• বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত
  • " />

     

    • বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত

    ১৯৮৭ : ভেলেটার 'বিস্মৃত' রত্ন

    সিডনিতে একটা কার-রাইড হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের। হুডখোলা কার। ১৪ বছর পর ইংল্যান্ডের মাটিতে অ্যাশেজ জিতে এসেছে তারা। মার্ক টেইলরের সঙ্গে বসে মাইক ভেলেটা। স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে বসে টিম জোহরা। ভীড়ের মধ্যে লোকের মুখে প্রশ্ন, ‘ভেলেটার সঙ্গে ওইটা কে? জোহরার সঙ্গে ওইটা কে?” 

    টেইলর-ওয়াহ, দুজনই পরে হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক। লোকে এখন না বললেও চেনে তাদের। তবে মাইক ভেলেটা বিস্মৃত হয়ে গেছেন শীঘ্রই। হয়তো তার ইনিংসটাও। 

    ১৯৮৭ বিশ্বকাপ, ফাইনাল। ডেভিড বুনের সেই ইনিংস, যা আঠার মতো আটকে রেখেছিল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন-আপ। মাইক গ্যাটিংয়ের ক্ষ্যাপাটে ও অনেক মাশুল গোণা সেই রিভার্স সুইপ। অথবা স্টিভ ওয়াহর সেই শেষের আগের ওভার। হয়তো ইডেনের ফাইনালের কথা উঠলে আসে এসবই। তবে মাইক ভেলেটা সে দিনটার কথা ভুলতে পারেন না। কলকাতার নভেম্বরের সেই রবিবার যে তাকে দিয়েছিল ক্রিকেট-জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। 

    ভেলেটার ৩১ বলে ৪৫ রানের ক্যামিও হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্মৃত অথচ অনেক মূল্যবান এক ইনিংসগুলির একটি। সে ইনিংসের আগে একটা রান-আউটের অংশ ছিলেন ভেলেটা, আর পরে ফেলেছিলেন একটা ক্যাচ। তবে শেষ পর্যন্ত সেটা ছিল তারই দিন।  

    টুর্নামেন্টের শেষের অংশে নেওয়া হয়েছিল ভেলেটাকে, টম মুডির বদলে। ০, ৪৩, ৪৮- ফাইনালের আগে তিন ইনিংসে ভেলেটার রান। অবশ্য টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ জেতার পর থেকেই একটা আত্মবিশ্বাস ছিল অস্ট্রেলিয়ানদের, যে ম্যাচটা ভারতের বিপক্ষে তারা জিতেছিল নাটকীয়ভাবে। প্রথমে ব্যাটিংয়ের সময় জিওফ মার্শের একটা ক্যাচ হাত গলে বেরিয়ে যায় রবি শাস্ত্রির, দেওয়া হয়েছিল চার। মাঝের বিরতিতে রিপ্লে দেখে সেটাকে দেওয়া হয় ছয় হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল এক রানে। হয়তো সেটাই কাজে লেগেছিল তাদের। ফাইনালের চাপ বের করে এনেছিল তাদের সেরাটা। অন্তত ভেলেটার, “আমার চিন্তা ছিল সহজ। যদি একটাও ভাল ইনিংস পাই, সেটা যাতে আজকেই হয়।”


     


    এমনিতে ছিলেন ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ওপেনার। যদি তাৎপর্যটা বুঝতে না পারেন, তবে একবার ভাবুন জাস্টিন ল্যাঙ্গার, ক্রিস রজার্সদের কথা। আর যাই হোক- ক্যামিও বা দ্রুতগতির রান তোলা তাদের স্বভাবের সঙ্গে যায় না। তবে সেদিন ভেলেটার টেকনিক ছিল জাদুকরি। অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা হয়েছিল ধীরগতির, এরপর ১৭ রানের ব্যবধানে নেই ৩ উইকেট। ৩৯তম ওভারে ১৬৮ রানে ৪ উইকেট। ৫০ ওভারের ম্যাচ, হয়তো আজকালকার দলগুলোও সেখান থেকে ২৫৩ রানের স্কোরে খুশিই হবে। 

    তবে ১৯৮৭ সালের হিসাব তো আলাদা। ভেলেটা গিয়ে যোগ দিলেন অ্যালান বোর্ডারের সঙ্গে। দুজনের কেউই সে অর্থে ‘হিটার’ নন। ১০ ওভারে দুজন মিলে যোগ করলেন ৭৩ রান। এরপরই বোর্ডারের রান-আউট। স্টিভ ওয়াহকে সঙ্গে নিয়ে ভেলেটা শেষ ওভারে তুললেন ১১। কিভাবে সেদিন ভেলেটা তার ক্রিজের অনেক ভেতরে গিয়ে জায়গা বানিয়ে খেলছিলেন, সেটা খেয়াল করেছিলেন ওয়াহ। শুরুতে ইংলিশ স্পিনার জন এমবউরি ও এডি হেমিংস লেগ-সাইডে ফিল্ড সেট করে করছিলেন স্টাম্প ঘেঁষা দমবন্ধ অবস্থার লাইনে বল। ভেলেটার সেই ‘ইম্প্রোভাইজ’-এর আসলে বিকল্প ছিল না, তার টেকনিক যে সমর্থন করত সেটুকুই। 

    অনেক পরে স্টিভ ওয়াহ তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ওয়ানডেতে ভেলেটা ছিলেন দারুণ ‘ইম্প্রোভাইজার’। আসলে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে এটা ছাড়া উপায়ও ছিল না তার। এমনিতে দীর্ঘ-সংস্করণে বড় ইনিংস খেলে অভ্যস্থ তিনি। শেফিল্ড শিল্ডের এক ফাইনালে প্রায় ১২ ঘন্টা ব্যাটিং করে করেছিলেন ২৬৬, জিতিয়েছিলেন নিজের রাজ্যকে। 

    “আমার আসলে ক্রিজ ব্যবহার করতেই হতো। নেইল ফস্টারের একটা স্লোয়ার ছিল। হুক করেছিলাম। এরপর একটা বলের ইনসাইড দ্য লাইনে খেলে ডিফলেক্টেড হলাম। আমি শুধু লাইনের ভেতরে থেকে খেলছিলাম। আমার খেলার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছিল আমাকে”, সেদিনের ইনিংস নিয়ে বলেছেন ভেলেটা। 

    সে ম্যাচের আগে সেই বিশ্বকাপে কোনও দলই ২৫৪ তাড়া করে জেতেনি। তবে অস্ট্রেলিয়ার জয়টা অবশ্য সহজ ছিল না। ৪৯তম ওভারে স্টিভ ওয়াহ দিয়েছিলেন ২ রান, অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ৭ রানে। শেষ বলটা গিয়েছিল ভেলেটার দিকে। সেটা ধরে কিপারের দিকে ছুঁড়েছিলেন তিনি। যে সিদ্ধান্তটাকে খুবই ‘গাধামো’ বলেন ভেলেটা, কারণ ওভারথ্রোতে যে কোনও কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল! এর চেয়ে বরং বলটা হাতে ধরে রাখলেই নিরাপদ থাকতেন বেশি। 

     

     

    অবশ্য তাতে কিছু যায় আসেনি। শীঘ্রই অস্ট্রেলিয়ানরা স্টাম্প তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। স্টিভ ওয়াহ একটা বেইল দিয়েছিলেন ভেলেটাকে। ইডেন গার্ডেনসের সেই দারুণ ইনিংসের একটা স্মারক। সেদিন ঈশ্বর হয়তো ভেলেটার দিকে সুনজর দিয়েছিলেন। 


    এরপর যা ঘটেছিল-
    সে টুর্নামেন্টের আবিষ্কার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল ভেলেটাকে। তবে এরপর আর দুই বছরের বেশি ওয়ানডে ক্যারিয়ার টেকেনি- সব মিলিয়ে খেলেছেন মোট ২০ ম্যাচ। ৮ টেস্টের ক্যারিয়ারে ইনিংস ওপেন করার সুযোগ পেয়েছিলেন একবারই। 

    ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার কোচ হয়েছিলেন, তবে চুক্তির আগেই ছাড়তে হয়েছিল সে দায়িত্ব। ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষের আগেই জড়িয়ে পড়েছিলেন রিয়াল-এস্টেট ব্যবসায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি সিবিআরই-এর পার্থের রেসিডেনসিয়াল ভ্যালুয়েশনসের ডিরেক্টর এখন ভেলেটা। 


    (সিদ্ধার্থ মঙ্গার ‘হোয়েন দ্য গডস স্মাইলড অন মাইক ভেলেটা’ অবলম্বনে)