• বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত
  • " />

     

    • বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত

    ২০০৩ : ভালবাসা দিবসে ছারখার

    স্কোরবোর্ড যখন অনেক কিছু বলে


    ওয়ার্নাকুলাসুরিয়া পাতাবেন্দিগে ইউশান্থা জোসেফ চামিন্দা ভাস। 

    নামটা মুখস্থ করুন। 

    যে সময়ে আপনার মুখস্থ হলো, হয়তো ২০০৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পিটারমারিজবার্গের সিটি ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচের বয়স অতখানি হওয়ার মাঝেই ভাসের হ্যাটট্রিকটা হয়ে গেছে। আরও কিছুক্ষণ পর এক ওভার শেষ হয়েছে, বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪ উইকেটে ৫ রান। 

    এমনিতে সিটি ওভাল মাঠটা ছবির মতো সুন্দর, এমনকি বাউন্ডারির ভেতরেই দাঁড়িয়ে একটা গাছ। সে মাঠে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দুই ম্যাচের (ছেলেদের), দুটিই ২০০৩ বিশ্বকাপে। যার একটির সাক্ষী বাংলাদেশ। 

    যদি স্মৃতিমোচনের প্রযুক্তি থাকতো, বাংলাদেশ ক্রিকেট হয়তো ২০০৩ বিশ্বকাপটা ভুলে যেতে চাইত। কানাডা বা কেনিয়ার সঙ্গে হার, মাঠের বাইরের কথিত সব ঘটনা, এক দলে ‘দুই কোচের’ এর অদ্ভুত সমন্বয়- সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ ছিল যেন ভাসের সেই ওভারটা। যেদিন হান্নান সরকার, মোহাম্মদ আশরাফুল ও এহসানুল হক অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঢুকে গেছেন ইতিহাসে। 

    কানাডার সঙ্গে ম্যাচের পরদিন বাংলাদেশে ছিল ঈদ। সেটা মাটি হয়েছে। এলো ভালবাসা দিবস। সেটা হলো ছারখার। 

    ভাসের সেদিন সকাল থেকেই পিঠটা সাঁয় দিচ্ছিল না, তবুও নামলেন কিছুটা জোর করেই। প্রথম বলটা তার ট্রেডমার্ক ইনসুইং, হান্নান সরকার সেটাকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখলেন না। ম্যাচের প্রথম বল, সামনের বোলার কে- সেসব ভুলে ব্যাটটা চালালেন বুনো উল্লাসে, যেন সজোরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তার ওপর। বেরসিক বলটা গিয়ে ভাঙলো তার স্টাম্প। আউট হওয়ার পর তার স্কোরবারটা পড়লো এমন- মোহাম্মদ আল-শাহরিয়ার, ০* রান, ০ বল, ০ চার, ০ ছয়, স্ট্রাইক রেট ফাঁকা, ডিউরেশন এক মিনিট। যেন টিভি ব্রডকাস্টিংয়ের গ্রাফিক্স টিমও তৈরি হতে পারেনি তখনও। কমেন্টেটরও হান্নানকে বানিয়ে দিলেন শাহরিয়ার। ভাসের চোখেমুখে তেমন উল্লাস নেই, সাঙ্গাকারার পর জয়াবর্ধনের সঙ্গে হাই-ফাইভ চললো তার। 

    এলেন আশরাফুল। স্টাম্পের ওপরের বলটা না ড্রাইভ করলেন, না ডিফেন্ড করলেন আলতো ব্যাটে। ব্যাটের ফেস কাভারের দিকে, অথচ মোমেন্টাম ঠেলছে সোজাসুজি। ভাসের কাছে ফিরতি ক্যাচ যাওয়াটাই সে শটের উত্তম নিয়তি হয়তো। যেন উইকেটে জাদুটোনা করা আছে, এমন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আশরাফুল। ভাস বলটা শূন্যে ছুঁড়ে ছুটে এলেন। তখনও নির্লিপ্ত মুখভঙ্গি, সাঙ্গাকারার সঙ্গে হাই-ফাইভ, এরপর জয়াবর্ধনের সঙ্গে। এরপর বাকিদের সঙ্গে। 

     

     

    এলেন এহসান। বাকি দুজনের চেয়ে তার পা-টা বলের লাইনে একটু বেশি যুতসইভাবেই গেল। তবে এজড হওয়া থেকে বাঁচলেন না। দ্বিতীয় স্লিপে জয়াবর্ধনের হাতে ক্যাচ। ভাস এবার উড়োজাহাজের মতো ডানা মেলে উড়তে চাইলেন কিছুক্ষণ। জয়াবর্ধনে শূন্যে বল ছুঁড়ে সেটা ধরতে উলটো ছুটেছেন। ভাসকে প্রথমে আলিঙ্গনে বাঁধলেন দিলহারা ফার্নান্ডো। ম্যাচের বয়স তিন বল। ভাস নিয়ে নিয়েছেন তিন উইকেট। এর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কখনও দেখেনি এমন কিছু, ম্যাচের প্রথম তিন বলেই হ্যাটট্রিক পূর্ণ হয়ে গেছে তার! 

    অবশ্য গল্পটা শেষ নয়, ভাসের দীর্ঘ নামের মতো চলছেই। চতুর্থ বলে কাভার ড্রাইভে চার মারলেন সানোয়ার হোসেন। এরপর একটা ওয়াইড। এরপর মোটামুটি লেগ-মিডলে পিচ করা বলটা ঢুকছিল ভেতরের দিকে, সানোয়ার খেলতে ব্যর্থ হলেন। আম্পায়ার রাসেল টিফিন দিলেন আউট। ৬ষ্ট বলটা খেলতে এলেন অলক কাপালি। 

    ৬ষ্ঠ বলে এসে ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আল-শাহরিয়ার দেখলেন ৫ নম্বর নতুন মুখ। হয়তো সে সময় নিজের সতীর্থদের চেহারাই ভুলতে বসেছিলেন তিনি! 

    সেই শাহরিয়ারই পঞ্চম শিকার হলেন ভাসের, দলীয় ২৫ রানে। ধারাভাষ্যে রঞ্জিত ফার্নান্ডো বলে উঠলেন, আউট হয়েছেন অলক কাপালি। কে আসছেন আর কে যাচ্ছেন- বুঝেই উঠতে পারছিলেন না যেন তিনি। পরে কাপালিরই ৩৮ বলে ৩২, খালেদ মাসুদের ৬৭ বলে ২০ ও শেষদিকে মাশরাফি বিন মুর্তজার ২৩ বলে ২৮ রানের ক্যামিওতে বাংলাদেশ গিয়েছিল ১২৪ রান পর্যন্ত। সেটা তাড়া করতে মারভান আতাপাত্তু ও সনাথ জয়াসুরিয়া সময় নিয়েছিলেন ২১.১ ওভার। 

    ভাস সেদিন বোলিং শেষ করেছিলেন এমন ফিগার নিয়ে : ৯.১-২-২৫-৬। সেদিন ভাস যা করেছিলেন, সেখানে উপস্থিত কেউই হয়তো তা ভুলবেন না। কোনও বাংলাদেশী সে ম্যাচ দেখে থাকলেও হয়তো ভুলবেন না। তবে সেটা স্মরণীয় করে রাখতে পিটারমারিজবার্গের সিটি ওভাল কর্তৃপক্ষ ভাসকে দিল একটা গাছ রোপণের সম্মান, সে মাঠে সেঞ্চুরি বা পাঁচ উইকেটের মাইলফলকের রীতি এমনই।  

    হয়তো সে গাছটা এখনও আছে, ভালবাসা দিবসে বাংলাদেশকে ছারখার করে দেওয়া ভাসের বোলিংয়ের নিদর্শন হিসেবে। হয়তো কোনও ঝড়ে উপড়ে পড়েছে সেটা। তবে সে গাছের উপলক্ষ্যটা মুছে ফেলার মতো ঝড় হয়তো আসেনি এখনও। 

    এরপর কী ঘটেছিল- 
    বাংলাদেশ সে বিশ্বকাপে জেতেনি কোনও ম্যাচ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ম্যাচটি বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়াতে পেয়েছিল ২ পয়েন্ট। সেবার সেমিফাইনাল খেলেছিল শ্রীলঙ্কা।
    ভাস ক্যারিয়ার শেষ করেছিলেন ৭৬১ আন্তর্জাতিক উইকেট নিয়ে, বাঁহাতি বোলারদের মাঝে তার চেয়ে বেশি উইকেট আছে শুধু ওয়াসিম আকরামের (৯১৬)। 

     

    পুনশ্চ- ২০০০-০১ মৌসুমে ‘বেসরকারি’ সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিল বাংলাদেশ, গ্রিকুয়াল্যান্ড ওয়েস্টের সঙ্গে চারদিনের ম্যাচের পর দক্ষিণ আফ্রিকা বোর্ড প্রেসিডেন্ট একাদশের সঙ্গে তিনটি একদিনের ম্যাচ খেলেছিল তারা। এর মধ্যে একটিতে ৫১ রানে অল-আউট হয়েছিল বাংলাদেশ, চার্ল ল্যাঙ্গেভেল্ট নিয়েছিলেন ৭ রানে ৫ উইকেট। সে ম্যাচ ছিল পিটারমারিজবার্গের সিটি ওভালে।