• বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত
  • " />

     

    ১৯৯৯ : গণক কবুতর, ভয়ঙ্কর কবুতর

    প্রায়ই বলা হয়, গ্লেন ম্যাকগ্রা একটা মেশিনের নাম। যে মেশিনের বৈচিত্র খুব বেশি নেই, তবে নিখুঁত মুন্সিয়ানা চোখ ঝলসে দেয়। হয়তো এমন মেশিনের পক্ষেই করা সম্ভব অবশ্যম্ভাবী এক ভবিষ্যদ্বাণী। অ্যাশেজ আসলেই তিনি বলে বসেন, অস্ট্রেলিয়া জিতবে ৫-০তে। সেসবের কয়েকটি হয়তো মিলেও যায়, ইংল্যান্ডের দুর্দশায়। 

    তবে ৩০ মে, ১৯৯৯ সালে 'পিজিয়ন' ডাকনামের সেই মেশিনের ড্রিলের নিচে পড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যে ক্ষত হয়েছিল তাদের, তাতে শেষ হয়ে গিয়েছিল সুপার সিক্সে ওঠার স্বপ্ন। এবং এই আক্রমণের ব্যাপারটা আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন ম্যাকগ্রা! 

    দুই বছর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ম্যাকগ্রা ছিলেন দুর্দান্ত। অথচ দুই বছর পর বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কেমন ম্লান তিনি। প্রথম চার ম্যাচে নিলেন মোটে পাঁচ উইকেট। পরের ম্যাচটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। ব্রায়ান লারার সঙ্গে ক্যারিয়ারজুড়েই একটা দ্বৈরথ ছিল তার। প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে পরিকল্পনা তো থাকবেই, অন্তত তার উইকেটের মূল্য তো অনেক। তবে ম্যাকগ্রা ঘোষণা দিলেন প্রকাশ্যে। 

    পত্রিকায় নিজের কলামে লিখলেন, ব্রায়ান লারার উইকেটটা নেবেন তিনি। সঙ্গে নেবেন পাঁচ উইকেট। 

    টসে জিতে ম্যানচেস্টারের মেঘলা আকাশের নিচে ফিল্ডিং নিলেন স্টিভ ওয়াহ। প্রথম ওভার ম্যাকগ্রা করলেন মেইডেন, পরের ওভারে দিলেন পাঁচ রান। তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটা অফস্টাম্পের বাইরে, শেরউইন ক্যাম্পবেল খেলার চেষ্টা করলেন না। পরের বলটা অফস্টাম্পের ওপর, শর্ট অফ আ লেংথ। এই লেংথটা যেন ম্যাকগ্রার নিজের সম্পত্তি। না খেলে উপায় থাকলো না ক্যাম্পবেলের, দ্বিতীয় স্লিপে বাকি কাজটা করলেন ওয়াহ। 

    এলেন জিমি অ্যাডামস। প্যাড-আপ করে করে তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘প্যাডামস’, কাল হলো সেটাই। এলবিডব্লিউ। হ্যাটট্রিক বল, এলেন ব্রায়ান লারা। আবার প্যাডের ওপর করলেন ম্যাকগ্রা, ফ্লিক করলেন লারা। ম্যাকগ্রার সঙ্গে লড়াইয়ের একেবারে শুরুর সার্ভে পয়েন্ট লারার। তবে পুরো গেমটাই তো বাকি।


     


    লারা করলেন এরপর ৯ রান। ম্যাকগ্রার পঞ্চম ওভারের দ্বিতীয় বলটা পড়লো লেগ আর মিডলে। লারাকে সেটা ঠেললো ব্যাকফুটে। যতক্ষণে স্কয়ার্ড আপ হয়ে ব্যাট নামিয়ে এনেছেন, তার অফস্টাম্পের শীর্ষ এলোমেলো হয়ে গেছে। ম্যাকগ্রা উল্লাসে মাতলেন, লারার সঙ্গে গেমটা জেতা হয়ে গেছে তার। তবে নিজের কথা অনুযায়ী আরও দুই উইকেট বাকি তখনও। 

    এরপর শেন ওয়ার্ন, টম মুডি ও ড্যামিয়েন ফ্লেমিং মিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বানালেন ৭০ রানে ৭ উইকেট। ম্যাকগ্রা ফিরলেন। মারভিন ডিলন দেখালেন এলবিডব্লিউর সংজ্ঞার ভিডিওচিত্র। 

    রিডলি জ্যাকবস ওপেনিংয়ে নেমেছিলেন, তাকে রেখেই ফিরেছেন সবাই। রিওন কিংয়ের সঙ্গে ১৭ রানের পর কোর্টনি ওয়ালশের সঙ্গে তুললেন ২২। আবার এলেন ম্যাকগ্রা। তার ফুললেংথের বলটা অসহ্য ঠেকলো ওয়ালশের। ম্যাকগ্রা নিলেন নিজের পঞ্চমটি। 

    ৮.৪-৩-১৪-৫। এর মধ্যে একটি লারার। ম্যাকগ্রা ম্যাচের আগেই নিজের কলামে যা লিখেছিলেন। 

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ হলো ১১০ রানেই। তবে সে রান তাড়া করতে অস্ট্রেলিয়া খেললো ৪১তম ওভার পর্যন্ত। স্টিভ ওয়াহ ও মাইকেল বেভান শেষ ১৯ রান তুলেছিলেন ১৩ ওভার মিলিয়ে। সেখানেও ছিল একটা উদ্দেশ্য। সে টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, সুপার সিক্সের টেবিলে কোনও দলের পয়েন্টের সঙ্গে তাদের সঙ্গী অন্য দলের বিপক্ষে গ্রুপপর্বে জেতা ম্যাচের পয়েন্টও যোগ হবে। পয়েন্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমান ছিল নিউজিল্যান্ড, যাদের সঙ্গে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ উঠলে তারা পেতো বাড়তি দুই পয়েন্ট, শ্লথগতির রানতাড়া ছিল সে কৌশলেরই অংশ। 

     

     

    ব্রায়ান লারাও ব্যাপারটা জানতেন, তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডের দর্শকরা ঠিকই দুয়ো দিয়েছিলেন সেদিন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সুপার সিক্সে নিয়ে যেতে সফল হয়নি অস্ট্রেলিয়া, দর্শকদের দুয়ো ছাপিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডের সেই ম্যাচটা হয়ে আছে ম্যাকগ্রার ভয়ঙ্কর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর। যেটা সফল করতে তিনি ছিলেন মেশিনের মতোই নিখুঁত। 

    এরপর কী ঘটেছিল- 
    ১৯৯৬ সালের পর সেবারও তাই অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপের পরের ধাপে যাওয়া হয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ম্যাকগ্রা খেলেছেন ২০০৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত, সেবারই ওয়াসিম আকরামের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট হয়েছিল তার। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৭১ উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল বোলার তিনিই।