• বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত
  • " />

     

    ১৯৯৯ : গিবস যেদিন 'বিশ্বকাপটা ফেলে দিয়েছিলেন'

    হরিষ আর বিষাদের মাঝে ব্যবধান কতক্ষণের? উৎসব আর শোকের? কিংবা উল্লাস আর বিষণ্নতার! হয়তো দিন, হয়তো রাত, হয়তো মাস। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে লিডসের হেডিংলিতে হার্শেল গিবসের জন্য এই পার্থক্য ছিল মুহুর্তের। ক্যাচ ধরেছিলেন, উদযাপন করতে গিয়ে হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল সেটা। এরপর স্টিভ ওয়াহর সেই না বলা কথাটাই হয়ে গেছে ক্রিকেট রূপকথার অংশ- “বাছা, বিশ্বকাপটাই তো ফেলে দিলে!” 

    সুপার সিক্সে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটা হারলেই বিদায় নিত অস্ট্রেলিয়া। গিবসের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলেছিল ২৭১ রান। রানতাড়ায় তীব্র গরমে ঘামের মতো টুপটুপ করে পড়তে লাগলো অস্ট্রেলিয়ার উইকেট। স্টিভ এলওর্দির নিচু হওয়া বলে বোল্ড অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। মার্ক ওয়াহ রান-আউট। ড্যামিয়েন মার্টিন পুল করতে গিয়ে দিলেন ক্যাচ। ৪৮ রানে ৩ উইকেট নেই অস্ট্রেলিয়ার, উত্তাপটা টের পাচ্ছে তারা। 

    এলেন স্টিভ ওয়াহ। ‘দ্য আইসম্যান’, বরফশীতল অধিনায়ক। সে বছরই অধিনায়কত্ব পেয়েছেন, তবে সেটা খুব সুখকর হয়ে ওঠেনি তখনও। গিবস তাকে অভ্যর্থনা জানালেন, “দেখি, চাপ সামলায় কিভাবে!” তবে ক্যারিয়ারে আর যাই হোক, চাপ শব্দটা হয়তো ছিল না স্টিভ ওয়াহর অভিধানে। যদি বেশ উত্তপ্ত আর এলোমেলো অবস্থায় থাকে দল, চাপ থাকে তুঙ্গে, তবে উদ্ধারকাজের জন্য প্রথম কলটা যাওয়া উচিৎ ওয়াহর কাছে। 

    ওপাশে রিকি পন্টিং খেলছিলেন দারুণ, ফিফটি করেছিলেন ৪৭ বলে। ওয়াহও মুডে চলে গেছেন। অস্ট্রেলিয়ার রান যখন ১৫২, ওয়াহর রান ৫৬। এলেন ল্যান্স ক্লুজনার। 

    সেই বিশ্বকাপটা ছিল ক্লুজনারের। ব্যাটিংয়ের কথা ভুলে যান, সবার আগে আসবে তার বোলিং অ্যাকশন। সেই বিশ্বকাপ দেখেছেন কিন্তু ক্লুজনারের অ্যাকশন নকল করতে চাননি, এমন দাবি করলে হয় আপনি পরীক্ষার খাতায় কোনোদিন পাশের জনেরটা কখনও দেখেন না এবং ক্রিকেটকেও পরীক্ষা ভাবেন, অথবা আপনার অ্যাকশন আগে থেকেই ক্লুজনারের মতো। 



    ক্লুজনার ঠিক ফুললেংথে করলেন না। তবে শরীর থেকে দূরেই ব্যাট নিয়ে ফ্লিক করতে গেলেন ওয়াহ। বাজে শট। সেটার মাশুলও গুণলেন- প্রায়। 

    শর্ট মিডউইকেটে গিবসের হাতে গিয়ে পড়লো সেটা, টনি গ্রেগের ভাষায় ‘লিটল ললিপপ’। গিবস ধরলেন। এরপর উদযাপনের অংশ হিসেবে শূন্যে ছুঁড়ে মারতে চাইলেন সেটা, বরাবর যা করেন। তবে ভুলটা করলেন বলের ওপর থেকে চোখটা সরিয়ে নিয়ে। বল না দেখে চোখ ফিরিয়েছিলেন ক্রিজের দিকে। হয়তো ক্লুজনারকে দেখছিলেন। হয়তো ওয়াহকে। ততক্ষণে বলটা হাত গলে বেরিয়ে গেছে তার। মোবাইল ফোনে সেইসব ‘ব্যালেন্স’ গেমের মতো, ট্রাকে করে ডিম নিয়ে যেতে হবে পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে। একটা চূড়া পেরিয়েছিলেন, বুকের মধ্যে দারুণ আশা নিয়ে যখন পরের হার্ডলসের দিকে তাকিয়েছেন, তখনোই ‘ফুস’! পড়ে গেছে সেটা! 

     

     

    ওয়াহর হাতে ব্যাটটা বেসামাল তখনও। গিবসের হাতে যাওয়ার সময় চোখটা নিয়ে যাচ্ছিলেন ব্যাটের দিকে, কী করে হলো সেটা বুঝার জন্য। ড্রেসিংরুমের দিকে প্রায় ফিরেছিলেন, আগের রাতে শেন ওয়ার্নের কথাটা যে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওয়ার্ন বলেছিলেন, গিবসের হাতে ক্যাচ গেলেও যাতে কেউ ক্রিজ না ছাড়েন সঙ্গেই সঙ্গেই, তার আগে আগেই উদযাপনের অভ্যাস আছে। সেটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বাকি সবাই। তবে সেদিন সত্য হলো ওয়ার্নের কথাটাই। 

     

    খানিক বাদেই একটা ঝাঁকি দিয়ে ঘুরে তাকালেন ওয়াহ, যেন রান নিতে যাবেন এমন একটা ভাব। এরপরই এক হাত উঁচিয়ে চিৎকার করলেন পন্টিংয়ের দিকে, তা পন্টিং রানের জন্য কল করুন আর নাইবা করুন। 

    এরপর গিবসের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বললেন ওয়াহ। উইজডেন লিখেছিল, “জনশ্রুতি অনুযায়ী ওয়াহ বলেছিলেন, ‘আহা, তুমি মাত্র বিশ্বকাপটাই ফেলে দিলে’!” অবশ্য ওয়াহ পরে তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, গিবসে তিনি এরপর কিছু একটা বলেছিলেন ঠিকই, তবে বিশ্বকাপ ফেলে দেওয়ার কথা নয়। বরং বলেছিলেন, “আশা করি এটা বুঝতে পেরেছ, তোমার দলকে ম্যাচটা হারিয়ে দিলে তুমি এইমাত্র।” 

    ওয়াহ করলেন ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় সেঞ্চুরি, দুই বল বাকি থাকতে জিতল অস্ট্রেলিয়া। নিশ্চিত হলো সেমিফাইনাল। তবে গিবসের ‘দায়’ শুধু সে ম্যাচ হেরেই শেষ হলো না। এজবাস্টনে তিনদিন পর সেমিফাইনালটা হলো টাই। সুপার সিক্সের ম্যাচ জিতেছিল বলে ‘হেড-টু-হেডে’ এগিয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া গেল ফাইনালে। 

    এরপর কী ঘটেছিল- 
    এরপর এজবাস্টনে হওয়া দুই দলের সেমিফাইনালটা অনেকের মতেই বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ। সেবার শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, আর ২০১৫ সাল পর্যন্ত সেমিফাইনালের বাধা কখনও টপকাতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা।