• বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব
  • " />

     

    কিক অফের আগে : কাতারের বিপক্ষে বাংলাদেশের 'ডে আউট'

    কবে, কখন
    বাংলাদেশ-কাতার
    বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ বাছাই, দ্বিতীয় পর্ব
    গ্রুপ ‘ই’
    বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, সন্ধ্যা ৭টা


    দেশের ফুটবলের সঙ্গে হয়ত আপনার দূরত্ব অনেক হয়ে গেছে। হতাশ হয়েছেন, আশা ছেড়েছেন। নইলে এখনও স্বপ্ন দেখে যাওয়া গুটিকয়েক মানুষের ভেতর হয়ত আপনিও আছেন। এদিক বা ওদিক, যে দলেই আপনার স্থান হোক না কেন ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় আপনি স্টেডিয়াম পাড়ায় একবার ঢুঁ মারতে চাইবেন। নয় টিভির সামনে বসবেন। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একবার হলেও আপনার চোখে পরবে ম্যাচের খবর। দেশের ফুটবলে তো এমন দিন সহসাই আসে না।

    এমন দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে জেমি ডে-কেও। বাংলাদেশের দায়িত্ব যখন বুঝে নিয়েছিলেন তখন এই দলটা ধুঁকছে রীতিমত। ৪০ বছর বয়সী ব্রিটিশ ভদ্রলোক জাদু জানেন না। রূপকথার কোনো গল্প লেখা হয়নি তার বাংলাদেশে। বাংলাদেশ জাতীয় দল তার কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক। ডাগ আউটে থাকবেন তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে, অন্য ডাগ আউটে কাতার কোচ ফেলিক্স সানচেজ। বড়সড় অঘটন না ঘটলে যিনি থাকবেন ২০২২ সালের বিশ্বকাপের ডাগ আউটে। ডের জন্য দারুণ এক দিন।

    কাতারের স্প্যানিশ কোচ সানচেজ ছিলেন বার্সেলোনার বয়সভিত্তিক দলের কোচ। সেখান থেকে কাতারের বয়সভিত্তিক দল হয়ে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছেন। এখনকার যে দলকে ঘিরে কাতারিরা বিশ্বকাপ স্বপ্ন বুনছে সেটা সানচেজের নিজ হাতে গড়া। ডে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বছর দেড়েক আগে। বাংলাদেশ আর কাতারের ফিফা র‍্যাঙ্কিং যথাক্রমে ১৮৭ ও ৬২, দুই কোচের অভিজ্ঞতার পার্থক্যও তেমন। তবে এই দুইজন এর আগে একবার মুখোমুখি হয়েছেন, এশিয়ান গেমসে। সানচেজের নাম বিশ্বজুড়ে যতবারই উচ্চারিত হোক, ওই লড়াইয়ে জয়ের গর্বটা ডের। আর একান্তভাবে বাংলাদেশের।

    বিশ্বকাপ খেলা কাতারের নিশ্চিত। মূলত এশিয়া কাপে জন্য বাছাই পর্ব খেলছে কাতার। এশিয়ার বর্তমান চ্যাম্পিয়নও তারা। বাছাইপর্বে প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর অবশ্য বড় এক ধাক্কা খেয়েছে সানচেজের দল। ভারতের সঙ্গে ঘরের মাঠে ড্র করতে হয়েছে তাদের। আফগানদের দুর্বল প্রতিপক্ষ জেনেও কাতার দয়া দেখায়নি, ভারতের বিপক্ষেও বিপরীত কিছু ঘটেনি। সেদিন একটি গোল শুধু জোটেনি কাতারের কপালে। ৩১ টি গোলের সুযোগ তৈরি করে, মোট ১০ বার গোলে শট চালিয়েও আশা পূরণ হয়নি কাতারের।



    বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কাতার কতোখানি শক্তিশালী? বর্ণনা শুরু করা যাক। বছর শুরু হয়েছিল তাদের এশিয়া কাপ জিতে। এশিয়ার কোনো দলের বিপক্ষে এখনও তারা হারেনি এ বছর। ১০ ম্যাচ খেলে কাতার গোল দিয়েছে মোট ২৫টি, আর খেয়েছে মাত্র একটি। এর ভেতর কোপা আমেরিকা খেলা হয়ে গেছে তাদের। ভারত যা করেছে সেটা একটা ‘মিরাকল’। মাত্র চারটি দেশ কাতারকে গোল করা থেকে বিরত রেখেছে চলতি বছরে। একটার নাম ভারত। বাকিগুলো যথাক্রমে, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। বাংলাদেশ কাদের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছে সেটা আপনি জানতেন হয়ত, এরপর বুঝতেও পারার কথা।


    আরও পড়ুন : 'নার্ভাস' না হয়ে দেশের জন্য খেলা উপভোগ করতে বললেন জামাল


    বাংলাদেশের জন্য কাজটা তাই সত্যিকার অর্থে দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার পথ পেরুনোর মতো। বাংলাদেশের কাছে শুধু আত্মবিশ্বাস। বছরটা ভালো গেছে বাংলাদেশেরও। এ বছর ৬টি ম্যাচ খেলে জামাল ভুঁইয়াদের হার মাত্র একটিতে। প্রতিপক্ষ দলগুলো র‍্যাংকিংয়ের নিচের দিকের, তবে তাতে বাংলাদেশের অর্জন খাটো করে দেখার উপায় নেই। আট ম্যাচের একটিতেও প্রতিপক্ষরা একটির বেশি দুইটি গোল দিতে পারেনি বাংলাদেশের জালে। ৫টি ক্লিনশিট পেয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ ৮ গোল করে বাংলাদেশ গোল হজম করেছে মাত্র দুইটি।

    ডের অধীনে বাংলাদেশ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে না। চোখ ধাঁধানো ঝলকও নেই। তবে দলটা ধীরে ধীর রুপান্তর হচ্ছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে গোল পেতে হলে আপনাকে কষ্ট করতে হবে এখন। ডের বাংলাদেশ দল অন্তত এই একটা জায়গায় উন্নতি করেছে। অধিনায়ক জামাল তাই অভয় দিয়েছেন, বলেছেন দিন বদলছে।

    এসব কিছু এক নিমিষেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে কাতারের আক্রমণের ঝটকায়। দলের আক্রমণভাগে কাতারের আছে দারুণ কিছু ফুটবলার। আকরাম আফিফ বয়সে তরুণ, এরই মধ্যে তার ভিয়ারিয়াল, স্পোর্টিং গিখনের মতো ক্লাবের অংশ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। আরেক স্ট্রাইকার আলমোয়েজ আলিকে ধরা হচ্ছে এশিয়ার অন্যতম সেরা। আল হাইদোস ও বৌদিয়াভ খৌকিরা আক্রমণে ওঠেন একেবারে তেড়েফুঁড়ে। আর আয়োজক হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা পেলেও, নিজেদের প্রমাণ করার একটা প্রচেষ্টা আছে কাতারের। সেটা হয়ত চলবে আরও বহুদিন। ভারতের বিপক্ষে ড্রয়ের পর ক্ষুধাটা তাই আরও বেড়েছে তাদের।  


    আরও পড়ুন : কাতারের বিপক্ষে জয় থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজবেন জেমি ডে


    কিন্তু এমন প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করার দিনে ডে পড়েছেন অন্য ঝামেলায়। দলের নিয়মিত তিন সেন্টারব্যাক পড়েছেন ইনজুরিতে। বড় ম্যাচে দলের উন্নতির ছাপ দেখানোর যে স্বপ্ন ডে দেখছিলেন সেটা ম্যাচ শুরুর আগেই মুখ থুবড়ে পড়ার দশা তাই। প্রতিপক্ষ তো আছেই, নিজের সেরা দলটা নিয়েও কাতারের বিপক্ষে খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের।

    এই দলের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গা জামাল ভূঁইয়া। কাতারের বিপক্ষে এশিয়ান গেমসে তার ম্যাচ জেতানো গোলের কথা ভুলে যাননি আপনি। বাংলাদেশ কোচ ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেই বলেছেন ওই দলটা ছিল অনুর্ধ্ব-২৩ দল। আর এখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দৃশ্যপট আলাদা। সেটা জানেন জামালও। তবুও স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সমর্থকেরা যা শুনতে চায় সেটাই বলেছেন তিনি, “ভারত পারলে আমরা কেন নয়?”

    জামালের যুক্তির পিঠে অন্য যুক্তি দেওয়া যায়, এফোঁড়-ওফোঁড় বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দেওয়া যায় বাংলাদেশ আসলে সমীকরণেই নেই। কিন্তু দিনশেষে সেসব নিরর্থক। অধিনায়ক যেমন তরুণ সতীর্থদের ম্যাচটা উপভোগ করতে বলছেন, আপনিও দর্শক হয়ে সেটাই করুন। এখানে হারানোর কিছু নেই বাংলাদেশের। আর সব হারানোর উপকরণ হাজির কাতারের জন্য। এই উপকরণের একটা অংশ আপনিও।  

    দলের খবর
    সুশান্ত ত্রিপুরা ভুটানের বিপক্ষে ইনজুরিতে পড়েছিলেন। তিনি নেই দলে। তপু বর্মণ তো লিগামেন্ট ইনজুরিতে পড়ে বহুদিন ধরেই নেই। টুটুল হোসেন বাদশা গত কয়েকদিন অনুশীলন করেছেন। তবে একাদশে খেলার মতো ফিটনেস অর্জন করতে পেরেছেন কী না সেটা নিয়ে সংশয় আছে। আর পাঁচ দিন পর ভারতের বিপক্ষে আরও একটি ম্যাচ থাকায় তাকে নিয়ে কোচ ঝুঁকিও নিতে চাইবেন না।

    ইয়াসিন খানের সঙ্গে তাই সেন্টারব্যাক পজিশনে জুটি বাঁধার কথা রিয়াদুল হাসানের। ভুটানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক হয়েছে তার কিছুদিন আগে।

    লম্বা থ্রো বাংলাদেশের জন্য বড় অস্ত্র। রায়হান হাসান না বিশ্বনাথ ঘোষ কে নেবেন লম্বা থ্রো সেটা নির্ভর করছে ডের সিদ্ধান্তের ওপর। ডে অবশ্য বলছেন কাতারের বক্সে আক্রমণাত্মক মেজাজে না থাকতে পারলে লম্বা থ্রো অকার্যকর।

    কাতারের মুখোমুখি হওয়ার আগে দুইটি প্রস্তুতি ম্যাচে ফরোয়ার্ড নাবিব নেওয়াজ জীবন খেলেছেন সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবে।  আক্রমণের প্রথম লাইনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাদ উদ্দিন। কাতারের বিপক্ষেও এই দুইটি পজিশনে পরিবর্তনের সুযোগ কম।       

    কাতার দলে চোটের সমস্যা নেই। ভারতের বিপক্ষে আকরাম আফিফ শৃঙ্খলা জনিত কারণে বাদ পড়েছিলেন। তাতে ৩-৫-২ থেকে সরে ভারতের বিপক্ষে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলেছিলেন কাতার কোচ। আকরাম আবার দলে ফিরেছেন। যদিও ম্যাচের আগেরদিন সংবাদ সম্মেলনে কাতার কোচ স্পষ্ট করে বলেননি এবার আকরাম খেলবেন কী না। তবে দলের সঙ্গে যেহেতু এসেছেন, ‘শৃঙ্খল’ হয়েই ফেরার কথা। বাংলাদেশকে তাই পুরো শক্তির কাতারকেই মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

    সম্ভাব্য একাদশ
    বাংলাদেশ
    আশরাফুল ইসলাম রানা, বিশ্বনাথ ঘোষ, ইয়াসিন খান, রিয়াদুল হাসান রাফি, রহমত মিয়া, জামাল ভূঁইয়া, সোহেল রানা, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, নাবিব নেওয়াজ জীবন, বিপলু আহমেদ, সাদ উদ্দিন

    হেড টু হেড
    আন্তর্জাতিক ম্যাচে এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো কাতারের বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ। ১৯৭৯ সালে প্রথম দেখায় দুই দলের ম্যাচ ড্র হয়েছিল। এরপরের দুইবারই হেরেছে বাংলাদেশ। ২০০৬ সালে এশিয়া কাপের বাছাইপর্বে একই গ্রুপে পড়ায় দুইদল আরও দুইবার খেলেছিল একে অপরের বিপক্ষে। ঘরের মাঠে ৪-১ গোলে হারের পর কাতারে গিয়ে বাংলাদেশ হেরেছিল ৩-০ ব্যবধানে।