• ক্রিকেট

রেকর্ড বা শিরোপা নয়, তামিমের ইনিংসের মাহাত্ম্য অন্যখানে

তামিম ইকবাল যখন তাঁর মতো খেলেন, তন্ময় হয়ে দেখতে হয়। আর সেটি যদি হয় কালকের মতো অমন রুদ্ররূপের, তাহলে তো কথাই নেই। ইদানীং তামিম যখন কথা বলেন, তাও শুনতে হয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো। কালকের ১৪১ রানের ওই বারুদে (বিস্ফোরক, ভয়ংকর এসব শব্দও আসলে ঠিক যথেষ্ট মনে হচ্ছে না) ইনিংসের পর যে কথাটি বললেন, এবারের বিপিএলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে থাকতে পারে তা।

 

এমনিতে এবারের বিপিএলে ভুলে ভরা শুরুর পর শেষটা মোটামুটি স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে। আল্ট্রা এজ ছাড়া শুরু হয়ে যাওয়া ডিআরএস, ধারাভাষ্য নিয়ে হাস্যরস, সম্প্রচারে একগাদা ভুল, নিষ্প্রাণ উইকেটে লো স্কোরিং ম্যাচ- শুরুতেই মোটামুটি সমালোচনায় জেরবার বিপিএল। মূলত প্রাণ ফিরতে শুরু করে ঢাকা পর্বের প্রথমভাগে রংপুর-ঢাকার রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ দিয়ে। রান প্রসবা ম্যাচটা গড়ায় শেষ ওভারে, গ্যালারি ঠাসা দর্শক দেখে আলিস এল ইসলামের নাম নবাগতের হ্যাটট্রিক-কাণ্ড। তার পরেই খুলনা-চিটাগংয়ের সুপার ওভারের ম্যাচে বিপিএল মোটামুটি জমজমাট।

সিলেট পর্বের প্রথম কয়েকটা ম্যাচ বাদ দিলে রানের সেই ছন্দপতন খুব বেশি হয়নি। এর মধ্যে ধারাভাষ্য আর সম্প্রচারে ভুলের পরিমাণও কমে আসতে শুরু করে অনেক। মাঠের বাইরেও তেমন কোনো বিতর্ক হয়নি। তবে অন্য একটা প্রশ্ন উঠতে শুরু করল, দেশীদের ব্যাটে রান নেই কেন? ম্যাচের চার এক ভাগ শেষ হওয়ার সময়ে শুধু মুশফিকুর রহিম ছাড়া আর কেউ তো বলার মতো কিছু করতে পারছিলেন না।

মুশফিকের ওই ৭৫ রানের ইনিংসটাই যেন দুয়ার খুলে দিল। এরপর লিটন, তামিম, সাব্বির ; পর পর খেললেন সত্তর-আশির ঘরে তিনটি ইনিংস। তবে এবারের প্রথম সেঞ্চুরিটা এলো একজন বিদেশী লরি ইভান্সের কাছ থেকে। সেঞ্চুরি এরপর একের পর এক আসতে শুরু করল। ইভান্সের পর একই ম্যাচে রুশো-হেলস, ডি ভিলিয়ার্স, তারপর লুইস। দেশীরা রান পাওয়া শুরু করলেও ম্যাচ তো জেতাচ্ছেন বিদেশীরাই!

বোলারদের তালিকায় যখন দেশিদের জয়জয়কার, শেষ চারে এসেও দেশীদের ব্যাটে সেরকম কোনো প্রলয়নাচন নেই। গত বার ফাইনালে একা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিলেন ক্রিস গেইল। এবারও ফাইনালের আগে এদিকের রাসেল-পোলার্ড আর ওদিকের থিসারা-আফ্রিদি-লুইসদের নিয়েই বেশি কথা হচ্ছিল।

তবে তামিম ঠিক করে রেখেছিলেন অন্যকিছু। এমনই একটা ইনিংস খেলেন, ফাইনালে যেরকম কিছুর কথা শুধু স্বপ্নেই ভাবা যায়। ৬১ বলে ১৪১ রানের ইনিংসটা এমনিতে বাংলাদেশীদের টি-টোয়েন্টিতে অনেক রেকর্ডই লিখতে বাধ্য করেছে নতুন করে। সবচেয়ে বেশি রানের ইনিংস, এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ছয়, দ্রুততম সেঞ্চুরি- সংখ্যা আর কতটুকুই বোঝাতে পারে তামিমের ইনিংসকে? তবে যে বার্তাটা এই ইনিংস দিল, সেটার মহিমা আরও অনেক বড়। তামিমের নিজের মুখেই সেটি শুনুন, ‘আজকের সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে, সধারণত বড় ম্যাচে বিদেশীরা ভালো খেলে, জেতায়। আজকে একজন বাংলাদেশি জিতিয়েছে। আজকের দিনের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। একজন বাংলাদেশি খেলাটা বদলে দিয়েছে, এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। কত রান করেছি, কত কিছু করেছি, এটা ব্যাপার না। আমি আশা করি, আমার ইনিংস দেখে, অন্যরা, বিশেষ করে জুনিয়ররা অনেক কিছু শিখতে পারবে। চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে পারবে, বিদেশীদের দিকে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে না। আমরা নিজেরাই করতে পারব।’

বড় আসরে বার্তাটা খুব করেই দরকার ছিল তামিমের। মঞ্চটা বিপিএলের বাইরে আরও ছড়িয়ে আন্তর্জাতিকে নিয়ে গেলে গত বছর সেই কীর্তি বাংলাদেশের অন্তত দুজন করেছেন গত বছর। সাব্বির রহমান নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে খেলেছিলেন ৭৭ রানের ইনিংস। তবে এশিয়া কাপ ফাইনালে লিটন দাসের ১২১ ইনিংস ছাড়িয়ে গেছে সবকিছুকেই। দুবারই অবশ্য দুঃখের দহনে পুড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। ইনিংস দুইটি আর ম্যাচ নির্ধারণী হতে পারেনি।

বিপিএলের সঙ্গে অবশ্যই জাতীয় দলের তুলনা চলে না, তবে ঢাকার বোলিং আক্রমণকে দুর্দান্ত বললেও কম বলা হয়। তামিম যেমন কাল নিজেই মনে করিয়ে দিলেন, অনেক জাতীয় দলের চেয়েও ঢাকার বোলিং বেশি সমীহ জাগানো। তামিমের ইনিংস থেকে প্রেরণা নিয়েই বোধ হয়, রাসেল-পোলার্ডদের হারিয়ে যাওয়ার দিনে রনি তালুকদারও খেলে ফেললেন ৬৬ রানের আরেকটি দুর্দান্ত ইনিংস। রনি রান আউটে কাটা না পড়লে কালকের গল্পটা হয়তো অন্যরকমও হতে পারত। তামিম অবশ্য তাতে আফসোস করতেন না খুব একটা। দেশীদের যে এই ম্যাচে বার্তা দেওয়াটা বেশিই দরকার ছিল!

নিষ্প্রাণ উইকেট, দুর্বল ধারাভাষ্যে ম্লান হতে থাকা বিপিএলে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধ হয় কিছু হতে পারত না!