• ট্রিবিউট
  • " />

     

    "সবচেয়ে সাহসী ক্রিকেটারের" গল্প

    ১.

    টাকমাথার লোকটাকে প্রথম দেখায় ক্রিকেটার হিসেবে ভাবতেই কষ্ট হবে।  জীবনের অনেকটা সময় অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছেন, ভাঁজ পড়া চামড়ায় বয়স তার ছাপ রেখে গেছে অক্লেশে। ২২ গজে দাঁড়িয়ে এই লোকটাই কিনা সামলাবে হোল্ডিং-রবার্টসদের! কষ্টকল্পনা বললেও কম বলা হয়। কী অদ্ভুত, সেই টেকো লোকটাই কিনা একের পর এক বাউন্সার সামলে যাচ্ছে। তখনও ক্রিকেটে ওভারে একটার বেশি নো বলার করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। হোল্ডিংরা তাই বাউন্সার দিতে এতটুকু কুন্ঠা করলেন না। কিন্তু লোকটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, একের পর এক বাউন্সার আঘাত হানছে তাঁর শরীরে! উইসডেন বলছে, সেদিনের মতো  ফাস্ট বোলিংয়ের অমন ভয়াল রূপ খুব কমই দেখা গেছে আগে। শেষ পর্যন্ত ৪৬ বছর বয়সে জীবনের শেষ ইনিংস খেলে যখন লোকটা আউট হলেন, ১০৮ বলে তাঁর নামের পাশে লেখা মাত্র ২০! ড্রেসিংরুমে ফেরার পর দেখা গেল, বাউন্সারের পর বাউন্সারের নির্মম ছোবলে তাঁর সারা গায়ে কালশিটে পড়ে গেছে। অথচ মুখের হাসিটা তখনও মিলিয়ে যায়নি। ১৯৭৬ সালের সেই ইনিংস দিয়েই দাঁড়ি টানেন টেস্টে ২৭ বছর বয়সী ক্যারিয়ারের।

     

    ব্রায়ান ক্লোজ লোকটা এমনই ছিলেন!

     

     

    ২.

    ১৯৪৯ সালের কথা। ইংলিশ ক্রিকেট আবিষ্কার করল এক তরুণ অলরাউন্ডারকে। এমনিতে ইংল্যান্ডে ১৮ বছর বয়স কিছুই নয়, ছোকরা হিসেবেই মনে করা হয়। ছেলেটা ব্যাট করত দারুণ, সঙ্গে মিডিয়াম পেস বা অফ স্পিনও করতে পারত মন্দ না। কিন্তু এই বয়সেই কি টেস্টে নামিয়ে দেওয়া ঠিক হবে? শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে যখন নামলেন, ইতিহাসই গড়া হয়ে গেল। তখনও এর চেয়ে কম বয়সে কোনো ইংলিশের টেস্ট অভিষেক হয়নি। কী বিস্ময়কর, আরও অনেক রেকর্ড ধুলোয় লুটোলেও সেটি টিকে আছে সগর্বে।

     

    রেকর্ডটা কার জানেন ?

     

    ওই ব্রায়ান ক্লোজেরই।

     

    ৩.

    লোকটা ছিল একেবারে অন্য ধাতে গড়া। ভাঙবে, কিন্তু কখনও মচকাবে না। শর্ট লেগে ফিল্ডিং করা এমনিতেই বেশ কঠিন কাজ। যে কোনো সময় বল সজোরে আঘাত হানতে পারে। কিন্তু লোকটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনকি ব্যাটসম্যান যখন সপাটে পুলও করছেন, তখনও বলের ওপর থেকে চোখ সরাতেন না । একবার তো এরকম করে গ্যারি সোবার্সের ক্যাচও ধরে ফেলেছিলেন। এক সতীর্থ তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, “এই যে তোমার গায়ে এভাবে বল লাগে, ব্যথাট্যথা পাও না?” মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “ব্যথা আর কতক্ষণ? বড়জোর এক সেকেন্ড। এটুকু সইতে না পারলে কীভাবে হয়?”

     

    ৪.

    ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় নিজের আদর্শে অটল থেকেছেন। ইংল্যান্ড দলে চোটের সঙ্গে নিজের গোয়ার্তুমির কারণেও কখনও থিতু হতে পারেননি। তবে ইয়র্কশায়ারের হয়ে অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রায় কিংবদন্তির স্থানে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ষাটের দশকে চারটি কাউন্টি শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইংল্যান্ড যখন ৩-০ তে পিছিয়ে, হঠাৎ করেই অধিনায়ক হিসেবে ডাক পড়ল তাঁর। ম্যাজিক দিয়ে দলকে জেতালেন, কিন্তু অধিনায়ক ছিলেন মাত্র সাত টেস্টের জন্য।এর মধ্যে ছয়টিতেই জয়, একটিতে মাত্র ড্র। পরিসংখ্যানের হিসেবে তিনিই ইংল্যান্ডের সর্বকালের সফলতম অধিনায়ক।

     

    ৫.

    ক্রিকেটের সঙ্গে ফুটবলও খেলতে দারুণ। আর্সেনালের হয়ে প্রথম বিভাগ খেলেছিলেন, লিডস ইউনাইটেডের হয়েও খেলেছিলেন। এমনকি স্কটলান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের হয়ে একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচেও নেমেছিলেন। পরে গলফেও দারুণ দক্ষতা দেখান।

     

    ৬.

    সমারসেটের হয়ে খেলার সময় ইয়ান বোথাম মাত্র ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। বোথাম পরে জানিয়েছিলেন, তাঁর দেখা সবচেয়ে সাহসী লোক ব্রায়ান ক্লোজ। কাল মৃত্যুর পর সেই বোথামই টুইট করলেন, “তরুণদের জন্য এর চেয়ে ভালো অধিনায়ক আর পাওয়া যাবে না। অসাধারণ একজন মানুষ।” সতীর্থদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন নিজের চরিত্রগুণেই।

     

    ৭.

    নিজের প্রিয় ইয়র্কশায়ারে কাল ৮৪ বছর বয়সে চলে গেলেন সেই লোক। কয়েক দিন আগেই নিজের প্রিয় দল কাউন্টি শিরোপা জিতেছে। পরপারে গিয়েও হয়তো তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলছেন, “বাছারা, শিরোপাটা হাতছাড়া করো না যেন!”

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন