির রেকর্ড গড়েছিলেন ডেভিড মিলার ও হাইনরিখ ক্লাসেন। ৭৯ রানের সেই জুটি ভাঙার পাশাপাশি দারুণ ডেথ বোলিংয়ে ম্যাচে ফিরে প্রোটিয়াদের ১১৩ রানেই আটকে দিয়েছে বাংলাদেশি বোলাররা।

    বল হাতে নিয়ে পাওয়ারপ্লেতে ওপেনিং স্পেলে তিন ওভার করেছিলেন তানজিম সাকিব; তিন ওভারেই উইকেট পেয়েছিলেন তিনি! প্রথম ওভারেই ডি কক তার ওপর চড়াও হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও অন্য প্রান্তে থাকা রিজা হেন্ড্রিকসকে তার প্রথম বলেই এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন সাকিব। সাকিবের পরের ওভারেই ডি কক আরও একটি ছয় মেরে তাকে স্বাগত জানালেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে তার স্টাম্প উপড়ে ফেলেন সাকিব। ডি ককের ক্রস ব্যাট শটে উইকেট হারানোর পরেই খেই হারিয়ে বসে দক্ষিণ আফ্রিকা টপ অর্ডার। তাসকিনের সামান্না ভেতরে ঢোকা বল একেবারেই পড়তে না পেরে এরপর স্টাম্প খুইয়ে বসেন দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক এইডেন মার্করাম। নিজের পরের ওভারে এসে উইকেটের ভ্যারিয়েবল বাউন্স কাজে লাগান সাকিব; তার হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বল নামাতে গিয়েও না পেরে এক্সট্রা কাভারে সাকিব আল হাসানের ঝাঁপিয়ে পড়া ক্যাচের শিকার হয়ে ফেরেন ট্রিস্টান স্টাবস। পাওয়ারপ্লেতে দক্ষিণ আফ্রিকা তাই তুলতে পারে মোটে ২৫ রান।

    তবে পাওয়ারপ্লের পর নিজেদের সামলে নেন প্রোটিয়ারা। মিলার-ক্লাসেন জুটি ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে খেলতে থাকেন। স্পিনারদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন দুজনেই। স্পিন সামলানোতে দুজনেই দক্ষ হলেও বাংলাদেশকে সেই পথে হাঁটতে হলে রিশাদকে টানা দুই ছয় মেরে বার্তাটা পরিস্কারভাবেই জানিয়ে দেন ক্লাসেন। তবে দশম ওভারে স্পিনার মাহমুদউল্লাহকে আনা হলে প্রথম বলেই মিলারের ব্যাটের কানা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি; তবে সেই যাত্রা মিলার বেঁচে যায় লিটনের মিসে।

    মাহমুদউল্লাহর কার্যকর স্পেলে এক প্রান্তে মিলার-ক্লাসেন সুবিধা করতে না পেরে শেষদিকে আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। তবে নিজের স্পেলের শেষ ওভার করতে এসে আরও একটি সিমিং ডেলিভারিতে এবার আড়াআড়ি ব্যাটে খেলতে যাওয়া ক্লাসেনকে থামান তাসকিন। ৪৪ বলে ৪৬ রানে ক্লাসেন থামার পর ১৯-তম ওভারে রিশাদকে বল দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন শান্ত। মিলার যে তাকে ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করবেন বুঝেই টপ স্পিনার দিয়ে তার স্টাম্প উপড়ে ফেলেন রিশাদ। ৩৮ বলে ২৯ রান শেষে মিলার ফিরলে শেষ ওভারটায় দারুণ বল করেন মোস্তাফিজ; প্রথম চার বলেই দেন ডট। ওভারে তিনি কোনো বাউন্ডারি না দিলে প্রথমে ব্যাট করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের সর্বনিম্ন সংগ্রহে আটকে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে সেই সংগ্রহ নিয়েই বাংলাদেশকে হারিয়ে আসরে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়েছে প্রোটিয়ারা।