• বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব
  • " />

     

    ভারতকে সামর্থ্যের জানান দিয়ে আসলো বাংলাদেশ

    পেছনে আশি হাজার ভারত সমর্থক। সাদ উদ্দিন মাঠ ছাড়ছেন মাথা নাড়তে নাড়তে। ভারতের সঙ্গে জয়টা অল্পের জন্য বাক্সবন্দী করা হয়নি। ফলটা মোটেই খারাপ নয় বাংলাদেশের জন্য। সাদের হতাশ হওয়ার ছবিটা আপনাকে বলে দেবে বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন দেখতে জানে। সেটা জেনে গেছে ভারতও। ফিফা র‍্যাংকিংয়ে ৮৪ ধাপ এগিয়ে থাকা, দিনে দিনে ফুটবলে উন্নতি করা- ভারত যতই এগিয়ে যাক, বাংলাদেশ দেখিয়েছে ধীর গতিতে হলেও লাল-সবুজরাও এগিয়ে গেছে। 

    ক্রিকেট হোক আর ফুটবল হোক- ইশ, যদি, কিন্তুর আক্ষেপটা অবশ্য বাংলাদেশের থেকেই যাচ্ছে। প্রথমার্ধে সাদের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট বাকি থাকতে গোল হজম করেছে বাংলাদেশ। বিবেকানন্দ যুব ভারতী স্টেডিয়ামকে আর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়নি তাই। তবে ১-১ গোলের ড্রয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে পেয়ে গেছে  নিজেদের প্রথম পয়েন্ট।     

    ম্যাচের শুরু থেকেই ভারত ভীতি জয় করছিল বাংলাদেশ। শুরু থেকে বলতে একেবারে প্রথম সেকেন্ড থেকেই। কিক অফ থেকে মোহাম্মদ ইব্রাহিম ঢুকে পড়েছিলেন ভারতের বক্সে। ভারত তখন কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দিয়েছে ইব্রাহিমকে, তবে পেনাল্টিও পেয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ। ভারত ডিফেন্ডারের পেছন থেকে করা ট্যাকেল আগে লেগেছিল ইব্রাহিমের পায়ে, এরপর বল হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচের শুরুতে বলেই হয়ত রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবেননি। তবে ভারত ভাবনায় পড়ে গিয়েছিল শুরুতেই। 

    কাতারের বিপক্ষে নামানো একাদশটার ওপর ভরসা রেখেছিলেন জেমি ডে। কোচের ভরসার প্রতিদানও দিয়েছে দল। রক্ষণে মনোযোগী হওয়ার যে মন্ত্র জেমি জঁপেছিলেন সেটা অবশ্য কিছুটা এদিক-সেদিক করতে হলো ভারতের খেলার ধরনের কারণে। শুরুর দশ মিনিট আক্রমণ প্রতি-আক্রমণে খেলা গড়াল।

     

    পরের দশ মিনিট ভারতের আক্রমণ ভোগালো বাংলাদেশকে। ডানদিক থেকে উদান্ত সিং একের পর এক ক্রস করে যাচ্ছিলেন। তবে বাংলাদেশ ডিফেন্ডাররাও সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলেন। এদিন লম্বা থ্রো-তে খুব বেশি সুবিধা পাওয়া হয়নি বাংলাদেশের, দলটা ভারত বলেই। দক্ষিণ এশিয়ার দলগুলোর জন্য তো লম্বা থ্রো বড় অস্ত্র। 

    প্রথমার্ধে দুই দলই লম্বা থ্রোতে ভালো দুটো সুযোগ পেয়েছিল। রানা একবার সেভ করেছেন লম্বা থ্রো থেকে করা ভারতের হেড, অন্যপ্রান্তে বাংলাদেশ ডিফেন্ডার রিয়াদুল হাসান থ্রো থেকে হেড মেরেছেন বাইরে দিয়ে। এর আগেই অবশ্য বাংলাদেশ দুর্দান্ত একটি সুযোগ হাতছাড়া করেছে। 

    ভারতের ডিফেন্সের মূল স্তম্ভ সান্দেশ ঝিঙ্গান ইনজুরির কারণে বাদ পড়েছিলেন। নতুন রক্ষণ কিছুটা এলোমেলোই ছিল ভারতের। সেই ভুলের সুযোগ নিয়ে বিপলু আহমেদ ঢুকে পড়েছিলেন বক্সের ভেতর। ক্রস করতে পারতেন, কিন্তু কঠিন অ্যাঙ্গেল থেকে শটই করলেন। সেটা ভারত ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে আবার কর্নার পেল বাংলাদেশ। 

    সে কর্নার থেকে কিছু পাওয়া হয়নি বাংলাদেশের। তবে ৪২ মিনিটে বাংলাদেশ পেয়ে গেল বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ বাছাইয়ের দ্বিতীয় পর্বে নিজেদের প্রথম গোলের দেখা। মিডফিল্ডে বামপ্রান্তে ফ্রি-কিক পেয়েছিল বাংলাদেশ। জামাল ভুঁইয়া বল উড়িয়ে মারলেন দূরের পোস্টের দিকে। ভারত গোলরক্ষক গুরপ্রীত সিং কাতারের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে দুর্দান্ত সব সেভ করে ড্র এনে দিয়েছিলেন দলকে। সেই গোলরক্ষকও জামালের ফ্রি-কিকের বাঁক বুঝতে ভুল করে এগিয়ে গেলেন ধরতে। মিস করলেন। পেছনে ছিলেন সাদ উদ্দিন। 

    ‘সুযোগ সন্ধানী’ স্ট্রাইকারের কাজ করলেন সাদ। শুয়ে পড়ে কোনাকুনি হেডে বল পাঠিয়ে দিলেন ভারতের জালে। সল্ট লেক স্তব্ধ, কলকাতায় দম আটকানো মুহুর্ত। সাদ-জামালরা এর মধ্যেই উল্লাসে মাতলেন। বিরতিতে বাংলাদেশ গেল মাথা উঁচু করে। 

    দ্বিতীয়ার্ধ রোমাঞ্চ ছড়াবে জানা ছিল। ভারত ঘরের মাঠের সমর্থন কাজে লাগিয়ে হামলে পড়বে সেটাও বাংলাদেশের জানা ছিল। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ  ছুড়ে ফেলে বাংলাদেশ ভারতের বুকে কাঁপন ধরালো আরেকবার। সেই ইব্রাহিম আরেকবার। ভারতের দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক গোলে যে দুর্দান্ত থ্রু পাস তিনি জীবনের উদ্দেশ্যে বাড়িয়েছিলেন সেটা ফুটবলের দিক দিয়ে ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর ছবি। জীবন অবশ্য জীবনটা দিয়ে দিয়েছেন ভারতকেই। তার বাম পায়ের নিচু শট ওয়ান অন ওয়ানে ঠেকিয়ে দিয়েছেন গুরপ্রীত।  

    সেখানেও শেষ নয়। এরপর গোলের আরও কাছ থেকে ফেরা বাংলাদেশের। ইব্রাহিম ৫১ মিনিটে বামপ্রান্ত থেকে ক্রস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটাই পরিণত হয়ে যাচ্ছিল গোলে। গুরপ্রীত সিং চমকে গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। গোল হয়ে গেলে কিছুই করার ছিল না তার। বল লাগল বারপোস্টে, ডাগ আউটে মাথায় হাত জেমি ডের। 

    ইব্রাহিম কোথায় ছিলেন না? ৬৬ মিনিটে ভারত মিডফিল্ডার আনাসের হেড গোলে ঢুকতে গিয়েও ঢুকল না ইব্রাহিমের গোল লাইন ক্লিয়ারেন্সে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল এরপর বাংলাদেশ। ততোক্ষণে ভারত বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে গোলের চেষ্টা পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। শেষ বিশ মিনিটে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অনুমিতভাবেই বয়ে গেছে আক্রমণের জোয়ার। 

    কিন্তু ইয়াসিন খান বা রিয়াদুল হাসান মনোযোগ হারাননি। একের পর এক ইন্টারসেপ্ট করে গেছেন দুজন। আব্দুল সেহেলের একটি শট গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম ফিরিয়েও দিয়েছেন এর মধ্যে। বাংলাদেশ এরপর গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। জীবনের শট ভারত গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করেছিল অবশ্য কিন্তু অফসাইডের বাঁশি রেফারি বাজিয়েছিলেন অনেক আগেই। অগত্যা হলুদ কার্ড দেখতে হয়েছে জীবনকে। 

    মাহবুবুর রহমান সুফিল এদিনও জীবনের বদলি হয়ে নেমেছিলেন। ভারতের রক্ষণের ভুলে বক্সের ভেতর বল পেয়েও গিয়েছিলেন নামার পর। কিন্তু সতর্ক ছিলেন না, গোলে শট মারার আগেই ভারত বল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। 

    নতুন ডিফেন্ডার নামিয়ে ডে রক্ষণে অধিক মনোযোগ ঢালেননি। বিশ্বনাথ ঘোষ নেমেছিলেন রায়হান হাসানের জায়গাতেই। রবিউল হাসানকেও বাজিয়ে দেখেছিলেন ডে। ততোক্ষণে অবশ্য ম্যাচ হয়ে গেছে একপেশে, ভারতের আক্রমণ বনাম বাংলাদেশের রক্ষণ। তিন বদলি করার পর ডের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল যদিও। জামাল ইনজুরিতে পড়ে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছেড়েছিলেন, যদিও পরে আবার ফেরত এসে লড়ে গেছেন।  

    ডিফেন্ডার ইয়াসিন খান মাথায় আঘাত পাওয়ার পর ব্যান্ডেজ নিয়ে খেলছিলেন। সুনীল ছেত্রিকে পুরো ম্যাচে আটকে রেখে হয়ত ভেবেছিলেন কাজটা প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু ছেত্রির এক শট ক্লিয়ার করতে গিয়েই ক্ষত বেড়ে যায় বাংলাদেশের। ডের দলের কপাল পুড়েছে ওই কর্নারেই। গোলের আট গজ দূর থেকে লাফিয়ে উঠে গ্ল্যান্সিং হেডারে আদিল খান প্রাণ ফিরিয়ে দেন ভারতকে। যে সেটপিসে প্রাণ পেয়েছিল বাংলাদেশ তাতেই শেষে কপাল পুড়েছে তাদের। 

    ইনজুরি সময়ের শেষ ৫ মিনিট স্নায়ুর চাপকেও জয় করেছে বাংলাদেশ। ভারতকে আটকে রেখে এক পয়েন্ট তাই দারুণ ফল বাংলাদেশের জন্য। সাদ অভিষেক গোলের পরও হাসিমুখে হয়ত মাঠ ছাড়তে পারেননি। আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি না পাওয়া, কাতারের সঙ্গে লড়াই করেও খালি হাতে ফেরার পর জয়টাও বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়েছে কলকাতায়।

    কিন্তু এই ড্রয়েও তৃপ্তি আছে, বাংলাদেশ দল দিয়েছে অন্য কিছু। যেটা মাপা যায় না। ধরা যায় না, ছোঁয়াও যায় না। সারা বছর ফাঁকা গ্যালারিতে খেলা ফুটবলারদের হুট করে আশি হাজার প্রতিপক্ষ দর্শকের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর সে দল যখন ১-১ গোলে ড্র করে আসে, এরপর সেই দেশের ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস না করতে পারা তো অপরাধও।