• বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব
  • " />

     

    শুধু গোলটাই পেল না বাংলাদেশ

    বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ভরা গ্যালারিতে স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন মাঠের এগারো জন বাংলাদেশি। বাংলাদেশের আশা পূরণ হয়নি। কিন্তু নতুন স্বপ্ন দেখার যোগান হয়েছে। এশিয়ার চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে বাংলাদেশ লড়াই করেছে পাল্লা দিয়ে। ২-০ গোলের স্কোরলাইনটা সে গল্প বলছে না, কখনও বলবেও না। কিন্তু বাংলাদেশ যেভাবে কাতারের বিপক্ষে একের পর এক আক্রমণ করে গেছে সেটা পুঁজি করে তো স্বপ্ন দেখাই যায়। বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ বাছাইয়ের গ্রুপ ‘ই’-তে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে শুধু গোলটাই পায়নি বাংলাদেশ, তাই আফসোস সঙ্গী আরও একবার।

    কাদামাঠে শুরুটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল বাংলাদেশের। যারা ভেবে রেখেছিলেন খেলা হবে একপেশে তাদের ভুল প্রমাণ করে প্রথম পাঁচ মিনিটে স্ট্রাইকার নাবিব নেওয়াজ জীবন কাতারের আক্রমণে বল পেয়েছিলেন দুইবার। তাতে ভালো কোনো আক্রমণ হয়নি। কিন্তু গলা ফাটানোর রসদ যুগিয়েছে সেটা মাঠের ২৫ হাজার দর্শককে।

    ম্যাচের প্রথম কর্নার, প্রথম শট দুটোই বাংলাদেশের। অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া যে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় সেটা প্রমাণ করেছেন তিনি। ৪-১-৪-১ ফর্মেশনে একমাত্র হোল্ডিং মিডফিল্ডার ভূমিকায় ছিলেন তিনি। কাতারের গোলে যে শট করে চমকে দেওয়া যায় শুরুতে তিনিই সেটা দেখালেন। যদিও শট গেছে বাইরে। চাপে পড়ে কাতার মিডফিল্ডার সালেম আল হাজরি ভুল করে বসলেন ২৫ মিনিটে।  গোলরক্ষককে ব্যাক পাস দিতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। বক্সের ভেতর মোহাম্মদ ইব্রাহিম অবশ্য সজাগ ছিলেন না। এরপর হাপ ছেড়ে বেঁচেছে কাতার কর্নারের বিনিময়ে। 



    বাংলাদেশকে ম্যাচের কোনো একটা সময় রক্ষণাত্মক হতেই হত। পুরো ম্যাচেই রক্ষণাত্মক খেলেছে বাংলাদেশ। ম্যাচের মিনিট পনেরো পার হওয়ার পর ধীরে ধীরে কাতার বাংলাদেশকে কোনঠাসা করে ফেলে আরও। গোলটা তখন আদায় করে নেয় কাতার। ২৮ মিনিটে বক্সের ভেতর বাম পাশে একেবারে ফাঁকায় ছিলেন ইউসুফ আব্দেল। আলমোয়েজ আলির পাস খুঁজে নেয় তাকে। বক্সের ভেতর তিনজন কাতারি ফরোয়ার্ড ছিলেন, আর বাংলাদেশ ডিফেন্ডার ছিলেন চারজনই। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য মনোযোগ হারিয়ে ইউসুফকে ফাঁকায় ফেলে দিলেন ইয়াসিন, রায়হানরা। তাতেই কপাল পুড়ল। আড়াআড়ি শটে আশরাফুল ইসলামকে ফাঁকি দিয়ে ইউসুফ পেয়ে যান জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল।

    এরপরের গল্পটা শুধুই বাংলাদেশের হৃদয় ভাঙার, গোলের সামনে একের পর এক খালি হাতে ফেরার। কাতারের মতো দলের বিপক্ষে এতোগুলো সুযোগ বাংলাদেশ পাওয়ার কথা ছিল না। সেটা পেল সেই লং থ্রো পুঁজি করে। লং থ্রো-তে যে বাংলাদেশ দুর্দান্ত সেটার প্রমাণ পেয়ে গেল এবার কাতারও।

    প্রথমার্ধ শেষের আগে বাংলাদেশ কেন সমতায় ফিরতে পারল না সেটা একটা বিস্ময়। রায়হানের লম্বা থ্রোতে শুরু আক্রমণের। এরপর কর্নার। সেখান থেকে কাতারের বক্সে জটলার ভেতর থেকে বাংলাদেশ ফুটবলাররা একবার, দুইবার, তিনবার শট করলেন। প্রথমবার ঠেকালেন কাতার গোলরক্ষক সাদ শিব। এরপরের দুইবার গোললাইন থেকে শরীর পুরোটা বাজি রেখে কাতার ডিফেন্ডাররা বল ক্লিয়ার করলো।

    প্রথমার্ধ শেষে  তখন যদি আপনি ভেবে থাকেন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া- তাহলে ভুল ভেবেছেন। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ আরও অন্তত পাঁচবার গোলের সুযোগ পেয়েও ফিরল খালি হাতে। দ্বিতীয়ার্ধে সময় যত গড়িয়েছে বাংলাদেশ জেনেছে বড় ব্যবধানে হারা সম্ভব নয়।  কাতারের ধার কমেছে সময়ের সাথেই। ৭০ মিনিটের পর জেমি ডে জেনেছেন হার তো দূরে থাক বাংলাদেশ হয়ত আরেকটু নিখুঁত হতে পারলে জয়ও পেতে পারত।

    ৭০ মিনিটের পর বাংলাদেশের আক্রমণ আছড়ে পড়েছে কাতারের বক্সের ভেতর। ইয়াসিন খান আগের ম্যাচেই জোড়া গোল করেছিলেন। এদিনও হয়ত পেয়ে যেতে পারতেন। একবার লম্বা থ্রো থেকে হেডে অল্পের জন্য লক্ষ্য মিস করেছন। আরেকবার বক্সের ভেতর ফাঁকায় বল পেয়ে গিয়েও কাতারকে চমকে দিতে পারেননি। আসলে বল পেয়ে নিজেই চমকে গিয়েছিলেন ইয়াসিন।

    এর কিছুক্ষণ পরই ম্যাচের সেরা সুযোগটাও বিফলে চলে যায় বাংলাদেশের। মাহবুবুর রহমান সুফিল জীবনের বদলি হয়ে মাঠে নেমছিলেন। ম্যাচে ওই একটাই পরিবর্তন করেছেন ডে। সুফিল নেমেই ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। ডানদিক দিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে ক্রস ফেলেছিলেন বক্সে। ইব্রাহিম ছিলেন, ছিলেন জামালও। গোলের ১০ গজ দূড় থেকে জামালই নিলেন বাম পায়ের শট। মুহুর্তের জন্য হয়ত ভেবেছিলেন আরও একবার গোল পেয়ে যাবেন কাতারের বিপক্ষে। স্টেডিয়ামের দর্শকদের মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়ে জামালের শট গোলের সামনে থেকে হেড দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন ডিফেন্ডার বাসাম আলরাওই। জামাল, ইব্রাহিম, সুফিলদের সঙ্গে মাথায় হাত পড়ে ভরা গ্যালারিরও।

    পরের মিনিটে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ দাঁড়ালেন কাতার গোলরক্ষক। এবার সুফিলই শট নিয়েছিলেন। তার দারুণ শট ঠেকিয়ে দিয়ে আরও একবার বাংলাদেশকে আটকে রাখেন সাদ। সুযোগ নষ্ট করেছেন বিপলু আহমেদও। গোলের ১০ গজ দূর থেকে নিজের শক্তিশালী পায়ে বল পেয়েও গোলে শট করতে পারেননি তিনি।

    শেষদিকে হোম সাপোর্ট কাকে বলে সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন দর্শকেরাও। দলকে উজ্জীবিত করার সব চেষ্টা করে গেছেন তারা। রেফারির সিদ্ধান্ত যেমনই হোক সেটা পছন্দ না হলেই দুয়ো দিয়েছেন। কিছুটা দুয়ো অবশ্য বাংলাদেশ গোলরক্ষক রানার ভাগেও গেছেন। এক গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচে বারবার নিজের বক্স থেকে বল ছাড়তে দেরি করছিলেন বারবার। তাতে দর্শকদের মতো বিরক্তি ধরেছে ডাগ আউটে থাকা ডেরও।

    ৯১ মিনিটে বাংলাদেশের হৃদয়ের ক্ষতটা আরেকটু বড় করেছেন কারিম বউদিয়াফ। জটলার ভেতর থেকে বল পেয়ে সহজ ফিনিশে গোল করেছেন তিনি। পিন পতন নীরবতার ভেতর কাতার উদযাপনও করেনি। জয় নিশ্চিত হয়ে গেছেন তখন তাদের। কাদা মাঠের সুফলটা শেষে পেয়ে গেছে কাতার।

    দুই গোল হজম করলেও বাংলাদেশ ডিফেন্ডাররাও পিছিয়ে ছিলেন না। পুরো ম্যাচে দারুণ মনোযোগের পরিচয় দিয়েছেন তারা। রায়হান হাসান ও রহমত মিয়া প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধে দুইজনই দারুণ দুইটি ব্লকে গোলবঞ্চিত করেছেন কাতারকে। মিডফিল্ডাররা সময়মতো বারবার ট্র্যাক ব্যাক করেছেন। শারীরিক দিক দিয়েও যে তাদের উন্নতি হয়েছে তার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ডিফেন্ডাররা সাহস যুগিয়েছেন নিচ থেকে, সেটা ধরে রেখে আক্রমণে উঠেছে বাংলাদেশ। যদিও শেষটা সুখের হয়নি, তবুও জামালরা মাঠ ছেড়েছেন দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে।  

    দুই ম্যাচ শেষেও বাংলাদেশ তাই গ্রুপের তলানীতেই থাকল। আর কাতার উঠে গেল শীর্ষে। তবে এমন এক ম্যাচ থেকে অনেক কিছু নিয়েই ফিরল বাংলাদেশ।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন