• বিপিএল ২০১৯
  • " />

     

    সাদা আর রঙিন, সব পোশাকেই দুর্দান্ত ইয়াসির আলী

    সাদা আর রঙিন, সব পোশাকেই দুর্দান্ত ইয়াসির আলী    

     

    সেদিন জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনুশীলনের পর জাতীয় দলের সিনিয়র একজন ব্যাটসম্যান বলছিলেন, এই ছেলেটার দিকে চোখ রাখুন। অনেক দিন সার্ভিস দিতে পারবে দলকে। কথাটা যিনি বলেছেন, তিনি টেস্টে বাংলাদেশ দলে এমনই অপরিহার্য, ‘ছেলেটার’ ওপর আলাদা করে দৃষ্টি রাখতেই হলো। ইয়াসির আলী চৌধুরী এবারের বিপিএল যেমন খেলছেন, তাতে অবশ্য তাঁর ওপর সেটা না রেখে উপায়ও নেই। 

    চিটাগং ভাইকিংসের হয়ে এবারের প্রথম তিন ম্যাচে সুযোগই পাননি। আশরাফুলের জায়গায় প্রথম সুযোগটা পেয়েই খুলনার সঙ্গে করলেন ৪১। এরপর যে ছয় ম্যাচ খেলেছেন, তাতে শুধু দুবারই দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি। অন্য ম্যাচে তাঁর স্কোরগুলো দেখুন, ৫৪, ১৫, ৭৮ ও ৫৮। অথচ ২০১৫ সালে অভিষেকের পর গত দুই বছর বিপিএলে সুযোগই পাননি। সেদিন রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে ৫৮ রানের ইনিংসের পরেই ইয়াসির বলছিলেন, এই দুই বছর দর্শক হয়ে থাকার পর এবার বেশ উৎসাহ পেয়েছেন সতীর্থদের কাছ থেকে, ‘আসলে ওরকম চাপ ছিল না, কারণ আমার টিম ম্যানেজমেন্ট, স্কিপার, ফেলো প্লেয়ারের কারণে। দুই সিজনে ম্যাচ খেলিনি, এটা ব্যাপার না। এভাবে আমি চাপটা অনুভব করিনি। নিজেকে প্রমাণ করার একটা আকাঙ্খা তো ছিলই।’

     

    এবারের বিপিএলে এর মধ্যেই ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শীর্ষ পাঁচে ঢুকে গেছেন ইয়াসির। দেশিদের মধ্যে শুধু জুনাইদ সিদ্দিকী আর মুশফিকুর রহিমই এগিয়ে তাঁর চেয়ে। তবে দুজনের চেয়েই ম্যাচ কম খেলেছেন, ১৩৪ এর কাছাকাছি স্ট্রাইক রেটও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারুণই বলতে হবে। তিনটি ফিফটিও হয়ে গেছে, এর চেয়ে বেশি ফিফটি আছে শুধু রাইলি রুশোর।

    তবে রানের জন্য নয়, ইয়াসির নিজের ওপর আলাদা চোখ রাখতে বাধ্য করেছেন খেলার ধরনের কারণে। উইকেটে দারুণ স্বচ্ছন্দ, চার দিকে খেলার মত শট আছে। অফ সাইডে দারুণ, বিশেষ করে স্পিনারদের ইনসাইড আউট করে মারাটা চোখ কাড়ার মতো। আর শুধু বড় শট নয়, টি-টোয়েন্টির দাবি মিটিয়ে সিঙ্গেল নেওয়ার সহজাত সামর্থ্যও আছে। আজ চট্টগ্রামের কোচ সাইমন হেলমুট অনুশীলন শেষে সেসবই মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘একাডেমিতে আমি যখন ওকে দেখেছি ও তখন একদম তরুণ একজন খেলোয়াড়। ওর নিজের কন্ডিশন নিয়ে একটু কাজ করার ছিল। ওর স্কিল আছে, ফিল্ডিং আর ফিটনেসে উন্নতি করার দরকার ছিল। সেটা সে করেছে। এখন দেখুন সে নিজেকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। শুধু ব্যাটিং নয়, এখন ওর ফিটনেস আর ফিল্ডিংয়েও অনেক উন্নতি হয়েছে। এটা ওকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সে কাট করেছে, পুল করেছে, ড্রাইভ করছে, সোজা খেলছে, দরকার হলে মিড উইকেট বা এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে খেলছে। টি –টোয়েন্টির জন্য যা দরকার সবই করছে।’

    হেলমুট তো সামনের বছরের টি-টোয়েন্টির জন্য এখন থেকে ইয়াসিরকে তৈরি করতে বললেন, ‘আমরা তো ওকে নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন খেলোয়াড় আসছে যারা সামনে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারে। এদের ওপর কিন্তু আমাদের চোখ রাখতে হবে। আমাদের সামনের বছর একটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আছে। সেখানকার জন্য আমাদের তরুণদের প্রস্তুত করতে হবে। ’

    ইয়াসিরকে টি-টোয়েন্টি আবিষ্কার বললে ভুলই বলা হবে। এইচপিতে অনেক দিন ধরে খেলছেন, গত বছর নিজেকে জাতীয় লিগ, বিসিএল বা ইমার্জিং কাপে প্রমাণও করেছেন। এই তো বিপিএল খেলার আগেই বিসিএলে ইস্ট জোনের হয়ে ১০১* আর ৭০ রানের দুইটি ইনিংস ছিল পর পর ম্যাচে। গত মৌসুমে প্রথম শ্রেণিতে ৯ ম্যাচ খেলে ৭৫ গড়ে করেছেন ৬৭৭ রান। ইমার্জিং কাপে তিন ম্যাচে সুযোগ পেয়ে করেছেন ১২১ রান। লিস্ট এ তে ৩৪ আর প্রথম শ্রেণিতে প্রায় ৫০ গড় বলছে, ইয়াসির ধারাবাহিকও।

    এমন একটা শহরে বেড়ে ওঠা, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সূতিকাগারই সেই চট্টগ্রাম। চকবাজারের ছেলে ইয়াসির প্যারেড কর্নারের মাঠে খেলে হাত পাকিয়েছেন, পরে দীক্ষা নিয়েছেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর বড় ভাই নুরুল আবেদীন নোবেলের কাছে। নিজে সেদিন সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘ আসলে আমি ছোটকাল থেকে খেলি। নোবেল স্যারের হাত ধরেই শুরু। উনার একাডেমিতে প্র্যাকটিস করতাম। ওখান থেকে টেকনিক আর অন্যান্য জিনিসগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। তবে আমার প্রথম কোচ আমার বাবা। উনার হাত ধরেই মাঠে যেতাম।’ প্রধান নির্বাচক ও চিটাগং ভাইকিংসের উপদেষ্টা মিনহাজুল আবেদীনের প্রেরণার কথাও বললেন, ‘আমাকে টিমে নেওয়ার পর এনসিএল শেষ, বিসিএল শুরু। স্যার (মিনহাজুল) এসে আমাকে বলল, ভালোমতো খেল। সামনে বিপিএল আছে। ’

    সেই সুযোগটা ইয়াসির দুই হাত ভরেই নিয়েছেন। মিনহাজুল, আকরামদের সময়ে চট্টগ্রামের ক্রিকেট কাটিয়েছে সোনালী সময়। এরপর আফতাব আহমেদ সেই আলোকশিখা দিয়ে গেছেন তামিম ইকবালের কাছে। তার পর জাতীয় দলে চট্টগ্রামের হয়ে সেই ব্যাটন নেওয়ার মতো আর কেউ ছিলেন না। ইয়াসির সেটা নিয়ে কতদূর যেতে পারবেন, সময়ই বলে দেবে, তবে নিজে ব্যাপারটা ছেড়ে দিচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার হাতে, ‘অবশ্যই দেখছি, ভালো করছি। বাকিটুকু আল্লাহর হাতে, যদি তার ইচ্ছা থাকে তাহলে একদিন জাতীয় দলে খেলব।’