• ট্রিবিউট
  • " />

     

    আফ্রিকার আর্মস্ট্রং

    আফ্রিকার আর্মস্ট্রং    

    ১.

     

    রবি মাজেলের চোয়ালে ১২টা সেলাই পড়েছে। গার্থ লে রউক্সের বাউন্সারের ফল! সময়টা ১৯৭৭ সাল। কেপটাউনের নিউল্যান্ডস। কুরি কাপের নিউ ইয়ারের ম্যাচ। ট্রান্সভাল ওপেনার ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স পেসারের ‘আক্রমণের’ শিকার সেখানেই।

     

    মাজেলকে দিয়ে শুরু, ট্রান্সভালের সব ব্যাটসম্যানকেই বাউন্সারে নাকাল করে ছাড়লেন লে রউক্স। সে ইনিংসে উইকেট পেলেন না কিন্তু একটিও! ক্লাইভ রাইস যখন ব্যাটিংয়ে, একটা বাউন্সারের পর তেড়ে গেলেন তাঁর দিকে রউক্স। ‘তোমার বাউন্সারের সঙ্গে আমার এটাই পার্থক্য বুঝলে! আমি আঘাত করতে পারি!’

     

    সেই লে রউক্সই ব্যাটিংয়ে এলেন। সঙ্গে সঙ্গেই রাইস এলেন বোলিংয়ে, প্রথম বলটাই আঘাত হানলো লে রউক্সের মুখে! মাজেলের ‘রক্তের’ বদলা!

     

    ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের জিততে হলে দরকার ছিল ২৫২ রান, শেষ ইনিংসে। ম্যাচের শেষ ওভারটি করতে এলেন সেই রাইস। হাঁটুতে চোট পেয়েছেন, হাঁটতে পারছেন না ঠিকমতো! তবে বোলিংয়ের গতি কমালেন না। শেষ ওভারে গড়ালো ম্যাচ।

     

    সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তখন দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশে। অনেক অঞ্চলে তো অন্ধকারও নেমে এসেছে। তবে গোটা জাতির মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু তখন জাদুর বাক্সগুলো, যেখান থেকে ভেসে আসছে নিউল্যান্ডসের সেই ম্যাচের ধারাবিবরণী! ট্রানজিস্টরে আবদ্ধ তখন আফ্রিকানদের ক্রিকেটপ্রেম।

     

    দিনের শেষ বলে ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের উইকেটকিপার রব ড্রামোন্ডকে বোল্ড করলেন রাইস। ট্রান্সভাল ম্যাচ জিতলো ৪ রানে। এই ট্রান্সভালকেই (যা কিনা এখন গওটেং নামে পরিচিত), একসময় ‘মিন মেশিনে’ পরিণত করেছিলেন রাইস।

     

    ২.

     

    ২০ বছরের এক তরুণ ক্রিকেটারের ট্রান্সভালের হয়ে অভিষেক হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। দুই মৌসুম পরেই দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ট্রেলিয়া সফরে ডাক পেলেন ক্লাইভ এডুয়ার্ড বাটলার রাইস নামের এই অলরাউন্ডার। কিন্তু সে সফর আলোর মুখ দেখলো না আর। অস্ট্রেলিয়ায় যে তখন দক্ষিণ আফ্রিকা বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে! বর্ণবাদের দায়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিষিদ্ধ করা হলো। গ্রায়েম পোলক, ব্যারি রিচার্ডস, মাইক প্রক্টরদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল সেখানেই। অ্যালান ল্যাম্ব, রবিন স্মিথ, কেপলার ওয়েসেলসের মতো পরবর্তী প্রজন্মের তারকারা খেললেন ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে। আর টেস্ট খেলার স্বপ্নটাও যেন চাপা পড়লো ক্লাইভ রাইস নামের সেই তরুণের!

     

    ৩.

     

    ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স আর ট্রান্সভালের সেই ম্যাচকে ঘিরে এত উত্তেজনার কারণটাও ওই নির্বাসন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নেই, ঘরোয়া প্রথম শ্রেনিই যে ভরসা! ভরসা ক্লাইভের জন্যও। দেশে ওই কুরি কাপ, বিদেশে কাউন্টি। নটিংহ্যাম্পশায়ার।

     

    আশির দশকে টানা কুরি কাপ জয়ে ট্রান্সভালের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘মিন মেশিন’। আর কাউন্টিতে এসে গড়েছিলেন নতুন ইতিহাস। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৮১ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশীপ জিতেছিল নর্দানরা।

     

    তবে কুরি কাপ আর কাউন্টি, এ দুইয়ের মাঝেও আছে ভিন্ন গল্প। কেরি প্যাকার আর তার ওয়ার্ল্ড সিরিজের গল্প।

     

    ৪.

     

    কেরি প্যাকার আর তাঁর ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট সিরিজের (ডব্লিউএসসি) আগে পরে ক্রিকেটের বিভাজনরেখাটা স্পষ্ট। সেই ‘বিদ্রোহী’ সিরিজে আরও অনেক তারকার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ক্লাইভ রাইসও। যে সিরিজে যোগ দিয়ে টনি গ্রেগ আর ফেরেননি ইংলিশ ক্রিকেটে!

     

    সময়টা ১৯৭৮। প্যাকারের ‘বিদ্রোহী সিরিজে’ যোগ দেয়ায় খেলোয়াড় বা পেশাদার- সবকিছু হিসেবেই বরখাস্ত করা হলো ক্লাইভ রাইসকে। রাইসও কম যান না। নটিংহ্যাম্পশায়ার কাউন্টিকে নিয়ে গেলেন কোর্ট পর্যন্ত। সেখানে রাণীর সাতজন ‘উপদেষ্টা’ কথা বললেন রাইসের হয়ে। যদিও এই ‘উপদেষ্টা’দের খরচ মিটিয়েছিলেন প্যাকার নিজেই।

     

    ক্লাইভ কেইস জিতলেন। তিনি না থাকায় ক্লাব এই সময়ে রিচার্ড হ্যাডলিকে অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে দলে নিয়েছিল। এই হ্যাডলিকে সঙ্গে নিয়েই ক্লাইভ গড়েছিলেন কাউন্টির সময়ের সেরা ‘অলরাউন্ড’ জুটি।

     

    ট্রেন্টব্রিজকে (নটিংহ্যাম্পশায়ারের ঘরের মাঠ) আদতেই ‘ঘরের মাঠ’ বানিয়েছিলেন রাইস। গ্রাউন্ডসম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে পিচে ঘাস রেখে দিতেন, যেখানে আগুন ঝড়াতেন তিনি আর হ্যাডলি। টসে জিতে বোলিংও নিতেন, সে সময় যার প্রচলন ছিল না খুব একটা।

     

    ১৯৮১ সালে এমনই এক কন্ডিশনে শেষ ম্যাচটা জিততে হতো ক্লাইভদের। চ্যাম্পিয়নশীপের জন্য। তিনদিনের সেই ম্যাচ দুদিনের মধ্যেই দশ উইকেটে জিতেছিল নটসরা। ১৯২৯ সালের পর সেই প্রথম চ্যাম্পিয়নশীপ ঘরে এসেছিল সেবার।

     

    ''ম্যাচের পর রেগ সিম্পসন (ইংল্যান্ডের সাবেক ওপেনার) এসেছিলেন ড্রেসিং রুমে। আমার আর হ্যাডলির সঙ্গে যখন হাত মেলালেন, তখন তার চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল। এরকম মুহুর্তেই তুমি হঠাৎ করে বুঝবে, আসলে কী অর্জন করেছো তুমি!’

     

    ক্লাইভ রাইস সেবার শুধু সিম্পসনের আনন্দাশ্রু নয়, উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন।

     

    ৫.

     

    হোক না প্রায় অজেয় কোনও ঘরোয়া দলের সদস্য, এনে দিন না কেন কাউন্টিতে প্রায় ভুলে যাওয়া কোনো শিরোপার স্বাদ, দেশের হয়ে মাঠে নামার সঙ্গে কী তুলনা চলে আর কিছুর! অনেক ‘বিদ্রোহী’ সফরের পর, ঝড়-ঝঞ্ঝার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ফিরলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।


    সাল ১৯৯১, কলকাতা, ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার দশজনেরই ওয়ানডে অভিষেক হলো। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ছিল শুধু কেপলার ওয়েসেলসের, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাসনকালীন সময়ে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছিলেন। তবুও সেদিন ইডেন গার্ডেনে হয়েছিলো নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার শুরু, যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন সেই ক্লাইভ রাইস, ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক পোড় খাওয়া ৪২ বছর বয়স্ক এক সেনানী!

     

    রাইস সে ম্যাচশেষে বলেছিলেন, ‘এখন বুঝলাম, চাঁদে নেমে নীল আর্মস্ট্রংয়ের কেমন লেগেছিল!’

     

                            প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ, ১৯৯১ সালের ১০ নভেম্বর, ইডেন গার্ডেন, কলকাতা

     

     

    হ্যাঁ, দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া চন্দ্রজয়ের মতোই ছিল রাইসের কাছে। তবে চন্দ্রাভিযান টিকলোনা বেশীদিন। ‘বুড়িয়ে গেছেন’- অজুহাতে দল থেকে বাদ দেওয়া হলো রাইসকে, নেওয়া হলো জন্টি রোডসদের। অস্ট্রেলিয়ায় নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপের ‘রণপরিকল্পনা’ সাজাতে ব্যস্ত রাইস খবর পেলেন, তিনি নন, দক্ষিণ আফ্রিকানদের ‘ডাউন আন্ডার’-এ নিয়ে যাবেন সেই কেপলার ওয়েসেলস! তখনকার নির্বাচক পিটার ভ্যান ডার মারউইকে অবশ্য এ কারণে কখনোই ‘ক্ষমা’ করতে পারেননি রাইস।

     

    ৬.

     

    শেষের দিকে ট্রান্সভাল তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ কয়েকটা ঘরোয়া মৌসুম তাই নাটালের হয়ে খেলেছিলেন ‘রাইসি’। ফিরিয়ে দিয়েছিলো তো দক্ষিণ আফ্রিকাও। পরে ন্যাশনাল একাডেমির কোচ করা হয়েছিল তাঁকে, সেখান থেকেই উঠে এসেছিলেন শন পোলক, ল্যান্স ক্লুজনাররা। সে দায়িত্ব ছেড়ে তিনি চলে যান নটিংহ্যাম্পশায়ারে। সেখানকার হেডকোচ হয়ে। সেই নটিংহ্যাম্পশায়ার, যাঁরা ফিরিয়ে দিয়েও আবার ফিরিয়ে এনেছিলো তাঁকে। সেখানেই কেভিন পিটারসেনকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এনেছিলেন তিনি। কেপির কাছে তাই রাইসি শুধুই একজন বন্ধু বা কোচ নন, ছিলেন ‘পিতৃতুল্য’ একজন মানুষ!

     

    ১৯৭১-৭২ সালের সেই না হওয়া অস্ট্রেলিয়া সফর ২০-২১ বছরের এক তরুণের মনে কী প্রভাব ফেলেছিল, কে জানে! তবে কাউন্টি খেলার সময় আরেক দক্ষিণ আফ্রিকান পিটার কার্স্টেনকে ফুটবল ম্যাচ দেখতে দেখতে বা ঘরোয়া আড্ডায় প্রায়ই বলতেন, ‘আহা, যদি বিশ্বকে দেখাতে পারতাম, আমরা (দক্ষিণ আফ্রিকানরা) কী করতে পারি!’

     

           (নীচ থেকে) রিচার্ড হ্যাডলি, ক্লাইভ রাইস, কপিল দেব, ইয়ান বোথাম, ম্যালকম মার্শাল

     

     

    হয়তো এসব বলেই প্রেরণা দিতেন নিজেকে। আর আশায় থাকতেন। মাত্র তিনটা ওয়ানডে ম্যাচের জন্য সে আশা পূরণ হয়েছিল ক্লাইভ রাইসের। ৪৮২টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ, ৪০.৯৫ গড়ে ২৬৩৩১ রান, ২২.৪৯ গড়ে ৯৩০ উইকেটের বিপরীতে তাই নেই কোনই টেস্ট ম্যাচ, ‘চাঁদে চড়ার’ অনুভূতি হলেও ক্রিকেটের এই চূড়া যে ছোঁয়া হয়নি তাঁর। ইমরান খান, কপিল দেব, রিচার্ড হ্যাডলির সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারতো তাঁরও নাম। হয়নি, হয়না। টেস্ট খেলেননি যে ক্লাইভ রাইস! সময়ের ভেলায় চড়ে যে বয়স আসে, তা নাকি ফুরিয়ে গিয়েছিল তাঁর। টেস্ট খেলার জন্য নাকি বড্ড 'বুড়িয়ে' গিয়েছিলেন।

     

    ৭.

     

    এবার জীবনের সময়টাই ফুরিয়ে গেল। ম্যালেরিয়া হয়ে ক্যান্সার, হার মানতে হলো এই প্রাণঘাতি রোগগুলোর কাছে। সতীর্থ ওপেনারের ‘রক্তের প্রতিশোধ’ নেওয়া রাইসি এবার বিদায় নিতে বাধ্য হলেন, লড়াই থামিয়ে দিয়ে।

     

    সঙ্গে করে কি নিয়ে গেলেন, টেস্ট না খেলার আক্ষেপ? অথবা ক্লাইভ রাইস শুধুই তেমন কেউ, যাঁর মতো আরও অনেকের আক্ষেপের কারণেই সোবার্স, ইমরান, কপিল, হ্যাডলিদের এত ‘উদযাপন’ করা হয়!

     

    কে জানে, হয়তো ওপারে গিয়ে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান, ওয়ালি হ্যামন্ড, ম্যালকম মার্শালদের কোন ‘মিন মেশিন’ ‘টেস্ট’ দলে সুযোগ পাবেন ক্লাইভ রাইস!

     

     ‘গুডবাই, রাইসি’।