• আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ
  • " />

     

    ওই রাণীদের কেতন ওড়ে

    ক্রিস্টিনা উইলেস ক্রিকেট খেলতে ভালবাসতেন। খেলতেন মূলত ভাই জনের সঙ্গে। ক্রিস্টিনা বল ছুঁড়বেন, জন মারবেন, তাদের কুকুর বলটা আনবে। এই তিনজন মিলেই নাকি ইংল্যান্ডের সে সময়ের যে কোনো একাদশকে হারিয়ে দিতে পারতেন!

    নিতান্তই প্রচলিত একটা কথা মাত্র। যেমন প্রচলিত ক্রিস্টিনার ক্রিকেট-পরিবর্তনের অবদানও। আগেরটার চেয়ে বরং এটার পক্ষে সমর্থন বেশি, এমনকি ইতিহাসে জায়গা নেয়ার মতো জোরালো সমর্থনই আছে। জনের দিকে বল ছুঁড়তে ছুঁড়তেই ক্রিস্টিনা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন রাউন্ড-আর্ম অ্যাকশন। তখন আন্ডার-আর্মের যুগ। ক্রিস্টিনা ‘সেভাবে’ বল করতে গেলে কাপড়-চোপড়ে প্যাঁচ লেগে যেতো। শরীরের পাশ থেকে হাত ঘুরিয়ে তাই বল করতেন তিনি। সেই অ্যাকশনটাও অবশ্য আজকের বোলারদের থেকে আলাদা, কিন্তু হাত নীচে রেখেই বোলিং থেকে যে সরে এসেছে ক্রিকেট, তার মূলে তো ওই ক্রিস্টিনাই। জন বোনের কসরতটাই আয়ত্ত্ব করলেন। অনুশীলন করলেন। হয়ে উঠলেন সেটার ‘মাস্টার’। কিন্তু ক্রিকেট পরিচালনায়  মত্ত আম্পায়াররা তো বেরসিক! শুধু আম্পায়ার কেন, এটা যেন মানতে পারছিলেন না ক্রিকেটের হর্তা-কর্তারা। তখন ‘জেন্টলম্যান ও প্রফেশনাল’দের মাঝে খেলা হতো। জনের ডাক পড়তো তাই খুবই কম। হাত কেমন করে ঘুরিয়ে বল করবেন, রীতিমতো ভয়ঙ্কর! লর্ডসে ১৮৮২ সালের ১৫ জুলাই এমসিসির সঙ্গে এমন করেই বল করলেন জন উইলেস। কেন্ট পেসারের ডেলিভারিটা নো ডাকলেন আম্পায়ার। বলটা ছুঁড়ে মারলেন জন, মাঠের পাশে একটা ঘোড়ায় চেপে চলে গেলেন। সেই যে গেলেন, জনকে নাকি ক্রিকেট মাঠে আর কোনোদিন দেখা যায়নি! তা না দেখা যাক, ক্রিকেটে একটা বিপ্লবী প্রভাব তো জন উইলিস এর আগেই রেখে গেছেন। ওহ, না। শুধু জন উইলিসের নাম বললে কী হয়! ক্রিস্টিনা উইলিসের কথাটাও তো বলতে হবে! 
     

    ****

    হারমানপ্রিত কৌর হেলমেটটা ছুঁড়ে মারলেন। ব্যাটটা ফেলে দিলেন। হারমান চিৎকার করছেন, হারমান রাগে ফুঁসছেন। দীপ্তি শর্মার মুখটা শুধু শুকিয়ে যায়নি, রীতিমতো কান্নাকাটি অবস্থা! হারমানের সেঞ্চুরি হয়েই গেছে তখন, সেদিকে যেন খেয়ালই নেই। রান নেয়াতে ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গিয়েছিল, আরেকটু হলেই দুজনের একজন হয়ে যেতে পারতেন আউট। হারমানের রাগ সে কারণেই। শুধু সেঞ্চুরি করেই থামলেন না কৌর। খেললেন মেয়েদের ওয়ানডে ক্রিকেটেরই অন্যতম সেরা এক ইনিংস। তার সে চিৎকার যেন ডার্বি ছাড়িয়ে গেল, টেমস নদী পার হয়ে গেল, লর্ডস ছুঁয়ে গেল, পৌঁছালো পাঞ্জাবের কোনো এক বিস্তৃর্ণ প্রান্তরে। যেমন ভারতীয় মেয়েদের সাফল্য ছুঁয়ে গেছে গোটা ভারতকে। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ভারত পৌঁছে গেছে ফাইনালে, দ্বিতীয়বারের মতো। 

    ইংল্যান্ডের অবশ্য এটি পঞ্চম ফাইনাল। তিনবারের চ্যাম্পিয়ন তারা। হারমানের মতো চিৎকার করতে হয়নি তাদের। তবে চিৎকার ঠিকই করেছিলেন অ্যানা স্রাবসোল। অথবা জেনি গান, হেদার নাইট। কিংবা সারাট টেইলর। দক্ষিণ আফ্রিকাকে যতোটা সহজ ভেবেছিলেন তারা, ততোটা তো নয়। ম্যাচ গেল শেষ ওভারে, শবনিম ইসমাইলকে চার মেরে ইংল্যান্ডকে ফাইনালে নিয়ে গেলেন স্রাবসোলই। কান্নায় ভেঙে পড়া প্রোটিয়াদের খানিক বাদেই সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন স্রাবসোলরা। ক্রিকেটের সেই চিরন্তন রুপটা ফিরে এলো আবার। স্রাবসোলরা ফিরিয়ে আনলেন। 

     


     

    ****

    লর্ডসের লংরুমে মেয়েদের প্রবেশাধিকার ছিল না। এমসিসির সদস্যদের খাবার পরিবেশনকারি বা অন্য এমন কাজে থাকলে ভিন্ন কথা। দর্শক হিসেবে খেলা দেখবেন, ক্লাবের সদস্য হবেন, কোনোমতেই না। আপনি মেয়ে, আপনার সে ‘অধিকার’ নেই। এমনকি অন্যান্য গ্যালারিতেও মেয়েদের ঢুকতে হতো ‘সঙ্গী’সহ। একা একা ক্রিকেট দেখবেন, সে উপায় নাই। ১৯৯৯ সালে সে নিয়মটা ভাঙলো। মেয়েদের ক্রিকেট কিংবদন্তি র‍্যাচেল হেইও-ফ্লিন্ট আবেদন করলেন এমসিসির সদস্যপদের। মেয়েদের ওপরে থাকা লর্ডস লংরুমের ২১২ বছরের নিষেধাজ্ঞা ভাঙলো। 

    লর্ডসে মেয়েরা অবশ্য খেলতেন আগে থেকেই। ১৯৯৩ সালে বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়েছিল সেখানেই। শর্ট-স্কার্ট পরা মেয়েরা পোশাক পালটে ফেলেছেন, মেয়েদের ক্রিকেটটাও তো বদলেছে কতো! এবারের বিশ্বকাপ খেলা আট দলের সব ক্রিকেটারই হয় পেশাদার চুক্তিবদ্ধ অথবা কোনো একটা নির্দিষ্ট কাঠামোতে বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত। মেয়েদের এখন বিগ-ব্যাশ লিগ আছে, টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট আছে। এই বিশ্বকাপটাও যেমন অনেক নতুনের শুরু। অনেকগুলো ম্যাচ টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে, নাহলে ইন্টারনেটে স্ট্রিমিং করা হচ্ছে। আছে রিভিউ পদ্ধতি। 

    শুধু এমন কাঠামোগত না, মেয়েদের মাঠের খেলাও বদলেছে। ক্রিকেটে অনেক শুরুর প্রবক্তা যেমন মেয়েরা, তেমনি মেয়েদের এই বিশ্বকাপ তো প্রবর্তন করছে অনেক কিছুরই! 

    **** 

    ঝুলন গোস্বামীর এটি শেষ বিশ্বকাপ। শেষ মিথালি রাজেরও। এ দুজনকে বলা যায় কালের সাক্ষী। তারা যখন ভারতীয় দলে এসেছিলেন, বেতন ছিল না, কাঠামো ছিল না। তারা ছিলেন ‘শৌখিন’। সেই শৌখিনতা থেকে অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়েছে মেয়েদের ক্রিকেট। মেয়েদের এখন পাওয়ার হিটার আছে, মেয়েরা নতুন নতুন শট খেলেন। ম্যাগ লেনিং বা হারমানপ্রিত কৌরের ছয় তাই আপনাকে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে। নাটালি স্কাইভারের ‘ন্যাট-মেগ’ আপনাকে দেখাবে নতুন কিছু। 

    দক্ষিণ আফ্রিকার যেমন চার পেসারের বোলিং আক্রমণ ছিল এবার। স্লো-লো, তেমন সুইং-নেই-সিম নেই ধরনের বোলিং থেকে সরে এসে সে আক্রমণে ছিল বৈচিত্র। ছিল সিম, সুইং। আক্রমণাত্মক মানসিকতা। ফাস্ট বোলিং। ফাইনালের আগে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ড্যান ফন নিকার্ক লেগস্পিনার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট ম্যারিয়ান কাপের, তিনি ডানহাতি মিডিয়াম পেসার। তিনে আছেন দীপ্তি শর্মা, তিনি করেন অফস্পিন। 

    এরা প্রায় সবাই এতোদিন খেলেছেন এমন সব অবস্থায়, টেলিভিশনে দেখানো তো দূরের কথা, মাঠে দর্শকই থাকতো যেখানে হাতেগোণা। দক্ষিণ আফ্রিকা যেমন র‍্যাঙ্কিংয়ের ছয় নম্বর দল, আন্তর্জাতিক ম্যাচ তো তেমন খেলার সুযোগ পান না । সেই আফ্রিকা ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দিল। আগের বিশ্বকাপটা হয়েছিল ভারতে, ফাইনাল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে নয়, হয়েছিল ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে। সেই ভারত এবার ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে এসে খেলছে ফাইনাল, খেলছে ক্রিকেটের হোম অফ ক্রিকেটে। বিক্রি হয়ে গেছে সব টিকেট। ভারতে টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা বেড়ে গেছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। 

     

     

    **** 

     

    আমার বোন ক্রিকেটে তেমন কোনও অবদান রাখতে পারেনি। সেও বল করত। ক্রিস্টিনার মতো বোলিং অ্যাকশন নয়, তবে ‘প্রপার-অ্যাকশন’ বলতে যা বোঝায় আজকের ক্রিকেটে, সেভাবেই। আমি তার বল খেলেছি, আমার ভাই খেলেছেন, আমার বাবা খেলেছেন। আমার বোনের প্রিয় ক্রিকেটার গ্রায়েম স্মিথ। সারাহ টেইলর, হেদার নাইটরা তখন ছিলেন না। ঝুলন গোস্বামি বা মিথালি রাজরা তখন আসেননি। টেলিভিশনে সেভাবে ম্যাচ দেখানো হয়নি। টাইম মেশিনে করে এখনকার সময়টা যদি সে সময় আমাদের বাড়ির উঠোনে নিয়ে যাওয়া যেতো, হয়তো কপাল ‘পুড়তো’ গ্রায়েম স্মিথের। আমার বোন তখন হয়তো বল করতে চাইত ফন নিকার্কের মতো, লেগস্পিন। কাপের মতো পেস। অথবা দীপ্তি শর্মার মতো অফস্পিন। 

    সেটা সম্ভব নয়। 

    তবে আজকের যুগে অনেকজন আছেন, আমার বোনের মতো। ভারতে। বাংলাদেশে। সালমা-জাহানারাদের খেলা না দেখুন, টেইলর-রাজদের তো দেখছেন তারা। আমরাও যেমন একসময় শুধু লারা-টেন্ডুলকার-ওয়ার্নদের ‘আইডল’ মেনেছি। আজ সে জায়গা নিয়েছেন সাকিব-তামিম-মাশরাফি-মুস্তাফিজ। আমাদের বড় হওয়ার সময়ে টেস্ট-ওয়ানডে ছিল। টি-টোয়েন্টি আসলো। কতোজন আছেন, এ ফরম্যাটকে ক্রিকেট মনেই করেন না! এমন অনেকেই আবার আছেন, ওয়ানডে ক্রিকেটকে তারা ক্রিকেটই মনে করেন না! 

    সময় অনেক কিছুই বদলে দেয়। সময় মেয়েদের ক্রিকেটে অনেক কিছু বদলে দিয়েছে, অনেক কিছু বদলে দেবে। মেয়েদের ক্রিকেট হয়ে উঠবে ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ! 

    লর্ডসের ফাইনালটা সে সময় পাড়ি দেয়ার একটা ধাপ। লর্ডসের ফাইনাল হয়ে উঠবে ইতিহাসের পাঠ। যেমন লর্ডস থেকে ঘোড়ায় চড়ে হারিয়ে যাওয়া জন হয়েছিলেন। 

    হয়েছিলেন তার বোন। ক্রিস্টিনা। 


     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন