• " />
    X
    GO11IPL2020

     

    হারিয়ে যাওয়া সেই আফতাব

    ঘড়ির কাঁটা দশ বছর পিছিয়ে নিন। ফিরে যান ২০০৬ সালে। ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভির জায়গায় ভাবুন পুরনো সেই ঢাউস চারকোণা বাক্সটির কথা। কাঁধ এলিয়ে দিন সোফায়। শিথিল করুন স্নায়ু। এবার চোখ রাখুন টিভি পর্দায়। দেখুন একটা ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি বাংলাদেশ। জয়ের জন্য প্রয়োজন ৬৯ বলে ৫৭ রান। উইকেটে আছেন অলোক কাপালি ও আফতাব আহমেদ।

    পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে খেলতে পারেন অলোক। এমনিতে স্ট্রোকের দ্যুতি ছড়াতে পছন্দ করলেও দলের প্রয়োজনে দেখেশুনে খেলতে আপত্তি নেই তাঁর। কিন্তু সঙ্গী আফতাব আহমেদ শুরু থেকেই বাঁধনহারা। কুড়ি বছরের ছোকরার অতো ধৈর্য-টৈর্য নেই। বলটাকে পেটাতে পছন্দ করেন, বোলারের ওপর চড়াও হতে পছন্দ করেন আর ভালোবাসেন গ্যালারিজোড়া দর্শকের মুখে নিজের নাম শুনতে। ব্যাটের আঘাতে দিশেহারা বল যখন বাউন্ডারির সীমাবদ্ধ বৃত্ত ছাড়িয়ে উড়ে যায় বক-পাখির মতো, ব্যাখ্যাতীত এক আনন্দ উত্তাল সাগরের ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে আফতাবের ছোটখাট শরীর জুড়ে। সাগরপাড়ের ছেলে আফতাবের এরচেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। মাঠে নামার আগেই ভেবে রেখেছেন আজ ব্যাট হাতে কী করবেন। সেটা হলো আক্রমণ।

    শুরু থেকেই মারকাটারি ব্যাটিং করলেন আফতাব। রুচিরা পেরেরাকে এক বলের ব্যবধানে মারলেন ছয় ও চার। এর মধ্যে ১৮ রান করে দিলহারা ফার্নান্দোর বলে আউট হয়ে কাপালি ফিরে গেলে ভেঙ্গে যায় তাঁদের ৪১ বলে ৫১ রানের জুটি। অপরপ্রান্তে খালেদ মাসুদকে নিয়ে ম্যাচ জিতিয়েই বেরিয়ে আসেন ২১ বলে ৩২ রান করা তরুণ। বল হাতে নিয়ে ছিলেন ১ উইকেট। ম্যান অব দ্য ম্যাচ বেছে নিতে কোনো চিন্তাই করতে হলো না নির্বাচকদের।  

    যে সময়ের কথা বলছি তখন পুরো বাংলাদেশ তৃষিত হয়ে থাকতো একটা জয়ের জন্য। দৈনিক পত্রিকার আট কলামজুড়ে থাকতো বিজয়ের শিরোনাম। প্রতিটি জয় উদযাপিত হতো মিছিলের কোলাহলে। হবেও না বা কেন? সে পর্যন্ত ১১৮টি ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র দশটিতে। যার ভেতর আবার পাকিস্তান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছিল মাত্র তিনটি জয়। বাকিগুলো এসেছিল জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে।

    সেদিন প্রথমবার লংকাজয়ের আনন্দে, বগুড়া থেকে উত্থিত আনন্দের অগ্লুৎপাত প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। অগুণিত জনপদ পেরিয়ে সমুদ্র মেশাটাই যেমন নদীর নিয়তি, তেমনি দেশজুড়ে প্রবাহমান উল্লাস যেন টিএসসিতে এসেই পূর্ণতা পায়। সেদিনের মিছিলে বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল আফতাবের নাম। সেবারেই প্রথম ব্যাটিংয়ের জন্য ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন তিনি।

    বাংলাদেশের ক্রিকেটে আফতাব আহমেদ অমর হয়ে থাকবেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কীর্তির জন্য। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে তিনি নিয়েছিলেন পাঁচ উইকেট। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সে ম্যাচের আগে দুটি ওয়ানডে খেললেও বল করেননি। বৃষ্টি বিঘ্নিত সে ম্যাচে কী মনে করে যেন তাঁর হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। প্রথমবার বল করতে নেমেই ৩১ রান ৫ উইকেট তুলে নেন আফতাব। সেবার অল্পের জন্য হয়নি কিউই বধ। কিন্তু ৩ উইকেটে হেরে যাওয়া সে ম্যাচ দলের আত্মবিশ্বাসে্র পালে জুগিয়েছিল উত্তুঙ্গ হাওয়া।

    তবে শুধু সেজন্যই নয়। আফতাব আহমেদ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ম্যাচ জেতানো ৪৯ বলে অপরাজিত ৬২ রানের জন্য, পরের ম্যাচে মাখায়া এনটিনির তিন বলে দুই ছক্কা ও এক চারে ১৬ রান তোলার জন্য, চেস্টার লি স্ট্রিটে ইংল্যান্ডের ভীতিকর পেস আক্রমণের বিপক্ষে ৮২ বলে অপরাজিত ৮২ রানের জন্য ও তিনে নেমে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮৭ বলে অপরাজিত ৮১ রানের জন্য। আফতাব ক্রিকেট গগণে চির উজ্জ্বল থাকবেন কার্ডিফে জেসন গিলেস্পিকে মারা সেই বিখ্যাত ছক্কাটির জন্য, যা দেখে কেঁপে উঠেছিল ধারাভাষ্যকার ডেভিড লয়েডের গলা। ১৯ বছর বয়সী তরুণ ১৩ বলে ২১ রান না করলে যে ম্যাচ আক্ষেপ হয়ে আজ পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়াত বাংলাদেশকে।

    শেষ পর্যন্ত সুখময় হয়নি আফতাবের ক্যারিয়ার। প্রতিভার সঙ্গে খামখেয়ালিপনা নিয়ে জন্মেছিলেন। মনোযোগী ছিলেন না ফিটনেস নিয়ে। অথচ সেই তিনিই বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ে স্থাপন করেছিলেন নতুন একটা মাত্রা। মাঠে সর্বস্ব উজাড় করে দেয়া আফতাব, মাঠের বাইরে কেমন যেন হেয়ালি হয়েই থাকলেন। ২০০৮ সালে বিতর্কিত আইসিএলে গিয়ে আস্তে আস্তে ঢেকে গেলেন পর্দার আড়ালে। তা থেকে ফিরেও থিতু হতে পারেননি দলে। ততদিনে বাংলাদেশ ক্রিকেট পেয়ে গেছে আগামীর তারা সাকিব-তামিম-মুশফিকদের। মাত্র ২৯ বছর বয়সেই আফতাব বিদায় বলে দিয়েছেন সব ধরণের ক্রিকেটকে। যে মাঠের গর্জন একদিন রক্তে নাচন তুলতো আফতাবের, তার পাশেই এখন তিনি গড়ে তুলছেন আগামীর ক্রিকেটারদের। কোচিং ও ধর্ম-কর্ম নিয়ে বেশ আছেন বন্দর নগরীর এই ক্রিকেটার।

    ভয়ডরহীন ক্রিকেটই ছিল আফতাব আহমেদের মন্ত্র। বাঘা বাঘা বোলারদের সামনে কুঁকড়ে না গিয়ে পাল্টা আক্রমণের সাহস তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুলে দিয়েছিলেন এমন একটা জানালা, যা শুরু থেকে ছিল সসম্ভ্রমে বন্ধ করা।

    আজ ১০ নভেম্বর তাঁর ৩১ তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন আফতাব।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন