• ক্রিকেট, অন্যান্য
  • " />

     

    ২০০ রুপি ম্যাচ ফি নেওয়া সাইনি যখন জাতীয় দলে

    ছয় বছর আগেও কখনো কাঠের বল দিয়ে খেলার সুযোগ হয়নি তাঁর। এমনও দিন গেছে, হরিয়ানার রাস্তাঘাট ও পাড়ার মাঠে ২০০ রুপির বিনিময়েও ম্যাচ খেলেছেন। খুব জোরে বল করতে পারেন, নবদীপ সাইনির নামে এমন সুনাম দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের এলাকায়। বড় ক্রিকেটার হতে পারবেন, এই আশায় ঘর ছেড়ে দিল্লীতে এসেছিলেন সাইনি। দিল্লী তাঁকে খালি হাতে ফেরায়নি, আইপিএলের পারফরম্যান্সই তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোতে নিয়ে আসে। এবার ডানহাতি পেসার সাইনির সামনে অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত অর্জন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ভারতের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা পেয়েছেন তিনি, জাতীয় দলের জার্সিটা এবারই উঠতে পারে তাঁর গায়ে। 

    বাবা ট্রাক ড্রাইভার, পরিবারে আয় করার অন্য কেউ নেই। ছোটবেলা থেকেই অভাবটাকে খুব কাছে থেকেই দেখেছেন সাইনি। পড়াশুনা খুব বেশিদূর করতে পারেননি, হরিয়ানার কার্নাল এলাকায় অন্য বন্ধুদের সাথে টইটই করে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তাঁর প্রধান কাজ। ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি নেশা ছিল ক্রিকেট। সবার চেয়ে জোরে বল করতে পারায় তাঁকে দলে নেওয়ার জন্য টানাহেঁচড়া লেগে যেতো স্থানীয় দলগুলোর মাঝে। 

    কার্নাল প্রিমিয়ার লিগে খেলার সময় সাইনির বোলিং নজর কাড়ে দিল্লী পেসার সুমিত নারওয়ালের। তাঁর পরামর্শেই দিল্লীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সাইনি। পাঁচজনের সাথে মিলে দিল্লীর ছোট্ট একটি রুমে ওঠেন। দিল্লী রঞ্জি দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য শারীরিকভাবে আরও ফিট হয়ে আসতে বলা হয় সাইনিকে। স্থানীয় এক জিমে ভর্তি হতে যান তিনি। সেই জিমের ট্রেইনার নাসির জামশেদ জানিয়েছেন সাইনির পরিশ্রমের কথা, ‘প্রথমবার তাঁকে দেখার সেই দিনটা ভুলতে পারব না। তাঁর ওজন ছিল মাত্র ৬২ কেজি! আমি তো ভেবেছিলাম জোরে বাতাস এলেই সে উড়ে যাবে! তাঁকে বেশি করে খাওয়াদাওয়া করার পরামর্শ দিলাম। সে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতো, দুই-তিন ওভার করেই হাঁপিয়ে যেতো। খুব বেশি জোরে বল না করতেও বলেছিলাম। যদিও সে ধীরে বল করা নিয়ে খুব একটা খুশি ছিল না।’ 

    প্রতিদিন নিজের বাসা থেকে অনেকদূর হেঁটে ট্রেনে করে জিমে আসতেন সাইনি। টাকার অভাবে জিমের ফিও দিতে পারেননি। নাসির অবশ্য বিনামূল্যেই সাইনিকে জিমে রেখেছেন। সাইনি যেন ভালো খাবার পায়, সেটার দিকেও নজর রেখেছেন নাসির। কঠোর নজরদারি ও পরিশ্রমের ফলটাও আসে। তিন মাস পর সাইনির ওজন বাড়ে ১৫ কেজিরও বেশি! 

    দিল্লীর রঞ্জি দলের নেটে অনুশীলনে বল করার সুযোগ আসে সাইনির সামনে। সেখানে একদিন গৌতম গম্ভীরের বিপক্ষে বোলিং করছিলেন তিনি। সাইনির বোলিংয়ে দারুণ খুশি হয়ে তাঁকে একজোড়া নতুন জুতাও উপহার দেন গম্ভীর। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে দিল্লী স্কোয়াডে সুযোগ পান। ২০১৭-১৮ মৌসুমে সাইনির বোলিং জাদুতেই রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে ওঠে দিল্লী। সেবার আট ম্যাচে ৩৪ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। পরের মৌসুমে বিজয় হাজরা ট্রফিতেও তিনি দিল্লির হয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেন। 

    ২০১৭ সালে তাঁকে ১০ লাখ রুপিয়ে কেনে দিল্লী। পরের মৌসুমে রয়্যাল চালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু তাঁকে দলে ভেড়ায় ৩ কোটি রুপিতে। কোটিপতি হয়েও নিজের কষ্টের দিনগুলোর কথা ভোলেননি সাইনি। সেই তিন কোটি রুপির ২০ শতাংশ দিয়েছেন দিল্লীর জিম ট্রেইনার নাসিরকে। আবেগে আপ্লুত নাসির জানিয়েছেন, ‘সাইনি আমাকে বলেছিল, কখনোই তো আপনাকে কিছু দিতে পারিনি। আমার জন্য যা করেছেন, সেটার জন্য এই ছোট উপহারটা রাখুন।’ 

    ২০১৮ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের জন্য ডাক পান সাইনি। এবারে বিশ্বকাপে স্ট্যান্ডবাই বোলারও ছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্নটা দুইবারই পূরণ হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গতকাল ঘোষিত ভারতীয় দলে আছেন সাইনি। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডের সাথে ক্যারিবিয়ান সফরে যাচ্ছেন। হার্দিক পান্ডিয়া, জাসপ্রীত বুমরা না থাকায় এবার মূল একাদশে সুযোগ পাবেন সাইনি?