• ফুটবল

একজন কিংবদন্তির জন্ম

পোস্টটি ৯১৯৪ বার পঠিত হয়েছে

সেদিন দেশটির অলিতে গলিতে ভেসে আসছিল চাপা কান্নার শব্দ। মারাকানাজোয় যেন থমকে গিয়েছিল পুরো ব্রাজিল। তীব্র কষ্ট ছুঁয়ে গিয়েছিল ছেলেটির বাবা-মাকেও। ৯ বছরের কিশোর হয়ত সেই শোকের ব্যাপকতা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। না বুঝলেও বাবার চোখের পানি মুছে দিয়েছিল পরম মমতায়। কে জানত, এই ছেলেটিই ৮ বছর পর মুছে দেবে পুরো ব্রাজিলের চোখের জল! সেলেসাওদের স্বপ্নের সারথি হয়ে আবির্ভূত হলেন পেলে। যার ছোঁয়ায় ১৯৫৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল ব্রাজিল।

ফিরে দেখা ১৯৩০ বিশ্বকাপঃ 'মন্টেভিডিও, গড ব্লেস ইউ'​

******

স্টকহোমের আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে। ফাইনালের মাত্র ৪ মিনিটেই পিছিয়ে যাওয়ায় রাসুন্দা স্টেডিয়ামের উপস্থিত কয়েক হাজার ব্রাজিল সমর্থকের মুখ তার চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি গোমড়া। ৮ বছর আগের মারাকানার সেই কান্না কি আবারো ফিরে আসছে সুইডেনের মাটিতে? মারাকানায় উরুগুয়ে, চার বছর আগে হাঙ্গেরি, এবার কি সুইডেনের সাথেও হবে একই পরিণতি?

নাহ। যে দেশের ধ্যানে জ্ঞানে শুধুই ফুটবল, ভাগ্যদেবী তাদের প্রতি এতোটা নিষ্ঠুর তো হতে পারেন না! গোল হজমের হতাশা ঝেড়ে ফেলে জেগে উঠলো ব্রাজিলের আক্রমণভাগ। ৯ মিনিটে গ্যারিঞ্চার দারুণ এক পাসে সমতা আনলেন ভাভা, ৩০ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে এগিয়ে দিলেন ব্রাজিলকে। এর পরের গল্পটা শুধুই পেলের।

ফিরে দেখা ১৯৩৪ বিশ্বকাপঃ ইতালির হলো শুরু, অস্ট্রিয়ার হলো সারা​ 

ম্যাচের তখন ৫৫ মিনিট। ডি বক্সের ভেতরে বল পেলেন। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার পেলের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য এগুলেন, ঠিক তখনই বিশ্ব দেখল সেই জাদুকরি মুহূর্ত। প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে বল চিপ করে নিজের আয়ত্তে আনলেন, এরপর বুলেট গতির ভলিতে পাঠালেন জালে। গোলরক্ষক, ডিফেন্ডার, দর্শক, রেফারি; মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল পুরো স্টেডিয়াম, পুরো বিশ্বও বটে!

********

মুগ্ধতা ছড়ানোর শুরু সেই ছেলেবেলাতেই। সমবয়সী তো বটেই, স্কুলজীবনে যোজন যোজন এগিয়ে ছিলেন বড়দের থেকেও। প্রিয় ফুটবলার ভাস্কো ডা গামার গোলরক্ষক বিলের নামে বন্ধুরা তাঁর নাম দিল ‘পেলে’। নামের অর্থ জানতেন না, প্রতিবাদও করেছেন বহুবার। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বাবা মার রাখা নাম এডসন থেকে ‘পেলে’ নামটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার বটে, চরম কাকতালও বলতে পারেন, হিব্রু ভাষায় পেলে নামের অর্থ ‘মিরাকল’!

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে ডাক পাওয়া তো মিরাকলের চেয়ে কম কিছু নয়। গিলমার, ভাভা, গ্যারিঞ্চাদের মতো ফুটবলারদের ভিড়ে আলাদা করে নিজেকে চেনানোর চ্যালেঞ্জটা তো ছিলই। নতুন ফরম্যাটে আয়োজিত হওয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিল পড়ল ৪ নম্বর গ্রুপে, প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন, অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের কয়েকদিন আগেই ইনজুরিতে পড়লেন পেলে , খেলতে পারলেন না অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। পেলের মাথায় তখন একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, এবার কি তাহলে বিশ্বকাপ খেলা হবে না? এমন সুযোগ পেয়েও দর্শক হয়ে থাকতে হবে?

ফিরে দেখা ১৯৩৮ বিশ্বকাপঃ আজ্জুরিদের সঙ্গে ফ্যাসিজমের জয়

অবশেষে সুযোগ এলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে। মাঠে নেমেই জাত চেনালেন। ৭৭ মিনিটে ভাভার দ্বিতীয় গোলটা এলো তার দুর্দান্ত এক অ্যাসিস্টেই। প্রথম গোলের দেখা পেলেন পরের ম্যাচেই, কোয়ার্টারে তার একমাত্র গোলেই ওয়েলসকে হারিয়ে সেমিতে উঠল ব্রাজিল।

২৪ জুন, ১৯৫৮। রাসুন্দা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি ব্রাজিল-ফ্রান্স। আগের দুই ম্যাচে আগমনী বার্তা দেওয়া পেলে যেন সেদিন নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছিলেন। চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সে মন জয় করলেন সবার, করলেন হ্যাটট্রিকও। ৫-২ গোলে জিতে ৮ বছর পর আবারও ফাইনালে সেলেসাওরা। ব্রাজিলের তো বটেই, পেলেন ফ্রান্সের সমর্থকদের টুপি খোলা অভিবাদনও। পেলের কাছে হেরেই বাদ পড়ল ওই টুর্নামেন্টে ১৩ গোল করে সবার ওপরে থাকা জা ফন্টেইনের ফ্রান্স।

ফিরে দেখা ১৯৫০ বিশ্বকাপঃব্রাজিলকে আজও কাঁদায় মারাকানাজো

‘পেলে ম্যাজিকে’ ব্রাজিল তখন রীতিমত উড়ছে। ৪-২-৪ ফরম্যাটের নতুন ঝলক দেখানো ব্রাজিলকে আটকাবার সাধ্য কার? এদিকে ম্যাজিক দেখাচ্ছে স্বাগতিক সুইডেনও। গ্রুপ পর্ব  থেকেই জানান দিচ্ছিল, এবার ঘরের মাঠে কিছু একটা করে দেখাবে দলটি। শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকেট নিশ্চিত করে সুইডিশরা।

 

******

২৯ জুনের ফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ শুধু সুইডেনই ছিল না, ছিল ৮ বছর আগের সেই দুঃস্বপ্নও। ১৯৫০ এর বিশ্বকাপের মতো এবারো শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে দল। কিন্তু ফাইনাল এলেই যেন এলোমেলো হয়ে যায় ব্রাজিলের সবকিছু। সুইডেনের বিপক্ষেও আভাস পাওয়া যাচ্ছিল তেমনটাই। শুরুতেই পিছিয়ে পড়া ব্রাজিল অবশ্য পুরনো ভুলটা আর করেনি। ভাভা, পেলে জাগালোয় ৬৮ মিনিটের মাঝেই ৪-১ গোলে এগিয়ে যায় তারা।

কিন্তু এত সহজে কি মারাকানার সেই দুঃস্মৃতি পিছু ছাড়ে! ৮০ মিনিটে সিমনসন গোল করে ব্যবধান কমালেন। সাম্বার তালে নাচতে থাকা ব্রাজিল ভক্তদের মনে উঁকি দিল শঙ্কার কালো মেঘ। শেষ ১০ মিনিটে আবার আরেকটি ট্রাজেডির সাক্ষী হয়ে থাকতে হবে না তো? বহু দর্শক শুরু করে দিলেন প্রার্থনা, ‘ওহ ঈশ্বর, রক্ষা করো!’

ঈশ্বর হয়ত মাঠে নেমে আসেননি। কিন্তু ব্রাজিলের জন্য ‘ঈশ্বরের দূত’ হয়ে আসা সেই ১৭ বছরের বালক থাকতে কি আর ট্রাজেডি হতে পারে? সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে নামা পেলেই শেষ পেরেক ঠুকলেন সুইডেনের কফিনে।

ম্যাচ শেষ হতে খুব বেশি দেরি নেই। বক্সের ভিতরে উড়ে আসা বলে লাফিয়ে উঠে হেড করলেন, পেলের এই গোলের পরপরই বাজল শেষ বাঁশি। গোলের প্রভাবটা কেমন ছিল, সেটা বোঝা যায় খোদ সুইডিশ ফুটবলার সিগভার্দ পারলিংয়ের এক উক্তিতে, ‘যখন পেলে আমাদের বিপক্ষে শেষ গোলটা করলেন, সত্যি বলতে কি, আমার নিজেরই তালি বাজাতে ইচ্ছে করছিল!’

ফিরে দেখা ১৯৫৪ বিশ্বকাপঃ অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ​

*****

একদিকে তখন তুমুল করতালিতে ভেসে যাচ্ছে পুরো রাসুন্দা স্টেডিয়াম। ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসছেন ভাভা, গ্যারিঞ্চারা। প্রথম দল হিসেবে নিজেদের উপমহাদেশের বাইরে শিরোপা জিতল তারা। ক্যামেরাম্যানদের দম ফেলানোর জো নেই। সব ক্যামেরা খুঁজছেন একজনকেই। কোথায় পেলে? কী তাঁর অনুভূতি?

কিন্তু একি, জয়ের নায়ক যে গোলরক্ষক গিলমারের বুকে মাথা গুঁজে অঝোরে কাঁদছেন! দলের সিনিয়র সদস্যরা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না থামালেন। তাঁকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেই ব্রাজিল দল পুরো স্টেডিয়ামে ‘ভিক্টরি ল্যাপ’ নিল।

কান্না থামলেও চোখ তখনও ভেজা। তার কি মনে পড়ছিল ৮ বছর আগে বাবার সেই কান্না, পড়শিদের সেই চাপা আর্তনাদ, গলির সেই শ্মশানের নীরবতা? হয়ত মারাকানার কষ্ট পুরোপুরি ভোলাতে পারেননি। কিন্তু পেলের চোখের পানিতেই যেন মুছে গেলো সেই গ্লানি। বুক থেকে বড় একটা পাথর নামল ব্রাজিলবাসীর। বিশ্বকাপ জয়টা বড় প্রাপ্তি, অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই আসরে জুলে রিমে ট্রফির চেয়েও ব্রাজিল পেল আরও বড় কিছু। সব ছাপিয়ে পেলেই তাই ১৯৫৮ বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি…