• বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ
  • " />

     

    একটা বিরতি যেভাবে বাংলাদেশের 'অভিশাপ' আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের 'আশীর্বাদ'


    স্কোরকার্ড বলছে, বাংলাদেশ শেষ টি-টোয়েন্টিতে হেরে গেছে ৪০ রানে। কিন্তু স্কোরকার্ড বলছে না, এই ম্যাচে জয় পরাজয় ছাপিয়েও বড় হয়ে গেছে নো বলের বিতর্কিত ঘটনা। যেটির জন্য খেলা বন্ধ ছিল আট মিনিট। তার চেয়েও বড় কথা, ওই ঘটনা যেন ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য। ওই সময় ৫৫ রানে ১ উইকেট ছিল বাংলাদেশের, তাও মাত্র ৪ ওভারে। কিন্তু এরপর সেই যে পথ হারাতে শুরু করল, সেখান থেকে অলআউট হয়ে গেল ১৪০ রানে। ম্যাচ শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক কার্লোস ব্রাথওয়েট আর বাংলাদেশ কোচ স্টিভ রোডস দুজনেই মানছেন, ওই ঘটনা ম্যাচের রঙ বদলে দিয়েছে অনেকটাই।

    আম্পায়ার তানভীর আহমেদের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতিবাদটা টিভিতেই হয়তো দেখেছেন। প্রায় মিনিট দশেকের কাছাকাছি বন্ধ ছিল খেলা, শেষ পর্যন্ত আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে আবার নেমেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু সেটা তাদের দমিয়ে রাখা দূরে থাক, উলটো তাদের তাঁতিয়ে দিয়েছে আরও বেশি। তার চেয়েও অদ্ভুত, বাংলাদেশ যেন আরও বেশি খেই হারিয়ে ফেলেছে ওই সময়ের পর। একের পর এক আত্মঘাতী সব শট খেলে উইকেট দিয়ে এসেছেন সবাই। দেখতে দেখতে ১৪০ রানে অলআউট হয়ে গেছে বাংলাদেশ।

    কিন্তু কী হয়েছিল আসলে ঠিক ওই সময়? ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সেটি ব্যাখ্যা করেছেন ব্রাথওয়েট, ‘আমার মনে হয় ফিফটি-ফিফটি সব সিদ্ধান্ত ওদের পক্ষেই যাচ্ছিল, আমাদের নয়। আমি কখনোই বলতে চাই না ইচ্ছে করে তারা এটা করেছে। এখানে জোচ্চুরি বা এমন কিছু আছে। তারাও পেশাদার। পক্ষপাত ছিল বলেও আমার মনে হয় না। কিন্তু ম্যাচ রেফারিকে আমি বলছিলাম, সব ফিফটি ফিফটি সিদ্ধান্ত আমাদের বিপক্ষে গেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে আমরা লাল বা সাদা বলে অনেক দিনই ভালো খেলতে পারিনি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তখনই আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেছি, এই সিদ্ধান্তগুলো আমাদের ক্ষতি করেছে।’

    ব্রাথওয়েট বলছেন, নেতা হিসেবে তাঁকেই এগিয়ে আসতে হতো, ‘আমাদের কিছু একটা বলতে হতো। তারা সবাই তরুণ, আমি তো ওদেরকে ছেড়ে দিতে পারি না। নেতা হিসেবে আমাকে ম্যাচ রেফারি আর চতুর্থ আম্পায়ারের সাথে কথা বলতে হতো। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের পক্ষ থেকে আমাকে একটা অবস্থান নিতে হতো। আমি শুধু ম্যাচ রেফারির কাছে পাঁচ মিনিট সময় চেয়েছি। ওই সময় যাতে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে মাথা পরিষ্কার রাখতে পারি। মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নেওয়া আমাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। আমি এর মধ্যে আমরা সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা সবাইকে বলেছি আমাদের জিততে হবে, এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।  অবশ্যই পুরো ব্যাপারটা অনেক বেশি আবেগতাড়িত ছিল। এরপর  যা হয়েছে, সেটা আপনারা সবাই দেখেছেন। প্রথম ১০ ওভার যদি জেকিল হয় পরের ১০ ওভার হয়েছে হাইড। আমাদের মতো অনভিজ্ঞ একটা দলের কাছ থেকে এটা ছিল অনেক বড় একটা ব্যাপার।’

    ব্রাথওয়েট স্বীকার করেছেন, ওই ঘটনা না ঘটলে হয়তো ম্যাচ এমন নাও হতে পারত, ‘আসলে ব্যাপারটা তো আমার হাতে ছিল না। ইচ্ছে করে অমন হয়নি। তবে হয়তো আমাদের পক্ষে গেলেও যেতে পারে। আমাদের জন্য সহজ ছিল পুরো ব্যাপারটা মাথা নিচু করে মেনে নিয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়ে আপত্তি করা। কিন্তু আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি প্রতিটা বলের জন্য আমরা সবাই লড়ব।’

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ না হয় ওই ঘটনা থেকে প্রেরণা পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের নিজেদের দায় তো কম নয়। বিশেষ করে সাকিব-সৌম্য যেমন শট খেলে আউট হয়েছেন, তাতে ওই বিরতিটা প্রভাব ফেলেছে কি না এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। বাংলাদেশ কোচ রোডসও সেটি মেনে নিলেন,  ‘অবশ্যই, একদম (প্রভাব ফেলেছে)। আমার মনে হয় আপনি দেখেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দারুণ শুরুর করার পর আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এরপর ওই সময় আরেক বার ম্যাচের মোড় ঘুরে গেছে। আমিও ওই সময় খেলোয়াড়দের শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম, সবার সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমি বলছিলাম, আমরা একটা ভালো অবস্থানে আছি। এখান থেকে আমাদের ফোকাস হারানো যাবে না। কিন্তু সেটা কাজ করেনি, এটাই ক্রিকেট। সব সময় আপনার চাওয়ামতো সবকিছু হয় না।’

    কিন্তু ওই ঘটনার সময় বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের অবস্থা কেমন ছিল? রোডস জানাচ্ছেন, ‘আগের ম্যাচেও কিন্তু এরকম ঘটনা হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি, খেলোয়াড়েরা যেন এতে বেশি জড়িয়ে না পড়ে। আমি চেষ্টা করেছি ড্রেসিংরুম যেন শান্ত আর নির্ভার থাকে। আর অভিজ্ঞতা বলে এরকম চললে খেলায় ফোকাস রাখাটা জরুরি। অনেক সময় আবেগ এখানে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিহাসই বটে, আজও সেটা হয়েছে। ওই মুহূর্তটা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমার জন্যও জড়িয়ে না পড়াটা জরুরি ছিল। কারণ এখানে কথা বলার মতো আরও অনেকেই ছিল।’

    কিন্তু এমন একটা সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে এমন ঘটনা কতটা হতাশাজনক? বিশেষ করে যখন সেটা নিজের দেশের দুই আম্পায়ারের কাছ থেকে আসে? রোডস স্মিতমুখেই বললেন, ‘আমি মনে করি, যারা খেলাটা ভালোবাসি, তারা সবাই চাই যেন সবকিছু ভালোমতো হোক। কিন্তু কখনো কখনো কিছু জিনিস ঠিকঠাক হয় না। তবে আগেই বলেছি, আমি ম্যাচ অফিসিয়ালদের দিকে আঙুল তুলতে চাই না। যদি সবকিছু ঠিকঠাক চলে তাহলে সবারই ভালো।’

    কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে অনেক কিছুই ঠিকঠাক চলছে না, আজকের ম্যাচটা তার একটা বড় সাক্ষীই হয়ে রইল।