• বিশ্বকাপের ক্ল্যাসিক মুহুর্ত
  • " />
    X

     

    ২০০৩ : সেঞ্চুরিয়নে শচীনের স্বর্গীয় ইনিংস

    ১৯৯৯, কলকাতা। 

    রাহুল দ্রাবিড় ফিরছেন বোল্ড হয়ে, তবে খানিক বাদেই চিৎকার করে উঠলো ইডেন গার্ডেনস। ভারতের কাছে এই দৃশ্যটা পরিচিত, যখন শচীন নামেন, তখন কেউ চুপ করে থাকেন না। এক বল পর ইডেনে পিনপতন নীরবতা, শুধু শোনা যাচ্ছে একজনের চিৎকার- শোয়েব আখতার। ইডেনে সেদিন ভিভিএস লাক্সমানের পরে পরপর দুই বলে দ্রাবিড়-শচীনকে বোল্ড করে শোয়েব দিয়েছিলেন তার আগমণী বার্তা। 

    চার বছর পর, সেঞ্চুরিয়ন। শচীন চিৎকার করলেন না, তবে তার ব্যাটটা কথা বলতে পারলে সেদিন সেটা থেকে বের হতো একটা আড়াই ঘন্টার সঙ্গীত-আয়োজন। সেটাতে শোয়েবরা মুগ্ধ হতে পারলেন কিনা, নিশ্চিত নয়, তবে স্তব্ধ হয়ে গেলেন নিশ্চিতভাবেই। 

    ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানের সেই ম্যাচ ঘিরে উন্মাদনা শুরু হয়েছিল ফিক্সচার নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই। এমনকি এই ম্যাচ নিয়ে শচীনও পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছিলেন অনেকদিন আগে, আগের ১২ রাত নাকি ঠিকঠাক ঘুমাতেই পারেননি তিনি এই ম্যাচের চাপে! আগের তিন বছর পাকিস্তান-ভারত খেলেনি কোনও ওয়ানডে, সেটা উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও। সে ম্যাচে থাকলো উত্তেজনার সব উপাদানই, তবে আলাদা করে থাকলেন টেন্ডুলকার আর তার এক ‘মাস্টারক্লাস’। 

    সাঈদ আনোয়ারের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তান তুলেছিল ২৭৩ রান। বিশ্বকাপ এর আগে কখনও ২২২ রানের বেশি তাড়া করেনি ভারত, সঙ্গে পাকিস্তানের বোলিং লাইন-আপটা একবার পড়ুন- ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার। পাকিস্তান এগিয়েই ছিল। 

     

     

    ওয়াসিম প্রথম ওভারে দিলেন ৯ রান। শোয়েব এলেন, প্রথম বল লেগসাইড দিয়ে ওয়াইড। এরপরের চার বলে এক ওয়াইডসহ ৩ রান। আবার স্ট্রাইকে শচীন, এরপরের তিন বলে শচীনের তিন শট হয়ে থাকলো বিশ্বকাপে পাকিস্তান-ভারত লড়াইয়ের প্রতীকী ছবি, হয়ে থাকলো কেন শচীন আর সবার চেয়ে আলাদা তার অন্যতম এক ব্যাখ্যা হিসেবে। 



    অফস্টাম্পের বেশ বাইরে শর্ট করলেন শোয়েব। শচীন চাইলেই সেটা ছেড়ে দিতে পারতেন, ছেড়ে দিলে হতে পারতো ওয়াইডও। করলেন আপার কাট। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে ছয়। শচীনের ফ্রন্টফুট মাটির একটু ওপরে, হেলমেটের কোণ দিয়ে তাকিয়ে আছেন বলের গতিপথের দিকে, বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ছবি হয়ে আছে সেটি। 

    পরের বলে শোয়েব গেলেন স্টাম্পের ওপর, মিডল বরাবর। শচীন ফ্লিক করলেন, আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা কারও পক্ষে সেটা মিস করার কথা নয়। এরপর এলো সেই শটটা। শোয়েব আবার করলেন স্টাম্পের ওপর, ঘন্টায় ১৫৪.১ কিলোমিটার বা ৯৫.৮ মাইল গতির। পদার্থের গতির চূড়ান্ত রূপ দেখালেন শচীন, ভরবেগের নিত্যতার সূত্র ক্রিকেটীয় রূপ পেলো আরেকবার। শচীন ব্যাটটা নামিয়ে আনলেন। কনুইয়ের খেল নেই, পা বেরুলো না। ব্যাটের ফলো থ্রু নেই, নেই কোনও বৃত্তচাপ ধরে এগুনো। শট যেখানে শুরু হলো, শেষ হলো সেখানেই। যেন স্বর্গীয় এক শট, যেটা ঠিক করা আছে ওপর থেকে, সবার উর্ধ্বে থেকে। 

    মিড-অন ধরে গেল বলটা, ম্যাচজুড়েই পাকিস্তান দলকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টায় থাকা অধিনায়ক ওয়াকার ইউনুসও হাল ছেড়ে দিলেন। সেঞ্চুরিয়নে ভারত সমর্থকদের উল্লাস পেল আরেক মাত্রা। তিন বলে শচীন দেখালেন এক মাস্টারক্লাস।

    ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন শেষ হলো, তবে শচীন বাউন্ডারি খেলতেই লাগলেন। মিড-অফে একটা ক্যাচ ফেলেছিলেন আব্দুল রাজ্জাক, বৃত্তের বেশ সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় নাগাল পাননি। সেদিন শচীনেরও নাগাল পায়নি পাকিস্তান। কাভারকে বানিয়ে নিয়েছিলেন নিজের পেটেন্ট করা সম্পত্তি। 

    শেষ পর্যন্ত শোয়েবের বাউন্সারেই থামলেন শচীন, বেশ কিছুক্ষণ ধরেই হ্যামস্ট্রিংয়ের কারণে ভুগতে থাকা তিনি সেই বলের আগেই নিয়েছিলেন রানার। তবে রানারের সহায়তা নেওয়া হলো না তার। অবশ্য এর আগেই করলেন ৭৫ বলে ৯৮, ১২ চার, ১ ছয়। 

    ২০০৩ সালের মার্চের এক তারিখের জন্য শচীন প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন অনেক দিন থেকে। শুধু পাকিস্তানেরই বোধহয় প্রস্তুতি ছিল না তার এমন ইনিংসের জন্য। 

    এরপর কী ঘটেছিল- 
    ভারতের সুপার সিক্স নিশ্চিত হয়েছিল সে জয় দিয়ে, সে বিশ্বকাপে তারা খেলেছিল ফাইনাল। শচীন হয়েছিলেন পরে টুর্নামেন্টসেরা। আর পাকিস্তান বিদায় নিয়েছিল বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকেই।