• বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত
  • " />

     

    • বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত

    ১৯৯৯ : ওয়ার্নের ফাইনাল, অমরত্বের পথে অস্ট্রেলিয়া

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৯৯। এ সিরিজের অন্তত দুটি ইনিংস ঢুকে গেছে ব্রায়ান লারার কিংবদন্তী-পোর্টফোলিওতে। প্রথম টেস্ট জেতার পরও অস্ট্রেলিয়া ২-১ এ পিছিয়ে। তৃতীয় টেস্টের আগে টিম মিটিং, যেখানে ঠিক করা হবে দল। বিদেশ সফর বলে নির্বাচক তিনজন-- অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ, সহ-অধিনায়ক শেন ওয়ার্ন ও কোচ জিওফ মার্শ। ওয়াহ বললেন, পরের টেস্টে তিনি ওয়ার্নকে চান না। মার্শ ঠিক মানলেন না। ঠিক করা হলো, সে সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে থাকা অ্যালান বোর্ডারের পরামর্শ নেওয়া হবে। বোর্ডারেরও পরামর্শ, অন্তত অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের প্রতি ওয়ার্নের অবদানের কথা চিন্তা করেও তাকে দলে রাখা উচিৎ। এর আগে কাঁধের অস্ত্রোপচার হয়েছিল ওয়ার্নের, সেটার পর পুরো ছন্দটা ঠিক ফিরে পাননি তখনও। ওয়ার্নেরও আশা ছিল, অধিনায়ক তার পক্ষে কথা বলবেন। 

    তবে ওয়াহ অনড়। শেষ টেস্টে ওয়ার্ন খেললেন না। 

    সে সফরের আগে সিগারেটের বদলি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা নিকোরিটের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ওয়ার্নের, তিনি সিগারেট ছেড়ে দেবেন বলে। যে রাতে বাদ পড়া নিশ্চিত হলো, ড্যামিয়েন মার্টিন ও ব্রেন্ডন জুলিয়েনের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিলেন ওয়ার্ন। সেখানেই মার্টিনের কাছ থেকে নিয়ে ধরিয়েছিলেন সিগারেট, সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। যোগ হলো ওয়ার্নের ক্যারিয়ারে আরেক দফা বিতর্ক। তবে নিকোরিট আগেই বলে দিয়েছিল, প্রথম দফায় ৮৫ শতাংশ ধূমপায়ীই ছাড়তে পারেন না। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা মিটমাট করেছিল নিকোরিটই। 

    অস্ত্রোপচারের ধকল, দল থেকে বাদ পড়া, সিগারেট কেলেঙ্কারি- ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ওয়ার্ন এসেছিলেন এসব মাথায় রেখেই। অস্ট্রেলিয়ার মতো শুরুতে তার পারফরম্যান্সও ছিল সাদামাটা। ভুগছেন তিনি, ভুগছেন ওয়াহ, ভুগছে অস্ট্রেলিয়া। নির্বাচক ট্রেভর হন্সের ফোন পেলেন ওয়ার্ন, “যদি স্টিভ রান না করে বা অস্ট্রেলিয়া পরের ধাপে না যায়, তাহলে তাকে দল থেকে বাদ দিচ্ছি আমরা। তুমি হচ্ছো অধিনায়ক।” 

    ওয়ার্নের অবশ্য তখন সেসব ভাবার সুযোগ নেই। দল কিভাবে ট্র্যাকে ফিরবে চিন্তা সেটাই। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ সুপার সিক্সে অন্য বোলাররা যেখানে ৪.৯০ এর নিচে রান দিলেন না অস্ট্রেলিয়ার, ওয়ার্ন বোলিং করলেন ৩.৩০ ইকোনমিতে। সঙ্গে ওয়াহর সেই ইনিংসে সেমিফাইনাল গেল অস্ট্রেলিয়া। 



    ওয়ার্ন পেয়ে গেলেন নিজের মঞ্চকে। প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকা ভুগলো তার জাদুকরী বোলিংয়ে। ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অবশ্য তেমন জাদু দরকার হলো না, ওয়ার্ন শুধু দেখালেন তার মাস্টারক্লাস। 

    লর্ডসে মেঘাচ্ছন্ন কন্ডিশনেও সেদিন পাকিস্তান অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম কেন বোলিং নিয়েছিলেন, সেটা একটা বিস্ময়। সাইদ আনোয়ার কয়েকটা দারুণ শট খেললেও পেসাররা শুরুর ক্ষতিটা করলেন পাকিস্তানের। এলেন ওয়ার্ন। 

    প্রথম শিকার ইজাজ আহমেদ। হয়তো সেটা গ্যাটিং বলের মতো বিখ্যাত নয়, সেমিফাইনালে গিবসের বিপক্ষে করা জাদুকরী বল নয়, তবুও লেগস্পিনের পারফেক্ট ডেলিভারি। লেগস্টাম্পে পিচ করলো বলটা, লেংথ ধন্দে ফেলে দিল ইজাজকে, বন্দি হয়ে রইলেন তিনি ক্রিজে। এরপর তীক্ষ্ণ টার্ন, ভাঙলো গিয়ে অফস্টাম্পের চূড়া। ওয়ার্নের বল ঘুরাতে আসলে উইকেটের প্রয়োজন হয় না, দরকার পড়ে শুধু একটা বলের। 

    এরপর মইন খান কট-বিহাইন্ড। সুইপ করতে গিয়ে অ্যারাউন্ড দ্য লেগে এলবিডব্লিউ শহিদ আফ্রিদি। তুলে মারতে গিয়ে মিড-উইকেটে ক্যাচ দিলেন আকরাম। পাকিস্তান এরপর গুটিয়ে গেল ১৩২ রানে। ওয়ার্নের বোলিং ফিগার, ৯-১-৩৩-৪। 

     

     

    এখনও ১৯৯৯ বিশ্বকাপের কথা আসলে ফাইনালের চেয়ে বেশি কথা হয় সেই সেমিফাইনাল নিয়ে। এটা এমন এক ম্যাচ ছিল, যা ভুলিয়ে দিয়েছিল হয়তো বাকি সব ম্যাচই। তবে ওয়ার্ন ফাইনালে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন পাকিস্তানকে। তিন বছর আগে একজন অরবিন্দ ডি সিলভা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ট্রফিটা। চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপের আগেই আরেক কেলেঙ্কারিতে বাড়ি ফিরেছিলেন ওয়ার্ন। বিশ্বকাপের আক্ষেপ পূরণের জন্য তাই ওয়ার্নের ছিল সেটিই শেষ সুযোগ। সে সুযোগটা তিনি কিভাবেই না কাজে লাগিয়েছিলেন! 

    পাকিস্তানের দেওয়া লক্ষ্য পেরিয়ে যেতে অস্ট্রেলিয়ার লাগলো ২১ ওভারেরও কম। শেষ শটটা ছিল ড্যারেন লেম্যানের ব্যাট থেকে চার। এর আগে লর্ডসের বিখ্যাত সেই ড্রেসিংরুম ব্যালকনিতে অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকালে মনে হতে পারে, হয়তো চলছে রুদ্ধশ্বাস কোনও ম্যাচ। আদতে তারা শ্বাস আটকে রেখেছিলেন উল্লাসে মাতবেন বলে। 

    লেম্যান চারটা মারলেন। উদ্বাহু উঠে দাঁড়ালেন সবাই। ওয়াহর হাতে গ্লাভস, উইকেট পড়লে ব্যাটিংয়ে নামার কথা তার। ওয়ার্ন তার ট্র্যাকসুটে। খানিক বাদেই আলিঙ্গনে বাঁধলেন ওয়াহর সঙ্গে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক, অস্ট্রেলিয়ার সহ-অধিনায়ক। টিকে গেল ওয়াহর অধিনায়কত্ব, শেন ওয়ার্ন হয়ে থাকলেন অস্ট্রেলিয়াকে পূর্ণ মেয়াদে নেতৃত্ব না দেওয়া সেরা অধিনায়ক। তাতে কী, একটা বিশ্বকাপ তো পাওয়া হলো তার! আগের সফরে দল থেকে বাদ পড়ে গিয়ে যদি বিশ্বকাপ ফাইনালে ম্যাচসেরা হওয়া যায়, মন্দ কী। 

    এরপর কী ঘটেছিল- 
    লর্ডসের ফাইনাল ছিল বিশ্ব ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের আগমণী-বার্তা। তারা এরপর হয়ে উঠেছিল ‘ইনভিনসিবল’, টানা ১৬টি টেস্ট জয়ের বিশ্ব রেকর্ড ছিল তাদের। ১৯৯৯ সালের পর বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া হেরেছিল ২০১১ সালে গিয়ে।